
৬ জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় সাতজনের মৃত্যু
এপ্রিল ১৩, ২০২৬
ছেলেকে কুপিয়ে ৩ তলা থেকে ঝাঁপ দিয়ে সাবেক পুলিশ সদস্যের মৃত্যু
এপ্রিল ১৩, ২০২৬নিয়ানডার্থাল বা ইরেকটাস প্রজাতির মানুষদের বর্ষপঞ্জিকা বিষয়ে আমাদের জানা নেই। বর্ষবিদায় বা বরণে তারা কি কোনো কৃত্য আয়োজন করতেন? কিংবা ঋতুর সন্ধিক্ষণ তাদের কাছে কেমন ছিল কে জানে?
আমরা কেবল হোমো স্যাপিয়েন্স মানুষের ঋতুবন্দনা বিষয়ে কিছুটা আন্দাজ রাখি। এক্ষেত্রে আমার জানাবোঝার খতিয়ান আরো ক্ষুদ্র। কেবল বাংলাদেশের সামাজিক ভূগোল। তাও দেশের সব বাস্তুতন্ত্রের সর্বজনের ঋতুভিত্তিক আচাররীতি দেখা হয়নি। এমনকি এ নিয়ে কোনো বিশ্বস্ত দলিলায়নও নাগালের বাইরে। কেবল চৈত্রসংক্রান্তি ও নববর্ষ ঘিরে কিছু লেখা ও আলাপ দেখা যায়। এসব আলাপের জমিনজুড়ে থাকে বানোয়াট বাইনারি বর্ণবাদী বক্তব্য। খণ্ডিত ও অসম্পূর্ণ সেসব অতি জাত্যভিমানী বয়ান গ্রামবাংলার ঋতুভিত্তিক পরবের সঙ্গে আমাদের কোনো দায়িত্বশীল ও দায়বোধের সম্পর্ক গড়ে তোলে না। অধিকাংশ আলাপজুড়ে থাকে গ্রামীণ লোকায়ত সংস্কৃতি ‘উদ্ধারের’ নামে জাদুঘরকরণ ও অপরায়ণের বাহাদুরি।
বিশেষ করে বর্ষবিদায় ও বরণের সন্ধিক্ষণে দেশে একটা প্রবল বাইনারি তর্ক উসকে দেয়া হয়। বর্ষবরণের শোভাযাত্রা ‘মঙ্গল’, ‘আনন্দ’ নাকি ‘বৈশাখী’। এসব তর্ক তুমুলভাবে ঔপনিবেশিক বিশ্বাস ও বাইনারি বয়ানের দেয়াল প্রতিষ্ঠা করে। একই সঙ্গে এসব বয়ান এ জনপদের ঐতিহাসিক গ্রামীণ উৎপাদন সম্পর্ক এবং ঋতুভিত্তিক কৃত্য-আরাধনার সঙ্গে নিজেদের বিচ্ছিন্নতা ও দূরত্বের প্রমাণ হিসেবেই টিকে থাকে। যারা এ বয়ানের মাধ্যমে বিতর্ক উসকে দেন তারা কেউ অবশ্য বর্ষবরণ উৎসব আয়োজনের কারিগর নন। ঋতুভিত্তিক আয়োজনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা ও স্থানীয় প্রাণ-প্রকৃতির সুরক্ষায় কোনো অবদানও তাদের নেই। বরং বিতর্কের মাধ্যমে গ্রামীণ নিম্নবর্গের সাংস্কৃতিক বিনির্মাণ ধারাকেই তারা নিশ্চিহ্ন করে ফেলছেন। চৈত্রসংক্রান্তিতে এলাকাভেদে ১৪ থেকে ২৯ তিতা শাক বা পাহাড়ে মূলবিজুর দিনে বুনো সবজি দিয়ে পাজন খেতে হয়। যারা ‘মঙ্গল-আনন্দ-বৈশাখীর’ বাইনারি জিইয়ে রাখতে চান, তারা কি কোনোদিন এসব তিতা শাক বা বুনো সবজির খোঁজ রেখেছেন? কীভাবে তথাকথিত উন্নয়ন মারদাঙ্গার জুলুমের ভেতর টিকে থাকার লড়াই করছে বর্ষবিদায় ও বরণের সব দেশজ প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক উপকরণ। যেসব শাকলতা, ফুলপাতা ছাড়া ঋতুভিত্তিক আয়োজন অসম্ভব, সেসব আজ বেঘোরে মরছে বিষনির্ভর খাদ্যোৎপাদন বাণিজ্যের নামে। জমিতে বিষ দিয়ে বর্ষবিদায় ও বরণের তিতা শাকদের হত্যা করার ঘোষণা জারি রাখা আছে।
