সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল ৭ জনের
এপ্রিল ১২, ২০২৬
আরব সাগরে জাহাজ থেকে বাংলাদেশীসহ ১৮ নাবিক উদ্ধার
এপ্রিল ১২, ২০২৬মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে ঐতিহাসিক বৈঠকে মুখোমুখি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর এ প্রথম দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা সরাসরি একই টেবিলে বসলেন।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গতকাল শুরু হওয়া এ ত্রিপক্ষীয় আলোচনায় লেবাননে যুদ্ধবিরতি এবং ইরানের জব্দ করা সম্পদ ছাড়ের মতো জটিল বিষয়গুলো নিয়ে কিছুটা অগ্রগতির আভাস মিলেছে। দুই প্রতিনিধি দলের মধ্যে লিখিত বার্তা বিনিময়ও হয়েছে। তবে হরমুজ প্রণালি নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে প্রবল মতবিরোধ দেখা গেছে। মূলত পরোক্ষ আলোচনা হিসেবে পরিকল্পিত বৈঠকটি শেষ পর্যন্ত মুখোমুখি আলোচনায় রূপ নেয়াকে কূটনৈতিক মহলে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। গতকাল গভীর রাত পর্যন্ত রুদ্ধদ্বার এ আলোচনা চালিয়ে গেছে উভয় পক্ষ। সূত্র জানিয়েছে, আজও আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে পাকিস্তান। তবে দুই পক্ষের দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস, ট্রাম্পের উত্তেজনামূলক সামাজিক মাধ্যম পোস্ট এবং হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ প্রবেশের খবরকে ঘিরে তৈরি হওয়া উত্তেজনা স্পষ্ট করে দিচ্ছে, চূড়ান্ত সমাধানের পথ এখনো বন্ধুর। এরই মধ্যে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহু গতকাল রাতে ঘোষণা দিয়েছেন ইরানে হামলা চালিয়ে যাবে তেল আবিব।
আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী কথা ছিল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দল আলাদা কক্ষে অবস্থান করবে এবং পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীরা দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করবে। অর্থাৎ পরোক্ষ আলোচনার মাধ্যমে কাজ চলবে। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। দুটি প্রতিনিধি দল পরোক্ষ নয়, বরং সরাসরি আলোচনায় অংশ নেয়। পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীরাও সে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি আলোচনা শুরু হয়েছে বলে হোয়াইট হাউজও নিশ্চিত করেছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, কারণ ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি আলোচনা বহু বছর ধরে প্রায় অনুপস্থিত ছিল। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ বৈঠকের গুরুত্ব এখানেই যে দীর্ঘ সময় পর সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে একটি যোগাযোগের পথ তৈরি হয়েছে। অতীতে যেখানে বার্তা আদান-প্রদান হতো তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে, সেখানে এখন দুই পক্ষ মুখোমুখি বসছে, যা ইতিবাচক।
প্রথম দফার আলোচনা প্রায় ৬ ঘণ্টারও বেশি স্থায়ী হয়। উভয় পক্ষ শুরুতে কঠোর অবস্থান নিয়ে আলোচনায় আসে, কিন্তু ধীরে ধীরে কিছু বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে বলে জানা গেছে। যে বিষয়গুলো আলোচনায় উঠে এসেছে তার মধ্যে অন্যতম লেবাননে যুদ্ধবিরতি। আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধে যুদ্ধবিরতির বিষয়ে মৌলিক শর্তগুলো নিয়ে কিছুটা অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। পুরোপুরি যুদ্ধবিরতির বিষয়ে এখনো ঐকমত্য হয়নি, তবে দক্ষিণ লেবাননে হামলা সীমিত রাখার একটি সম্ভাব্য সমঝোতার কথা শোনা যাচ্ছে। ইরানের জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করার বিষয়েও কিছুটা নড়াচড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সূত্রগুলো জানাচ্ছে। যদিও এখনো অনেক কিছু নিশ্চিত হওয়া বাকি এবং সময়ও অনেক কম। তবে পাকিস্তান একটি অগ্রগতির সম্ভাবনা নিয়ে এখনো আশাবাদী। এছাড়া হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, এ ইস্যুতে উভয় পক্ষের মধ্যে ব্যাপক মতবিরোধ দেখা দেয়। ইরানি প্রতিনিধি দলের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো আল জাজিরাকে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দাবিগুলো ‘অত্যন্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষী’, ফলে আলোচনা কার্যত অচলাবস্থায় পড়েছে।
