
রাঙ্গামাটিতে বিদেশী পিস্তলসহ অস্ত্র উদ্ধার
এপ্রিল ১১, ২০২৬
রাজধানীর তিন বাস টার্মিনাল চলছে ধারণক্ষমতার চার গুণ, বাড়তি বাসের রুট পারমিট বাতিলের পরিকল্পনা
এপ্রিল ১১, ২০২৬গত ২২ মার্চ কুমিল্লার পদুয়ার বাজার এলাকায় রেলের লেভেল ক্রসিংয়ে ট্রেনের ধাক্কায় একটি বাসের ১২ যাত্রী নিহত হন।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনকালে রেলপথমন্ত্রী নিহতদের ১ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেয়ার ঘোষণা দেন। কিন্তু তহবিলের অপর্যাপ্ততায় এখনো ঘোষিত অর্থ দিতে পারেনি রেলওয়ে। এমনকি দুর্ঘটনায় নিহতদের ক্ষতিপূরণ, আহতদের চিকিৎসা তদারকির বিষয়ে রেলওয়ের পক্ষ থেকে কোনো যোগাযোগও করা হয়নি। নিজেদের অবকাঠামো ও কর্মীর গাফিলতিতে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রেও শত বছরের পুরনো আইনের দোহাই দিয়ে উদাসীন রয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ।
১৮৯০ সালের রেলওয়ে আইনের ৮২-এ ধারায় যাত্রীবাহী ট্রেনের দুর্ঘটনায় রেল কর্তৃপক্ষের দায়দায়িত্ব উল্লেখ করা আছে। আইনটি ১৯৪৩ সালে সংশোধন করা হয়। এতে বলা হয়েছে রেল কর্তৃপক্ষের কারণে ট্রেন দুর্ঘটনায় কোনো যাত্রীর প্রাণহানি কিংবা আহত হলে অথবা যাত্রীর কর্মক্ষমতা নষ্ট হলে এজন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এমনকি যাত্রীর সঙ্গে থাকা ব্যক্তি ও মালামালের জন্যও ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। আইনে সর্বোচ্চ ক্ষতিপূরণ ১০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। চাইলে আহতদের আরো কম ক্ষতিপূরণ দেয়া সম্ভব। তবে রেল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ক্ষতিপূরণের টাকা ১০ হাজারই দেয়া হয়।
মূলত এ আইনের মধ্যে রয়েছে এক ধরনের বিভ্রান্তি, যা এখনো সংশোধন কিংবা পরিমার্জন করা হয়নি। আইনে শুধু টিকিটধারী যাত্রীদেরই ক্ষতিপূরণ দেয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কিন্তু দুর্ঘটনায় ট্রেনের যাত্রীর বাইরে (ট্রেনে কাটা পড়ে বা ট্রেনের সঙ্গে গাড়ির সংঘর্ষে) কেউ নিহত বা আহত হলে কোনো ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা নেই। এতে রেলের ট্রেন কিংবা রেলকর্মীদের ভুলে কোনো বাহ্যিক দুর্ঘটনায় মানুষ কিংবা যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষে দুর্ঘটনায় এ ধরনের ক্ষতিপূরণের বিধান রাখা হয়নি। এতে প্রতিনিয়ত রেলবহির্ভূত মানুষ ও যানবাহনের পাশাপাশি ট্রেনের ভুলে দুর্ঘটনা ঘটলেও রেলওয়ে পার পেয়ে যায় অভিযোগ থেকে।
সর্বশেষ ওই বড় ক্রসিং দুর্ঘটনায় ১২ জনের মৃত্যুর পাশাপাশি ২৪ জন বাসযাত্রী আহত হয়েছেন। রেলের নিজস্ব তদন্ত প্রতিবেদন ও কুমিল্লা জেলা প্রশাসনের গঠিত প্রতিবেদনে রেলওয়ের একাধিক কর্মীর গাফিলতির বিষয়টি উঠে আসে। এমনকি রেল প্রশাসনের বেশকিছু গাফিলতিতে ক্রসিং দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে তদন্তে উঠে এলেও রেলওয়ের এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। এমনকি দুর্ঘটনার প্রায় তিন সপ্তাহ পরও নিহত কিংবা আহতদের বিষয়ে তদারকি কার্যক্রম ছিল না। ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে এখনো নিহত পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
দুর্ঘটনায় নিহত হন ঝিনাইদহের বাসিন্দা পিন্টু ইসলামের স্ত্রী ও দুই কন্যা। তারা ঝিনাইদহ থেকে মামুন এন্টারপ্রাইজের বাসে করে নোয়াখালী যাচ্ছিলেন। জরুরি প্রয়োজনে পিন্টু ইসলাম পথে নেমে গেলে তিনি বেঁচে যান। ঘটনার পর দুই দফায় তিনি কুমিল্লায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কার্যালয়ে গিয়ে যোগাযোগ করলেও সড়ক দুর্ঘটনাজনিত দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ আদায়ের কাজে কোনো অগ্রগতি হয়নি।
যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রেলওয়ে আইনে দুর্ঘটনায় নিহতদের ১০ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেয়ার নিয়ম। এক্ষেত্রে নিহতদের রেলের যাত্রী হতে হবে। কিন্তু রেলপথ প্রতিমন্ত্রী মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে কুমিল্লার দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারকে ১ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। রেলওয়ে প্রতিমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ প্রদানে কার্যক্রম শুরু করেছি। কিন্তু রেলের আর্থিক কৃচ্ছ্রতা কর্মসূচির কারণে ক্ষতিপূরণ তহবিলের অর্থের ঘাটতি রয়েছে। প্রয়োজনীয় অর্থের বরাদ্দ পেতে কাজ শুরু করেছে রেলওয়ে।’ টাকা পাওয়া গেলে দুর্ঘটনায় নিহত পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে ক্ষতিপূরণের অর্থ পৌঁছে দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
রেলের নথিপত্র অনুযায়ী, গত ৩০ মার্চ কুমিল্লার দুর্ঘটনায় নিহতদের ক্ষতিপূরণের তহবিল অপর্যাপ্ততার বিষয়ে ক্ষতিপূরণ খাতে অর্থ বরাদ্দের জন্য চিঠি দিয়েছে পূর্বাঞ্চল কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে এ তহবিলে ৫ লাখ টাকা থাকলেও মন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী আরো ৭ লাখ টাকার ঘাটতি রয়েছে। অবিলম্বে রেলের ক্ষতিপূরণ খাতে ঘাটতি অর্থ বরাদ্দের জন্য বিশেষ অনুরোধ করা হয়। এজন্য প্রতিমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ প্রদানে প্রশাসনিক অনুমোদনের অনুরোধ করা হয়েছে।
রেলওয়ে সূত্র বলছে, আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ হিসেবে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা দেয়ার কথা থাকলেও ২০২৩ সালের ২৩ অক্টোবর ভৈরব জংশন রেলওয়ে স্টেশনে আন্তঃনগর ট্রেন ৭৫০ ডাউন (এগারসিন্ধুর গোধূলি এক্সপ্রেস)-এর সঙ্গে ৬০৪ নং ডাউন মালবাহী কনটেইনার ট্রেনের সংঘর্ষে নিহত ১৯ জন যাত্রীর প্রত্যেকের পরিবারকে ১ লাখ টাকা করে দেয়া হয়। ২০২৪ সালের ২৩ জানুয়ারি রেলওয়ের মহাপরিচালক ওই প্রশাসনিক অনুমোদন দিয়েছিলেন। এছাড়া ২০১২ সালের ১৩ জুলাই গাজীপুরের ধীরাশ্রম রেল স্টেশনের সন্নিকটে ৭২৬ নং আন্তঃনগর সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেন দুর্ঘটনায় তৎকালীন রেলপথমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী ১ লাখ টাকা দেয়া হয়।
এক্ষেত্রে রেলের আইনের বাইরে বর্তমান মন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী সাম্প্রতিক দুর্ঘটনায় নিহত ১২ জনের পরিবারকে ১ লাখ টাকা করে (পরিবারপ্রতি) প্রদানের বিষয়টি রেলের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সদয় বিবেচনার জন্য পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে পূর্বাঞ্চল কর্তৃপক্ষ।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশে সড়ক, রেলসহ যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রী কিংবা যেকোনো মানুষের জন্য দুর্ঘটনা-পরবর্তী চিকিৎসা, আর্থিক ও আইনি সুবিধা অনেক কম। রেলের মতো একটি রাষ্ট্রায়ত্ত বৃহৎ গণপরিবহন সংস্থা দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের প্রাচীন আমলের ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা এখনো চালু রেখেছে, যা দুঃখজনক। রেলওয়ে আইন পরিবর্তনসহ রেলের ক্রসিং ব্যবস্থাপনাকে ঢেলে সাজানোর সময় এসেছে।’