‘মঙ্গল-আনন্দ-বৈশাখীর’ মুখপাত্ররা কখনো কি শাকলতা হত্যাকারী কৃষি প্রকল্প বা বিষ কোম্পানিদের জুলুমকে প্রশ্ন করতে পেরেছেন? ‘মঙ্গল-আনন্দ-বৈশাখীর’ মুখপাত্ররা দেশের যেকোনো কীটনাশকের দোকানে গিয়ে আগাছানাশক বা হার্বিসাইডের বোতল/প্যাকেট হাতে নিয়ে দেখতে পারেন। ওখানে ছবিসহ দেশের নিরীহ ভেষজ খাদ্য শাকলতা মেরে ফেলার নির্দেশনা আছে। কিন্তু চারধারের পরিবার-পরিজন-প্রতিবেশী প্রবীণদের প্রাণ-প্রকৃতির এসব উপাদানের কথা জিজ্ঞেস করুন। এসব ছাড়া এ জনপদের ঋতুভিত্তিক কৃত্য-পরব-আয়োজন সম্ভব নয়। ‘মঙ্গল-আনন্দ বা বৈশাখীর’ যেকোনোটিও যদি নির্ধারিত হয় আর নিখোঁজ হয়ে যায় তিতা শাক কিংবা পাহাড়ি বুনো সবজি, ভাতজরা ফুল বা নাগেশ্বর কিংবা ভাঁট ফুল বা কাঁচা আম; তাহলে কি চৈত্রসংক্রান্তি, নববর্ষ, বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু, বিষু বা চানক্রানের মতো বর্ষবিদায় ও বরণের আয়োজন সম্ভব? প্রকৃতি ও সংস্কৃতির বিজ্ঞানে এটি সম্ভব নয়। কারণ এসব আয়োজন প্রকৃতির বিজ্ঞানকে পাঠ করে দীর্ঘদিনের সমষ্টিগত লোকায়ত অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে বিকশিত হয়েছে। জোরজবরদস্তি করে ‘বিনোদনের কোলাহল’ তৈরি করা গেলেও প্রাণ-প্রকৃতি ও গ্রামীণ উৎপাদন সম্পর্কের প্রতি দায়িত্বশীল সম্পর্ক গড়ে তোলা যায় না।
বৈশাখে ভাটিপরব, জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে কর্মাদি, শ্রাবণে করন্ডি, ভাদ্রে কারাম, আশ্বিনে দাসাই, কার্তিকে জালাবর্ত, অগ্রহায়ণে ওয়ান্না, পৌষে পুষরা, মাঘে বাঘাই শিরনি, ফাল্গুনে ঘাটাবান্ধা আর চৈত্রে চইতপরব বা চৈত্রসংক্রান্তি। একেক ঋতুতে প্রকৃতি নানা প্রাণের ভেতর দিয়ে তার সমাপনী ও শুরুর নির্দেশনা জানায়। প্রকৃতির নয়া শস্য ফসল গ্রহণ ও ব্যবহারের জন্য অনুমতি প্রার্থনা এবং আশীর্বাদের তরে নানা সমাজ আয়োজন করে নানা কৃত্য। ফাল্গুনে ভাঁট, শাল, মহুয়া, মিষ্টিকুমড়া, বিলিম্বি, ভেন্না, আমরুল, নাগেশ্বর, পলাশ, কাঁঠালিচাপা, দোলনচাঁপা, কনকচাঁপা ফোটে। প্রকৃতি জানান দেয় বসন্ত ঋতু এসেছে। বসন্ত থেকে গ্রীষ্মকালে যাওয়ার প্রস্তুতিলগ্নে ঋতুর সন্ধিক্ষণেই আয়োজিত হয় বর্ষবিদায় ও বরণের কৃষিজ আচাররীতিগুলো। প্লাস্টিকের ফুল বা বিষাক্ত সিসায় ভরপুর বহুজাতিক খেলনার মেলা বসিয়ে এসব কৃষিজ রীতির প্রতি সম্মান ও সুরক্ষার আওয়াজ সম্ভব নয়।
