
অ্যাডহক কমিটি নিয়ে বুলবুল এই কমিটির কোনো বৈধতা নেই
এপ্রিল ৮, ২০২৬
সন্ত্রাসবিরোধী বিল পাস, নিষিদ্ধই থাকছে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম
এপ্রিল ৮, ২০২৬বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা আজ এক গভীর চ্যালেঞ্জের মুখে, যার অন্যতম প্রধান কারণ মাটি দূষণ। খাদ্যনিরাপত্তা বলতে শুধু পর্যাপ্ত খাদ্যের প্রাপ্যতা বোঝায় না; এর সঙ্গে জড়িত নিরাপদ, পুষ্টিকর এবং সবার জন্য সহজলভ্য খাদ্যের নিশ্চয়তা। কিন্তু দূষিত মাটিতে উৎপাদিত খাদ্য এই তিনটি দিককেই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ফলে খাদ্য উৎপাদন বাড়লেও এর গুণগত মান ও নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
মাটি মানবসভ্যতার অন্যতম মৌলিক ভিত্তি। কৃষি, অর্থনীতি, পরিবেশ এবং মানবস্বাস্থ্য—সবকিছুই সরাসরি মাটির ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ, যেখানে বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবিকা ও খাদ্য সরবরাহ মাটির উৎপাদনক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। কিন্তু ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, নগরায়ণ এবং অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে দেশের মাটির স্বাভাবিক গুণাগুণ দ্রুত নষ্ট হচ্ছে।
বাংলাদেশে মাটি দূষণের প্রধান উৎসগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো কৃষিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার। উচ্চফলনশীল ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে। প্রথমদিকে এতে উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও দীর্ঘমেয়াদে মাটির জৈব উপাদান কমে গেছে, মাটির গঠন শক্ত হয়ে পড়েছে এবং উপকারী অণুজীব ধ্বংস হয়েছে। এর ফলে মাটির উর্বরতা কমে যাচ্ছে এবং উৎপাদন টেকসই থাকছে না।
অন্যদিকে, কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার মাটিতে বিষাক্ত রাসায়নিকের স্তর বাড়িয়ে দিচ্ছে। এসব রাসায়নিক দীর্ঘদিন মাটিতে থেকে যায় এবং খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। এতে ক্যান্সার, কিডনি ও লিভারের রোগ, স্নায়বিক সমস্যা এবং শিশুদের বিকাশগত প্রতিবন্ধকতার ঝুঁকি বাড়ে। অর্থাৎ, খাদ্যের পরিমাণ যথেষ্ট হলেও তা নিরাপদ নয়।
শিল্পবর্জ্য মাটি দূষণের আরেকটি বড় কারণ। ট্যানারি, টেক্সটাইল, ডাইং, কেমিক্যাল ও ওষুধ শিল্প থেকে নির্গত অপরিশোধিত বর্জ্য নদী ও কৃষিজমিতে ফেলা হচ্ছে। এসব বর্জ্যে সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম, আর্সেনিক ও ক্রোমিয়ামের মতো ভারী ধাতু থাকে, যা মাটিতে জমে দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকে। এসব ধাতু ফসলের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে ধীরে ধীরে বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে।
নগরায়ণের ফলে সৃষ্ট কঠিন বর্জ্যও মাটির জন্য বড় হুমকি। প্লাস্টিক, পলিথিন, ই-বর্জ্য এবং হাসপাতালের বর্জ্য সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা না হওয়ায় তা মাটিতে জমা হচ্ছে। প্লাস্টিক মাটির ভেতরে পানি ও বায়ুর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে, ফলে উদ্ভিদের শিকড়ের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। একই সঙ্গে বৃষ্টির পানির মাধ্যমে ক্ষতিকর রাসায়নিক মাটির গভীরে প্রবেশ করে ভূগর্ভস্থ পানিকেও দূষিত করে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেও মাটির গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা কৃষিজমিকে অনুপযোগী করে তুলছে। ফলে কৃষকরা উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন অথবা বিকল্প ফসলের ওপর নির্ভর করছেন। এতে দেশের সামগ্রিক খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
দূষিত মাটিতে উৎপাদিত খাদ্যের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এর পুষ্টিমান হ্রাস। সুস্থ মাটি উদ্ভিদকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করে, কিন্তু দূষিত মাটিতে এ ভারসাম্য নষ্ট হয়। ফলে খাদ্যে প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজের পরিমাণ কমে যায়। এর ফলে মানুষ পর্যাপ্ত খাদ্য গ্রহণ করলেও অপুষ্টির শিকার হয়। এছাড়া খাদ্যে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ এবং ভারী ধাতুর উপস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।
মাটি দূষণের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও গভীর। নিম্ন আয়ের মানুষ সাধারণত কম দামের খাদ্যের ওপর নির্ভর করে, যা অনেক সময় দূষিত জমি থেকে আসে। ফলে তারা বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ে। অন্যদিকে কৃষকদের উৎপাদন খরচ বাড়ছে, কারণ উর্বরতা কমে যাওয়ায় বেশি সার ও কীটনাশক ব্যবহার করতে হচ্ছে। কিন্তু উৎপাদনের গুণগত মান বাড়ছে না।
এই সংকট মোকাবিলায় টেকসই মাটি ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি। জৈব সার ব্যবহার, ফসল পর্যায়ক্রমিক চাষ, সবুজ সার এবং ফসলের অবশিষ্টাংশ মাটিতে ফিরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে মাটির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। একই সঙ্গে রাসায়নিক ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ এবং জৈব কীটনাশক ব্যবহারের মাধ্যমে দূষণ কমানো যেতে পারে।
শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কঠোর আইন প্রয়োগ এবং বর্জ্য পরিশোধনাগার স্থাপন নিশ্চিত করতে হবে। নগর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং প্লাস্টিক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি অপরিহার্য। মানুষ যদি নিরাপদ খাদ্যের গুরুত্ব বোঝে, তাহলে বাজারেও এর চাহিদা বাড়বে।
সবশেষে বলা যায়, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা ছাড়া খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। দূষিত মাটি শুধু পরিবেশ নয়, মানবস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির জন্যও বড় হুমকি। তাই এখনই সমন্বিত, বিজ্ঞানভিত্তিক ও টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা যায়।
জাকির হোসেন, সম্পাদক, সিটিনিউজ সেভেন ডটকম


