
প্রথম দুই ম্যাচের দল ঘোষণা মুস্তাফিজ, তাসকিন ও নাহিদ বিশ্রামে নতুন মুখ সাকলাইন
এপ্রিল ২২, ২০২৬বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা শুধুমাত্র সংখ্যার ওঠানামা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপ, বেকারত্ব ও বিনিয়োগ স্থবিরতার মতো সূচকগুলো দৃশ্যমান হলেও এর অন্তর্নিহিত সংকট আরও গভীর—এটি প্রশাসনিক সক্ষমতা ও আস্থার সংকট। অর্থনৈতিক নীতিমালা যতই উন্নত হোক, একটি দুর্বল ও সমন্বয়হীন প্রশাসনিক কাঠামো থাকলে সেই নীতির সুফল জনগণের কাছে পৌঁছায় না।
গত এক দশকে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অস্থিরতা, জ্বালানি সংকট ও অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা সেই অগ্রগতিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে—রাষ্ট্রীয় প্রশাসন কি দ্রুত ও কার্যকরভাবে সংকট মোকাবিলা করতে সক্ষম? বাস্তবতা বলছে, নীতিনির্ধারণ, বাস্তবায়ন এবং আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত কেন্দ্রীয়করণ একটি বড় বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে। বাজেট প্রণয়ন থেকে শুরু করে রাজস্ব সংগ্রহ ও ব্যয়ের সিদ্ধান্ত পর্যন্ত অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের ওপর নির্ভরশীলতা বেশি। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়। সংকটের সময়ে এই বিলম্ব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাবও দীর্ঘদিনের সমস্যা। এর ফলে নীতি বাস্তবায়নে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়, যা অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
রাজস্ব খাতে দুর্বলতা এ সংকটকে আরও তীব্র করেছে। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনো আশঙ্কাজনকভাবে কম। কর ব্যবস্থার জটিলতা, কর ফাঁকি এবং প্রশাসনিক অদক্ষতা মিলিয়ে সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে। একইসঙ্গে দুর্নীতি ও অনিয়ম প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর জনগণের আস্থা কমিয়ে দিয়েছে। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ, সরকারি প্রকল্পে ব্যয়ের অস্বচ্ছতা এবং সেবা প্রদানে জবাবদিহির অভাব—সবকিছু মিলিয়ে অর্থনৈতিক সংকট একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, প্রশাসনিক সংস্কার অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের অন্যতম প্রধান শর্ত। ভিয়েতনাম প্রশাসনিক সমন্বয় ও ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে কর ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছে এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করেছে। ইন্দোনেশিয়া বিকেন্দ্রায়নের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারকে ক্ষমতায়ন করে অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে গতিশীল করেছে। ঘানা আন্তর্জাতিক সহায়তার পাশাপাশি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে সংকট থেকে উত্তরণের চেষ্টা করেছে। এসব উদাহরণ প্রমাণ করে, শুধুমাত্র অর্থনৈতিক নীতি নয়—কার্যকর প্রশাসনই উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এখন সময় এসেছে সমন্বিত প্রশাসনিক সংস্কারের। প্রথমত, একটি কেন্দ্রীয় “অর্থনৈতিক সংকট ব্যবস্থাপনা সেল” গঠন করা যেতে পারে, যা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধন করবে এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করবে। দ্বিতীয়ত, রাজস্ব ব্যবস্থায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে কর ফাঁকি কমানো সম্ভব। তৃতীয়ত, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে হবে, যাতে মুদ্রানীতি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকে।
এছাড়া ভর্তুকি ব্যবস্থায় সংস্কার জরুরি। সর্বজনীন ভর্তুকির পরিবর্তে লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি চালু করলে সরকারি ব্যয় আরও কার্যকর হবে। একইসঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় সরকারকে আর্থিক ক্ষমতা প্রদান করলে তারা জনগণের প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করবে।
বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য প্রশাসনিক জটিলতা কমানোও অপরিহার্য। ব্যবসা শুরু করার প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত করতে হবে। ওয়ান স্টপ সার্ভিসকে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আরও উৎসাহিত হবে। একইসঙ্গে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অনুমোদন প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও সময়সীমাবদ্ধ করা দরকার।
তবে এসব সংস্কার বাস্তবায়নের পথে চ্যালেঞ্জ কম নয়। স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রতিরোধ, দক্ষ জনবলের অভাব এবং প্রশাসনিক সংস্কৃতির জড়তা বড় বাধা হিসেবে কাজ করে। তাই সংস্কারের পাশাপাশি প্রশাসনিক মানসিকতার পরিবর্তনও জরুরি। উদ্ভাবন, দক্ষতা ও জবাবদিহিকে উৎসাহিত করতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট কেবল অর্থনৈতিক সূচকের সমস্যা নয়—এটি রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের কার্যকারিতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার একটি পরীক্ষা। যদি এই সংকটকে সুযোগে রূপান্তর করতে হয়, তবে প্রশাসনিক সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একটি দক্ষ, স্বচ্ছ ও সমন্বিত প্রশাসনই পারে দেশের অর্থনীতিকে পুনরায় গতিশীল করতে এবং জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে।
জাকির হোসেন, সম্পাদক, সিটিনিউজ সেভেন ডটকম


