
ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ লিভারপুলকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ম্যানইউ
মে ৪, ২০২৬বাংলাদেশে প্রকৌশল শিক্ষা আজ এক জটিল দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে দেশের শীর্ষ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনও তাদের ঐতিহ্য ও মর্যাদা ধরে রেখেছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে আমাদের অবস্থান ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছে। বৈশ্বিক সূচকগুলো, বিশেষ করে কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাংকিং, এই বৈপরীত্যকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান বিশ্ব যখন দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, তখন আমাদের শিক্ষা কাঠামো অনেকাংশে স্থবির হয়ে আছে। এই স্থবিরতার কারণ অনুসন্ধান এবং তা কাটিয়ে ওঠার উপায় নির্ধারণ করা এখন সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
প্রকৌশল শিক্ষার শিকড় খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হয় প্রথম শিল্প বিপ্লবের সময়কার প্রেক্ষাপটে। বাষ্পশক্তি, যান্ত্রিক উৎপাদন এবং বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা তখন এমন এক শিক্ষাব্যবস্থার জন্ম দেয়, যেখানে নির্ভুলতা, পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং মানসম্মত প্রক্রিয়া ছিল প্রধান। সেই সময়ের জন্য এটি ছিল যথার্থ এবং কার্যকর। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, সেই কাঠামো এখনো অনেকাংশে অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যদিও বিশ্ব ইতোমধ্যে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছে।
বাংলাদেশের প্রকৌশল শিক্ষা এখনও অনেকটাই মুখস্থনির্ভর এবং পরীক্ষাকেন্দ্রিক। শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট সিলেবাসের মধ্যে আবদ্ধ থেকে তথ্য মুখস্থ করে পরীক্ষায় ভালো ফল করার দিকে বেশি মনোযোগ দেয়। কিন্তু বাস্তব জীবনে প্রকৌশল সমস্যাগুলো এমন নয়, যেখানে নির্দিষ্ট উত্তর আগে থেকেই জানা থাকে। বরং এসব সমস্যার সমাধান করতে হয় বিশ্লেষণী দক্ষতা, সৃজনশীল চিন্তা এবং বাস্তব পরিস্থিতি বোঝার মাধ্যমে। ফলে বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ‘হিউম্যান ক্যালকুলেটর’ হিসেবে গড়ে তুলছে, যেখানে আধুনিক প্রযুক্তি ইতোমধ্যে সেই ভূমিকা দখল করে নিয়েছে।
এখানে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো দক্ষতার দ্রুত পরিবর্তনশীলতা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সায়েন্স, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং—এসব প্রযুক্তি এমন গতিতে এগোচ্ছে যে একটি নির্দিষ্ট দক্ষতা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যেতে পারে। অথচ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো এমনভাবে গড়ে তোলা, যেখানে চার বছরের ডিগ্রি অর্জনের পর সেই জ্ঞান দিয়েই দীর্ঘ কর্মজীবন চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা করা হয়। এই বাস্তবতায় শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আজীবন শেখার মানসিকতা তৈরি করা। ‘কী শিখব’—এর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘কীভাবে শিখতে শিখব’।
এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষণ পদ্ধতিতে মৌলিক পরিবর্তন আনা জরুরি। লেকচারভিত্তিক একমুখী শিক্ষার পরিবর্তে প্রজেক্ট-ভিত্তিক শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের এমন বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি করতে হবে, যেখানে একাধিক সম্ভাব্য সমাধান থাকতে পারে। এতে তাদের মধ্যে সমালোচনামূলক চিন্তা, দলগত কাজের দক্ষতা এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা গড়ে উঠবে। একই সঙ্গে, ব্যর্থতাকে শেখার অংশ হিসেবে গ্রহণ করার সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে, যা আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় এখনো অনুপস্থিত।
শুধু পাঠ্যক্রম নয়, ডিগ্রি কাঠামোর মধ্যেও পরিবর্তন প্রয়োজন। ‘৩+১’ মডেল একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে, যেখানে প্রথম তিন বছর তাত্ত্বিক জ্ঞান ও মৌলিক দক্ষতা অর্জনের জন্য এবং শেষ বছরটি শিল্পখাতে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য নির্ধারিত থাকবে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা বাস্তব কাজের সঙ্গে পরিচিত হবে এবং শিক্ষা ও শিল্পের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরি হবে, যা বর্তমানে অনেকটাই অনুপস্থিত।
বর্তমান বিশ্বের প্রকৌশল সমস্যাগুলো ক্রমেই আন্তঃবিষয়ক হয়ে উঠছে। তাই একজন প্রকৌশলীর জন্য কেবল নিজের বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা আর যথেষ্ট নয়। উদাহরণস্বরূপ, একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারকে এখন ডেটা অ্যানালিটিকস বা স্মার্ট সিস্টেম সম্পর্কেও ধারণা রাখতে হয়। এই বহুমাত্রিক দক্ষতা অর্জনের জন্য শিক্ষার্থীদের ‘হাইব্রিড থিংকার’ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এজন্য পাঠ্যক্রমে আন্তঃবিষয়ক কোর্স অন্তর্ভুক্ত করা এবং বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন।
গবেষণার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবস্থান উদ্বেগজনক। আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ হলো গবেষণার মান ও পরিমাণ উভয়েরই ঘাটতি। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকরা অতিরিক্ত পাঠদানের চাপের কারণে গবেষণায় পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না। ফলে গবেষণা অনেক সময় কেবল পদোন্নতির একটি আনুষ্ঠানিকতা হয়ে দাঁড়ায়। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য গবেষণাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং শিক্ষকদের জন্য গবেষণার অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের মধ্যে আস্থার ঘাটতি একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। উন্নত দেশগুলোতে এই দুই ক্ষেত্র ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে, যেখানে গবেষণা সরাসরি শিল্পে প্রয়োগ হয় এবং শিল্পের সমস্যাগুলো গবেষণার বিষয় হয়ে ওঠে। কিন্তু বাংলাদেশে এই সংযোগ এখনো দুর্বল। এই ব্যবধান কমাতে যৌথ গবেষণা প্রকল্প, শিল্প-অংশীদারিত্ব এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের উদ্যোগ নিতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, প্রকৌশল শিক্ষার এই সংকট একদিনে তৈরি হয়নি এবং একদিনে সমাধানও সম্ভব নয়। তবে সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করবে। সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিল্পখাত—এই তিন পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই পরিবর্তন সম্ভব নয়। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন এক প্রজন্ম তৈরি করা, যারা শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করতে জানে না, বরং নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে পারে, পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হয়।
স্থবিরতা থেকে বেরিয়ে আসার এই যাত্রা সহজ নয়, কিন্তু এটি অনিবার্য। কারণ পরিবর্তনশীল এই বিশ্বে স্থির থাকা মানেই পিছিয়ে পড়া।
জাকির হোসেন,
সম্পাদক, সিটিনিউজ সেভেন ডটকম


