
সংরক্ষিত নারী আসনে ১১ দলীয় জোটের চূড়ান্ত প্রার্থীদের নাম ঘোষণা
এপ্রিল ২১, ২০২৬বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ এক জটিল ও বহুমাত্রিক বাস্তবতার সম্মুখীন।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি কাঠামো দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকি গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে—বাংলাদেশ তার ব্যতিক্রম নয়। দেশের প্রায় ৯০-৯৫ শতাংশ প্রাথমিক জ্বালানি আমদানিনির্ভর হওয়ায় সংকটের অভিঘাত আরো তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে সরকার বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে নানা প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে—অফিস সময় হ্রাস, দোকানপাট আগেভাগে বন্ধ, এসির তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস নির্ধারণ, অপ্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার সীমিতকরণ ইত্যাদি। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এ ধরনের সাময়িক নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা কি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধান দিতে পারে?
বাস্তবতা হলো বাংলাদেশের নগর স্থাপত্য, বিশেষ করে ঢাকার আধুনিক বাণিজ্যিক ভবনগুলো—ক্রমে কৃত্রিম শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। ‘গ্লাস বক্স’ নকশার ভবনগুলোয় সূর্যের তাপ সরাসরি প্রবেশ করে, ফলে অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সার্বক্ষণিক এসি চালু রাখা বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে। গবেষণা বলছে, বাণিজ্যিক ভবনগুলোর মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের ৪০-৬০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় হয় কেবল শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায়। ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হলে এসব ভবন কার্যত অচল হয়ে পড়ে। অন্যদিকে প্রাকৃতিক বায়ু চলাচল বা ন্যাচারাল ভেন্টিলেশন একটি প্রাচীন কিন্তু বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত কার্যকর পদ্ধতি। ২০২১ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল যে যথাযথ বায়ু চলাচল শ্বাসযন্ত্রজনিত রোগের ঝুঁকি কমায় এবং কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করে। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যের চার্টার্ড ইনস্টিটিউশন অব বিল্ডিং সার্ভিসেস ইঞ্জিনিয়ারস (সিআইবিএসই) উল্লেখ করেছে যে প্রাকৃতিক বায়ু চলাচলভিত্তিক নকশা শক্তি ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য হ্রাস ঘটাতে সক্ষম।
ইউএনডিপির গবেষণা অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশগুলোয় দ্রুত নগরায়ণের কারণে ভবন খাত শক্তি ব্যবহারের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠছে, যা একই সঙ্গে বড় একটি সুযোগও তৈরি করছে। কারণ সঠিক নীতি ও প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে এ খাত থেকে ২০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত শক্তি সাশ্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে বাধ্যতামূলক বিল্ডিং কোড, আর্থিক প্রণোদনা এবং সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রম সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি।
দুঃখজনকভাবে আমাদের অনেক আধুনিক ভবনে কার্যকর জানালা, ক্রস ভেন্টিলেশন বা বায়ু চলাচলের পথ অনুপস্থিত। অনেক ক্ষেত্রে জানালাগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ বা সিল করা, যা ভবনকে সম্পূর্ণ যান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল করে তোলে। ফলে বিদ্যুৎ না থাকলে অভ্যন্তরীণ পরিবেশ দ্রুত অস্বাস্থ্যকর হয়ে ওঠে, যা শুধু উৎপাদনশীলতাই নয়, স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ায়। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত ঘাটতি হলো দেশে বড় ভবনগুলোর জ্বালানি ব্যবহার, এসি নির্ভরতা এবং শক্তি দক্ষতা নিয়ে কোনো সমন্বিত জাতীয় ডেটাবেজ নেই। এক্ষেত্রে ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির (আইইএ) সুপারিশ, ভবনভিত্তিক শক্তি ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের জন্য ডেটাচালিত নীতিমালা অপরিহার্য। বাংলাদেশে এ ধরনের একটি ডেটাবেস গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কিছু তাৎক্ষণিক ও মধ্যমেয়াদি সমাধান গ্রহণ করা যেতে পারে। যেমন হাইব্রিড ভেন্টিলেশন পদ্ধতি, যেখানে প্রাকৃতিক ও যান্ত্রিক উভয় বায়ু চলাচল ব্যবস্থার সমন্বয় করা হয়। এ পদ্ধতি ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ায় সফলভাবে প্রয়োগ হয়েছে। এছাড়া অপারেবল জানালা সংযোজন, ভেন্টিলেশন শ্যাফট এবং করিডোরভিত্তিক বায়ুপ্রবাহ উন্নয়ন বিদ্যমান ভবনগুলোকে আংশিকভাবে হলেও শক্তি-দক্ষ করতে পারে। প্রযুক্তিগতভাবে বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (বিএমএস), ইনভার্টার এসি, এলইডি লাইটিং এবং সেন্সরভিত্তিক অটোমেশন ব্যবহারে শক্তি সাশ্রয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব। পাশাপাশি ‘কুল রুফ’ প্রযুক্তি ভবনের তাপমাত্রা ২-৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমাতে সক্ষম, যা সরাসরি এসির ব্যবহার কমায়। সবুজ ছাদ ও নগর বৃক্ষায়নও তাপদ্বীপ প্রভাব কমাতে কার্যকর।
দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশে বাধ্যতামূলক ‘বিল্ডিং এনার্জি রেটিং সিস্টেম’ চালু করা অত্যন্ত জরুরি—যেমনটি LEED (USA), BREEAM (UK) বা Green Mark (Singapore)-এ দেখা যায়। এ প্রক্রিয়ায় ভবনের নকশা পর্যায় থেকেই শক্তি দক্ষতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে একটি স্বতন্ত্র ‘বিল্ডিং এনার্জি অথরিটি’ গঠন করা প্রয়োজন, যা ভবনের নকশা অনুমোদন, নির্মাণ তদারকি এবং ব্যবহার পর্যায়ে কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন করবে। একই সঙ্গে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় বিল্ডিং সায়েন্স ও এনার্জি এফিসিয়েন্সি বিষয়ক বিশেষায়িত শিক্ষা ও গবেষণা জোরদার করা জরুরি। ভবিষ্যতের নগর পরিকল্পনায় প্যাসিভ ডিজাইন একটি অপরিহার্য উপাদান হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। ভবনের দিকনির্দেশনা, ছায়া নিয়ন্ত্রণ, প্রাকৃতিক আলো ব্যবহার এবং ক্রস ভেন্টিলেশন নিশ্চিত করে এমন নকশা বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে গবেষণা ও উদ্ভাবন—যেমন স্মার্ট ফ্যাসাড, ডাবল-স্কিন ফ্যাসাড, অ্যাট্রিয়াম ডিজাইন—নগর ভবনকে আরো অভিযোজনযোগ্য করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে পুরনো ভবনগুলোর জন্য ‘রেট্রোফিটিং’ কর্মসূচি এবং প্রণোদনা প্রদান ভবিষ্যৎ ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হবে।
এশিয়া গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সঠিক নীতি, প্রযুক্তি এবং আর্থিক প্রণোদনার সমন্বয় ঘটানো গেলে ভবন খাতে উল্লেখযোগ্য শক্তি সাশ্রয় সম্ভব, যা নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তা কমাতেও সহায়ক হতে পারে। এছাড়া উন্নত বিল্ডিং কোড, শক্তি লেবেলিং এবং পারফরম্যান্স মনিটরিং ব্যবস্থার অভাব এশিয়ার অনেক দেশে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তাই পরিকল্পিত নীতিগত হস্তক্ষেপ, দক্ষ নির্মাণ প্রযুক্তি এবং তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এ খাত ভবিষ্যতে টেকসই নগর উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।
সবশেষে এ সংকট আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু স্থায়ী সমাধান নিহিত রয়েছে স্থাপত্য, প্রযুক্তি ও নীতিমালার সমন্বিত পরিবর্তনে। প্রাকৃতিক বায়ু চলাচলভিত্তিক নকশা এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি টিকে থাকার শর্ত। অতএব উন্নয়নের সংজ্ঞা পুনর্বিবেচনা করে আমাদের এমন নগর গড়ে তুলতে হবে, যা হবে শক্তি-দক্ষ, পরিবেশবান্ধব ও মানবিক। ভবিষ্যতের স্থাপত্য হবে সেই স্থাপত্য যেখানে প্রকৃতি ও প্রযুক্তির মধ্যে থাকবে সুষম সহাবস্থান।