এদিকে মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের পক্ষ থেকে জোর চেষ্টা করা হচ্ছে আজও আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার। আল–জাজিরা বলছে, পাকিস্তানের পক্ষ থেকে একটি প্রচেষ্টা চলছে যাতে এ আলোচনা আরো একদিন চালিয়ে যায় দুই পক্ষ। এতে এমন কিছু বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে, যা দুই পক্ষকে চুক্তির দিকে নিয়ে যেতে পারে। প্রথম দফার আলোচনায় দুই পক্ষ সেই পর্যায়ে পৌঁছেনি। তবে আজও আলোচনা অব্যাহত থাকবে কিনা বা মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার সময়সূচি পেছাবেন কিনা—এসব বিষয়ে কোনো স্পষ্টতা মেলেনি। ভ্যান্সের পাকিস্তান সফর ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের হওয়ার কথা ছিল। অন্যদিকে মধ্যরাতের পর পৌঁছানো ইরানি প্রতিনিধি দলও গতকাল ব্যস্ত দিন কাটিয়েছে।
আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তার সঙ্গে ছিলেন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। অন্যদিকে ৭০ জনেরও বেশি সদস্য নিয়ে গঠিত ইরানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে ছিলেন সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।
এদিকে বৈঠক চলাকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে একাধিক পোস্ট দেন, যা আলোচনার পরিবেশে উত্তেজনা তৈরি করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ট্রাম্প দাবি করেন, মিডিয়া ইরানকে বিজয়ী হিসেবে উপস্থাপন করছে, এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। তিনি লেখেন, ‘বাস্তবে সবাই জানে তারা হারছে এবং বিশাল ব্যবধানে হারছে।’ ট্রাম্প আরো দাবি করেন, ইরানের আর কোনো নৌবাহিনী নেই, বিমান বাহিনী নেই এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেই। উপরন্তু তিনি ইরানের প্রয়াত নেতাদের প্রসঙ্গ তুলে ব্যঙ্গাত্মক ভাষায় মন্তব্য করেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের এ পোস্টগুলো আলোচনার পরিবেশে জটিলতা তৈরি করেছে। ভ্যান্স আলোচনা শুরুর আগে সতর্কতার সঙ্গে একটি সমঝোতামূলক পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ট্রাম্পের বিস্ফোরক ভাষার পোস্ট সেই পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
এছাড়া আলোচনা চলার সময়ই মার্কিন সামরিক বাহিনী দাবি করে, প্রথমবারের মতো হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে মার্কিন নৌবাহিনীর দুটি যুদ্ধজাহাজ। জাহাজ দুটি হরমুজের মাইন পরিষ্কার করছিল বলে দাবি করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে। ইসলামাবাদে আলোচনা চলাকালে ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যালে দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিকে পরিষ্কারের কাজ শুরু করেছে। তিনি মূলত হরমুজ থেকে মাইন সরানোর বিষয়টি ইঙ্গিত দেন। যদিও ইরান এমন দাবি পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে।
ইরানের বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, দেশটির সামরিক বাহিনীর এক কর্মকর্তা ওই খবর অস্বীকার করেছেন। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘায়ি ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান ব্রডকাস্টিংকে (আইআরআইবি) জানিয়েছেন, তাৎক্ষণিক কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর দৃঢ় হুঁশিয়ারির মধ্য দিয়ে ‘সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনা’ প্রতিরোধ করা হয়েছে। তাসনিম জানায়, একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দর থেকে হরমুজ প্রণালির দিকে এগোতে শুরু করেছিল, কিন্তু তা দ্রুতই ইরানি সামরিক বাহিনীর প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়ে। ইরান স্পষ্টভাবে পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীকে জানিয়ে দেয়, যদি জাহাজটি এগোনো অব্যাহত রাখে, তাহলে ৩০ মিনিটের মধ্যে এটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে আর তাতে ইরান-মার্কিন আলোচনা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর দৃঢ় প্রতিক্রিয়া ও আলোচক প্রতিনিধি দলের জানানো হুঁশিয়ারির খবর পাওয়ার পর মার্কিন জাহাজটিকে থামার আদেশ দেয়া হয়।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান মুখোমুখি এ আলোচনায় পাকিস্তানের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্লেষকরা বলছেন, আলোচনার গুরুত্ব কেবল ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নয়; সমগ্র বিশ্বের শান্তি, নিরাপত্তা ও জ্বালানি অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামাবাদের বৈঠকে চূড়ান্ত সমাধান না হলেও এটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। যুদ্ধবিরতির ভঙ্গুর বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে এ আলোচনা একটি সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। যদিও সেই দরজা কতটা খোলা থাকবে, তা নির্ভর করছে পরবর্তী কয়েকটি দিনের ওপর। সমঝোতা না হলেও সরাসরি সংলাপ শুরু হয়েছে এটাই আপাতত বড় অর্জন।