ঐতিহাসিকভাবে গ্রামীণ নিম্নবর্গের জীবনে চৈত্রসংক্রান্তি কি মাসপহেলা বা ‘নববর্ষের’ দিন ইলিশ মাছ খাওয়ার চল নেই। কারণ দেশের সর্বত্র ইলিশ মাছ পাওয়া যায় না। তাছাড়া এ সময়টা ইলিশের মৌসুমও নয়। অথচ একটা লম্বা সময় জবরদস্তি করে ‘পান্তা-ইলিশকে’ বর্ষবিদায় ও বরণের আইকনিক অনুষঙ্গ বানানো হয়েছিল। বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ হয়ে উঠেছে কেবল হালখাতা, পান্তা-ইলিশ, সাদা-লাল কাপড়ের এক বৈচিত্র্যবিমুখ শহুরে জমায়েত। ঋতুর প্রতি কৃতজ্ঞতা কি নতজানু প্রবৃত্তি হারিয়ে গেছে। প্রকৃতির চিহ্নের প্রতি দায় ও দায়িত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে উঠেছে এক নতুন প্রজন্ম। আমরা এসব জবরদস্তির বিরুদ্ধে প্রমাণ ও চর্চাসহ সোচ্চার থেকেছি। বিগত কয়েক বছরে এ চল অনেকটাই কমে এসেছে। রাষ্ট্র এ সময় ইলিশ ধরার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞাও জারি করতে বাধ্য হয়েছে। বরং বর্ষবিদায় ও বরণের সঙ্গে জড়িত আমাদের বৈচিত্র্যময় খাদ্যসংস্কৃতিকে বেগবান করা যেত। এটি কেবল খাদ্য অর্থনীতি, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, প্রাণ-প্রকৃতি সংরক্ষণ বা সাংস্কৃতিক সামর্থ্য অর্জন নয়; বরং এর ভেতর দিয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এ জনপদের বহুত্ববাদী দর্শনটি প্রখর হতো।
ঋতুভিত্তিক উৎসব ও আয়োজনের এক অন্যতম সহযাত্রী দেশের মুমূর্ষু মেলাগুলো। যদিও আমরা বহু সুপ্রাচীন মেলাগুলোকে নিদারুণভাবে কঙ্কাল হতে শুনেছি। স্থানীয় ও দেশজ কৃষি ফসল ও কারুশিল্পের বিনিময় ও বিক্রয়ের অন্যতম স্থল হলো প্রাচীন গ্রামীণ মেলা। কিন্তু বর্তমানে দেশের প্রায় সব মেলাতেই একই ধরনের সস্তা প্লাস্টিক পণ্য ও করপোরেট পানীয় পাওয়া যায়। এসব মেলায় প্যাকেটজাত পণ্য থেকে শুরু করে মোবাইল ফোনের কার্ড পর্যন্ত পাওয়া যায়। লোহার জিনিস, মাটির জিনিসের পাশাপাশি খৈ, মুড়ি, চিড়া, নকুলদানা, কদমা, বাতাসা, জিলাপি, কটকটি, মুড়ালি, দই, ছানা, মাঠা, তালের রস, গুড় আর রঙিন কাচের চুড়িসহ হরেক রকম পুঁতির মালা ছিল এসব মেলার প্রাণ। বেদে নারীরা মেলায় চুড়ি ও মালা বিক্রি করতেন। চড়ক আর বৈশাখী মেলাতেই বেশি বিক্রি হতো বেদে নারীদের নিজস্ব সংগৃহীত মুক্তা ও মুক্তার নাকফুল কি মালা। মিলত পঞ্জিকা, পুঁথি, পাঁচালি, নামাজশিক্ষা, স্ত্রীশিক্ষা, লতাপাতার গুণ, ব্রতকথাসহ নানান পুস্তিকা। পাওয়া যেত কাঠের মালা, তুলসী মালা, চন্দন, আবির, শাঁখা-সিন্দুর, তিলকমাটি, নীলমাটি, তসবিহ, টুপি, তাবিজ, মাদুলি, গামছা। নিরাপদ কৃষি ফসল এবং দেশজ কুটির শিল্পভিত্তিক গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা করতে ঋতুভিত্তিক উৎসবে দেশীয় মেলাগুলোর জনযাচাই জরুরি। গ্রামীণ ফসল, হস্তশিল্প, কারুকাজ ও শিল্পকর্মকেই মেলায় প্রদর্শন ও বিক্রয়ের অগ্রাধিকার দেয়া দরকার।
মানুষ, ফুল, পাখি, ঝিরি, মাটি কি মেঘ সব মিলিয়েই সংসার। এটিই এ জনপদের নিম্নবর্গীয় দর্শন। একেক ঋতুতে প্রকৃতির একেক নির্দেশনা। একেক ঋতুতে প্রকৃতির একেক উপহার। মানুষের সমাজ তা গ্রহণ করে প্রকৃতির কাছে অনুমতি নিয়ে। প্রকৃতির কাছে নতজানু হয়ে। প্রকৃতির কাছে আশীর্বাদ প্রার্থনা করে। আর তাই ঐতিহাসিক কায়দায় রচিত হয়েছে বর্ষবিদায় ও বরণের নানা কৃত্য, নানা আয়োজন। কিন্তু দিনে দিনে ঋতুভিত্তিক সব স্থল ও ব্যঞ্জনা বদলে ফেলা হচ্ছে। দখল ও দূষণ জারি আছে। এসব যাবতীয় সংকট ও ঝুঁকি কাঠামোগত বৈষম্য এবং নয়াউদারবাদী ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত। বৈষম্য ও নয়াউদারবাদকে প্রশ্ন না করে ‘মঙ্গল-আনন্দ বা বৈশাখীর’ তর্ক ও ফয়সালাতেই কি বর্ষবিদায় ও বরণের আয়োজন এবং আয়োজনের সঙ্গে বহুমুখী বহুস্তরীয় গ্রামীণ জীবনের ন্যায্যতা সম্ভব?
অ্যাপোলোর চন্দ্র অভিযানের প্রায় ৫৪ বছর পর আবারো স্যাপিয়েন্স মানুষ আর্টেমিসে করে পৃথিবী থেকে সবচেয়ে বেশি দূরত্বের পথ অতিক্রম করে চাঁদের কক্ষপথে গেছে। চাঁদের বলয় থেকে এক যুদ্ধাক্রান্ত বিমর্ষ পৃথিবীকে দেখেছেন তারা। সৌরজগতের এ এক খুদে গ্রহে কত বিবাদ, কত বাইনারি, কত বারুদ, কত বাহাদুরি। বর্ষবিদায় ও বরণ আয়োজনের এক শোভাযাত্রার নাম কী হবে—সেই বিবাদকে সামনে রেখে আড়াল হয়ে যাচ্ছে দেশের মেলা হারানোর করুণ কাহিনী। দেশের মৃৎশিল্প, কারুশিল্প ও কুটির শিল্প পতনের নির্দয় আহাজারি। প্রবল বয়ানের ইটের তলায় চাপা পড়ছে তিতা শাক, বুনো ফুল ও প্রাণ-প্রকৃতির রক্তাক্ত শরীর। অথচ আমাদের সব অঞ্চল ও সমাজবর্গের ঋতুভিত্তিক সব কৃত্য, আয়োজন ও উৎসবকে কেন্দ্রে রেখে গ্রামীণ অর্থনীতি সক্রিয়করণের জন্য আলাপ দরকার। আর এ আলাপেই সংস্কৃতি ও প্রকৃতি সুরক্ষার যুগলবন্দিকে দর্শন হিসেবে পাঠ করা জরুরি। বর্ষবিদায় ও বরণের কৃত্য মূলত আমাদের এ বার্তাই দেয়। আমরা কি সর্বপ্রাণ ও সর্বজনের এ বার্তা পাঠ করতে প্রস্তুত?


