
একনেক সভা স্থগিত, ফের বসবে আগামী সপ্তাহে
এপ্রিল ৬, ২০২৬
সিজন ও চেয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সরকারের মেন্টালিটি চেঞ্জ হয়ে গেছে: হাসনাত আবদুল্লাহ
এপ্রিল ৬, ২০২৬ইস্টার উপলক্ষে সাধারণত শুভেচ্ছা বার্তা দিয়ে থাকে মার্কিন প্রশাসন। কিন্তু এবারের শীর্ষ ব্যক্তিদের বক্তব্যগুলো ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এসব বার্তা যুদ্ধের ন্যায্যতা তুলে ধরার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় নীতিতে ধর্মের প্রভাব বাড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে
ইরানের অভ্যন্তরে পরিচালিত এক অভিযানে গতকাল নিজেদের বিমানসেনাকে জীবিত উদ্ধার করে যুক্তরাষ্ট্র। ঘটনাটিকে ‘ইস্টার মিরাকল’ হিসেবে অভিহিত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা। তবে ধর্মীয় বয়ানের ব্যবহারের কারণে সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সমালোচকদের দাবি, চলমান সামরিক তৎপরতাকে ন্যায়সঙ্গত ও ঐশ্বরিকভাবে অনুমোদিত হিসেবে তুলে ধরতে প্রশাসন ধর্মীয় ভাষা ব্যবহার করছে।
এনবিসির মিট দ্য প্রেস অনুষ্ঠানে গতকাল ট্রাম্প বলেন, উদ্ধার অভিযানটি ছিল একটি ‘ইস্টার মিরাকল।’ তার মন্ত্রিসভার একাধিক সদস্যও পৃথক বার্তায় একই ধরনের মন্তব্য করেছেন।
ইস্টার উপলক্ষে সাধারণত শুভেচ্ছা বার্তা দিয়ে থাকে মার্কিন প্রশাসন। কিন্তু এবারের শীর্ষ ব্যক্তিদের বক্তব্যগুলো ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এসব বার্তা যুদ্ধের ন্যায্যতা তুলে ধরার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় নীতিতে ধর্মের প্রভাব বাড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে গতকাল দেয়া এক বার্তায় ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুতে হামলার হুমকি দেন ট্রাম্প এবং তেহরানকে হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করার আহ্বান জানান। গালি-সংযুক্ত ওই বার্তায় তিনি কঠোর ভাষা ব্যবহার করেন এবং শেষে ‘প্রেইজ বি টু আল্লাহ’ বাক্যটি উল্লেখ করেন, যা নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এক্স বার্তায় ইস্টারের ধর্মীয় তাৎপর্য তুলে ধরেন। সেখানে তিনি বলেন, যিশুর পুনরুত্থানকে ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজয় হিসেবে দেখা হয়। এ প্রেক্ষাপটে শত্রু এলাকার পেছন থেকে একজন মার্কিন সেনাকে উদ্ধারের ঘটনাকে তিনি সময়োপযোগী ও তাৎপর্যপূর্ণ।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ গতকাল ব্যক্তিগত এক্স অ্যাকাউন্টে ‘গড ইজ গুড’ লিখে ট্রাম্পের একটি পোস্ট শেয়ার করেন, যেখানে ইরানে উদ্ধার অভিযানের সাফল্যের কথা তুলে ধরা হয়।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া ওই সেনা কর্মকর্তা যুদ্ধবিমান থেকে ইজেক্ট করার পর রেডিও বার্তায় একই ধরনের ধর্মীয় বাক্য উচ্চারণ করেছিলেন। এ দাবি করেন এক বেনামী প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা।
রিপাবলিকান দলের সাবেক প্রতিনিধি মারজোরি টেইলর গ্রিন এক্স বার্তায় অভিযোগ করেন, ট্রাম্প খ্রিস্টীয় মূল্যবোধের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ সম্প্রসারণ’ নয়, বরং ‘শান্তির পথ অনুসরণ করা’ উচিত প্রশাসনের খ্রিস্টানদের। কেননা যিশুর শিক্ষা শত্রুর প্রতিও ক্ষমা ও ভালোবাসার ওপর জোর দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মুসলিম অধিকার সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (সিএআইআর) ট্রাম্পের গতকালে মন্তব্যের নিন্দা জানিয়েছে। এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের ‘ইসলামকে উপহাস ও বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলার হুমকি বেপরোয়া ও বিপজ্জনক।’
সিএআইআর আরো বলছে, সহিংস হুমকির প্রেক্ষাপটে ‘প্রেইজ বি টু আল্লাহ’ কথাটির ব্যবহার ধর্মীয় ভাষাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা এবং মুসলমান ও তাদের বিশ্বাসের প্রতি অবজ্ঞা দেখায়।
