নতুন দায়িত্বে ১৭ অতিরিক্ত ডিআইজি
এপ্রিল ১৬, ২০২৬
টাইম ম্যাগাজিনের প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির তালিকায় তারেক রহমান
এপ্রিল ১৬, ২০২৬
নতুন দায়িত্বে ১৭ অতিরিক্ত ডিআইজি
এপ্রিল ১৬, ২০২৬
টাইম ম্যাগাজিনের প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির তালিকায় তারেক রহমান
এপ্রিল ১৬, ২০২৬

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ৫ বছরে রোগীর চাপ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ সংকটে স্বাস্থ্যসেবা

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঁচ বছরের ব্যবধানে রোগীর চাপ প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে।

২ হাজার ২০০ শয্যার এ হাসপাতালে বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ ও ওয়ার্ড সবখানেই প্রতিদিন উপচে পড়া ভিড় সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সীমিত অবকাঠামো ও জনবল নিয়ে অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামাল দিতে গিয়ে হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা সংকটে পড়ছে।

হাসপাতাল সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২০ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে জরুরি বিভাগে রোগী বেড়েছে ৯১ শতাংশ, যা প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি। একই সময়ে বহির্বিভাগে রোগী বেড়েছে ৫২ শতাংশ এবং ওয়ার্ডে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেড়েছে ৬৫ শতাংশ। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩ হাজার ৮৩৬ জন বহির্বিভাগে, ১ হাজার ১৪১ জন জরুরি বিভাগে ও ৮২৯ জন রোগী ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিচ্ছে। একই সঙ্গে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩৭ রোগীর মৃত্যু হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও জনবল না বাড়লে চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রধান এ হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা আরো চাপে পড়বে। এছাড়া উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে চিকিৎসাসেবার মান বাড়াতে হবে। স্বাস্থ্যসেবায় প্রকৃত পরিবর্তন আনতে হলে শুধু অবকাঠামো নয়, বরং ব্যবস্থাপনার সংস্কার ও সরকারি আন্তরিকতা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসক বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাহফুজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত কয়েক বছরে রোগীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হলেও সে অনুপাতে বিকেন্দ্রীকৃত সেবা গড়ে ওঠেনি। ফলে উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসার সুযোগ থাকলেও রোগীরা চমেকমুখী হচ্ছে। বিষয়টি সমাধানের জন্য প্রথমেই জোর দিতে হবে উপজেলা ও প্রান্তিক হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর। উপজেলা হাসপাতালগুলোতে মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি, ইএনটিসহ একাধিক পদের চিকিৎসা থাকলেও রোগীরা সেখানে চিকিৎসার জন্য না গিয়ে চমেকে যাচ্ছে। ওয়ার্ডগুলোতে বাড়তি চাপ তৈরি করছে। উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা শক্তিশালী করা গেলে গ্রামের রোগীদের আর অপ্রয়োজনে মেডিকেল কলেজে আসার প্রয়োজন হবে না।’

তিনি আরো বলেন, ‘চট্টগ্রাম নগরীর রোগীর চাপ কেন জেনারেল হাসপাতালে থাকবে না? সব কেন চট্টগ্রাম মেডিকেলে গিয়ে পড়বে। এ এলাকার মানুষের চিকিৎসাসেবা বাড়াতে হলে জেনারেল হাসপাতালকে উন্নত করা জরুরি, যাতে সেগুলোতে রোগীর আস্থা তৈরি হয় এবং চাপ কিছুটা ভাগ হয়ে যায়। নতুন বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে চিকিৎসকদের গ্রামমুখী রাখতে তাদের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। উপজেলা পর্যায়ের চিকিৎসকদের কর্মস্থলে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ। সে কারণে চাকরির শর্ত অনুযায়ী কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিতের পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়ের চিকিৎসকদের প্রয়োজনীয় প্রণোদনা ও যাতায়াত সুবিধা দিতে হবে।’

তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৫ সালে মোট ১০ লাখ ৯৩ হাজার ৩৬৮ রোগী চমেকের বহির্বিভাগে টিকিট কেটে চিকিৎসা নিয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ৩ হাজার ৮৩৬ জন চিকিৎসা নিয়েছে। অন্যদিকে ২০২০ সালে বহির্বিভাগে ৫ লাখ ৩১ হাজার ১৮৭ জন চিকিৎসা নেয়। বছরে গড়ে প্রতিদিন ১ হাজার ৮৯৭ জন চিকিৎসা নিয়েছিল। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে বহির্বিভাগে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে ৫ লাখ ৬২ হাজার ১৮১ বা ৫২ দশমিক ৪২ শতাংশ।

এদিকে জরুরি বিভাগে ২০২০ সালে ২ লাখ ১৮ হাজার ২৪৮ জন চিকিৎসা নেয়। গড়ে প্রতিদিন ৫৯৮ জন রোগী চিকিৎসা নেয় ওই বছর। তবে ২০২৫ সালে চমেকের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো চার লাখের বেশি বা ৪ লাখ ১৬ হাজার ৪২২ জন চিকিৎসা নিয়েছে। গড়ে প্রতিদিন ১ হাজার ১৪১ জন চিকিৎসা নিয়েছে। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে জরুরি বিভাগে রোগী বেড়েছে ১ লাখ ৯৮ হাজার ১৭৪ জন বা ৯১ শতাংশ।