গত মাসে ৩০ জন ডেমোক্র্যাটিক আইনপ্রণেতার একটি দল প্রতিরক্ষা দপ্তরের ইন্সপেক্টর জেনারেল প্লাটে মরিং বরাবর অভিযোগপত্র পাঠান। সেখানে বলা হয়, মার্কিন সামরিক বাহিনীর কিছু সদস্য ইরানে যুদ্ধকে ‘বাইবেলের শেষ সময়ের ভবিষ্যদ্বাণী’ উল্লেখ করে ন্যায্যতা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। এ বিষয়ে তদন্তের দাবি তোলেন তারা।
চিঠিতে বলা হয়, ‘যখন ট্রাম্প প্রশাসন ইরানে একটি পছন্দসই যুদ্ধ চালাচ্ছে, যেখানে বিলিয়ন ডলার এবং অসংখ্য প্রাণ ঝুঁকির মধ্যে, তখন রাষ্ট্র ও ধর্মের কঠোর বিচ্ছিন্নতা বজায় রাখা এবং আমাদের সেনাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
আরো বলা হয়, আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে সামরিক অভিযান তথ্য ও আইনের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে, কোনো ‘শেষ সময়ের’ ভবিষ্যদ্বাণী বা চরম ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিতে নয়।
অবশ্য ইরানও যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়মিত ‘গ্রেট স্যাটান’ বলে আখ্যায়িত করে। তারা সামরিক প্রচারণায় ধর্মীয় ভাষা ব্যবহার করে এবং নিহত যোদ্ধাদের ‘শহীদ’ হিসেবে বর্ণনা করে।
এর আগে গত সপ্তাহে ‘ইরানকে প্রস্তুর যুগে ফেরানো’র হুমকি দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিষয়টিকে ‘বর্ণবাদী’ বলে আখ্যায়িত করেছিল মার্কিন মুসলিমদের একটি সংগঠন।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত নিয়ে শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কর্মকর্তারা এমন ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য দিচ্ছেন, যাতে মনে হয় ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান পুরোপুরি ধর্মীয় যুদ্ধ। গত মাসের শুরুতে বিষয়টি নিয়ে নিন্দা জানিয়েছে মুসলিম নাগরিক অধিকার সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (সিএআইআর)। তারা বলছে, পেন্টাগনের এ ধরনের ভাষা ব্যবহার ‘বিপজ্জনক’ ও ‘মুসলিমবিরোধী’।
অলাভজনক সংগঠন মিলিটারি রিলিজিয়াস ফ্রিডম ফাউন্ডেশন (এমআরএফএফ) মার্কিন সেনাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার জন্য কাজ করে। সংস্থাটি জানিয়েছে, তারা ইমেইলে অভিযোগ পেয়েছে। যেখান থেকে জানা যাচ্ছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের উদ্দেশ্য হিসেবে সেনাদের কাছে ‘আর্মাগেডন’ ঘটানো অর্থাৎ বাইবেলে উল্লেখিত পৃথিবীর শেষ সময়ে উপনীত হওয়াকে বর্ণনা করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ননকমিশনড অফিসার এমআরএফএফ-কে ওই সময় লেখেন, ‘এটি ঈশ্বরের ঐশ্বরিক পরিকল্পনার অংশ’ এমন উক্তির মাধ্যমে সেনা সদস্যদের উদ্দীপ্ত করার নির্দেশ নিয়েছেন এক কমান্ডার। ওই কমান্ডার বাইবেলের ‘বুক অব রেভেলেশন’ থেকে একাধিক উদ্ধৃতি উল্লেখ করেছেন। আর্মাগেডন ও যিশু খ্রিস্টের আসন্ন প্রত্যাবর্তনের কথা বলেন তিনি।
ওই অফিসার আরো দাবি করেন, ইউনিটকে বলেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিযুক্ত করেছেন যিশু, যাতে তিনি ইরানে ‘অগ্নি সংকেত’ দিয়ে আর্মাগেডন ঘটান এবং পৃথিবীতে যিশুর প্রত্যাবর্তনের সূচনা করেন।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতারাও প্রকাশ্য বক্তব্যে ধর্মীয় ভাষা ব্যবহার করে আসছেন। গত ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েলে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হ্যাকাবে রক্ষণশীল মার্কিন ভাষ্যকার টাকার কার্লসনকে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইসরায়েল যদি ‘পুরো মধ্যপ্রাচ্য’ নিয়ে নেয় তাতেও সমস্যা নেই। কারণ বাইবেলে এ ভূমি তাদের জন্য প্রতিশ্রুত। যদিও তিনি যোগ করেন, ইসরায়েল এমন কিছু করার চেষ্টা করছে না।
এ বিষয়ে মার্চে যুক্তরাজ্যের ডারহাম ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জলিয়ন মিচেল বলেন, এ সংঘাতকে পবিত্র যুদ্ধ হিসেবে উপস্থাপন করার মাধ্যমে নেতারা ধর্মীয় বিশ্বাসকে ব্যবহার করছেন। যা কোনো পদক্ষেপকে ন্যায্যতা, রাজনৈতিক সমর্থন জোগাতে ও জনমত সংগঠিত করতে ব্যবহৃত হয়।
নেতানিয়াহু ও অন্যান্য ইসরায়েলি কর্মকর্তা এর আগে গাজায় ফিলিস্তিনিদের প্রসঙ্গেও ‘আমালেক’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন।
রয়টার্স ও আল জাজিরা অবলম্বনে