অন্যদিকে ২০২০ সালে ওয়ার্ডে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৯৬ হাজার ৭৬৬। গড়ে প্রতিদিন রোগী ভর্তি হয় ৫৩৮ জন। সেখানে ২০২৫ সালে রেকর্ড ৩ লাখ ২ হাজার ৬৪৭ জন ওয়ার্ডে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। গত বছর গড়ে প্রতিদিন চিকিৎসা নিয়েছে ৮২৯ জন। পাঁচ বছরের ব্যবধানে ১ লাখ ৫ হাজার ৮৮১ জন বা ৬৫ শতাংশ বেশি রোগী চমেকের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে।

এদিকে ২০২৫ সালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৩ হাজার ৩৫০ রোগী মারা গেছে। অর্থাৎ দিনে গড়ে প্রায় ৩৭ জন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে। গত পাঁচ বছরের তথ্য অনুযায়ী, চমেকে গড়ে প্রতিদিন ৩৭ থেকে ৪১ জন মারা যাচ্ছে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বিভাগের কোটি কোটি মানুষের চিকিৎসার আশ্রয়স্থল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। প্রতি বছর রোগীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। অবকাঠামোগত সংকট কিংবা চাহিদা অনুযায়ী চিকিৎসকের সংকট থাকলেও চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন। ছুটির দিনেও চিকিৎসকরা ডিউটি পালন করছেন। চমেকের বার্ষিক বাজেট ১৯৮ কোটি টাকা। এ বাজেটের বেশির ভাগই ওষুধ, ডাক্তারদের বেতন দিতেই খরচ হয়ে যায়। তাছাড়া রোগীদের খাবার, হাসপাতালের পরিচালন ব্যয়ও এ বাজেটের মধ্যে। দেশের অন্যান্য মেডিকেলের তুলনায় রোগী এখানে বেশি হলেও হাসপাতালের বাজেট কমই।’

বিভিন্ন ওয়ার্ডে ডাক্তার পদায়ন থাকলেও রোগীর অনুপাতে চিকিৎসক সংখ্যা কম জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘আমরা বাজেট এবং নতুন চিকিৎসকদের নিয়োগ বা পদায়নের জন্য বিভিন্ন সময়ে চিঠি দিয়েছি। হাসপাতালে রোগীর বৃদ্ধির কথা বিবেচনা করে নতুন নতুন ওয়ার্ড স্থানান্তর ছাড়াও বার্ন ইউনিট, নতুন ক্যান্সার হাসপাতালসহ নতুন অবকাঠামো নির্মাণের কাজ চলমান আছে। এ অবকাঠামোগুলো চালু হলে রোগীদের ভোগান্তি ও চাপ কমে যাবে।’

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ৮ ও ৯ নং শিশু ওয়ার্ডে শয্যার কয়েক গুণ বেশি রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে। হামের জন্য আলাদা ওয়ার্ডের পাশাপাশি শিশু রোগীদের ওয়ার্ডের নিচ থেকে শুরু করে বাইরে সিঁড়ির পাশে নিচে বেড বসিয়ে চিকিৎসাসেবা দেয়া হচ্ছে। এছাড়া হৃদরোগ, অর্থোপেডিকসসহ অন্যান্য ওয়ার্ডেও শয্যার অতিরিক্ত রোগী চিকিৎসাসেবা নিচ্ছে। বাড়তি রোগীদের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন কর্তব্যরত চিকিৎসকরাও।

চিকিৎসকরা জানান, চমেকের ওয়ার্ডগুলোতে শয্যার অতিরিক্ত রোগীদের চিকিৎসা দিতে হয় বছরের বেশির ভাগ সময়েই। হাসপাতালটি এ অঞ্চলের কয়েক কোটি মানুষের চিকিৎসার শেষ নির্ভরতা। বেসরকারি হাসপাতালগুলোর চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহ করা সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। চমেকের বিভিন্ন ওয়ার্ডে নিয়মিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের উপস্থিতি থাকার কারণে রোগীরা চমেকে ভিড় করে। তাছাড়া স্বল্প খরচ, রোগ-ব্যাধি পরীক্ষার ব্যয় কম থাকাও রোগী বাড়ার বড় কারণ। তবে মূল সংকট হলো উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা উন্নত না করা। যে কারণে ছোটখাটো চিকিৎসার জন্য রোগীরা উপজেলায় না গিয়ে চমেকে চলে আসে। চিকিৎসকের পাশাপাশি নার্স, ওয়ার্ডবয়সহ তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর লোকবল নিয়োগের পাশাপাশি নির্মিত অবকাঠামো দ্রুত শেষ করার দাবি জানান তারা।

সার্বিক বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর চট্টগ্রামের বিভাগীয় পরিচালক ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রোগীদের অতিরিক্ত চাপ সহ্য করে চমেকে চিকিৎসকদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে যেতে হচ্ছে। চট্টগ্রামের হাটহাজারী, পতেঙ্গায় নতুন হাসপাতাল নির্মাণ, কর্ণফুলীতে ৫০ শয্যার হাসপাতালকে ২৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ ছাড়াও ফৌজদারহাটে হাসপাতাল নির্মাণের বিষয়গুলো সরকারের পরিকল্পনা পর্যায়েই আটকে আছে। তাছাড়া জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা কীভাবে বাড়ানো যায় সেটিও আটকে আছে মন্ত্রণালয়ে। নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। তারা চট্টগ্রামের চিকিৎসাসেবা বাড়ানোর দিকে অবশ্যই মনোযোগ দেবে। আমরাও সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলকে বারবার তাগাদা দিচ্ছি। আশা করছি দ্রুতই সমস্যা সমাধানের পথ খুলবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *