ড. ইউনুসকে রাজপথে নেমে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহ্বান নাহিদের
এপ্রিল ৪, ২০২৬
সড়ক দুর্ঘটনায় আটজনের মৃত্যু দেশের বিভিন্ন জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় আটজন নিহত হয়েছে।
এপ্রিল ৫, ২০২৬
ড. ইউনুসকে রাজপথে নেমে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহ্বান নাহিদের
এপ্রিল ৪, ২০২৬
সড়ক দুর্ঘটনায় আটজনের মৃত্যু দেশের বিভিন্ন জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় আটজন নিহত হয়েছে।
এপ্রিল ৫, ২০২৬

মৃত্যু ১০০ ছাড়িয়েছে হামের সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি কি বাংলাদেশে

বিশ্বজুড়েই বেড়েছে হামের সংক্রমণ। ইউরোপ থেকে আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকা থেকে অস্ট্রেলিয়া—প্রায় সব মহাদেশেই অত্যন্ত সংক্রামক এ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে মোট ৩০ হাজার ৫৫৭ জনের দেহে হাম শনাক্ত হয়েছে। বেশির ভাগ অঞ্চল থেকে যদিও মার্চের পূর্ণ তথ্য এখনো জমা পড়েনি।

ডব্লিউএইচওর হিসাবে দেখা গেছে, অঞ্চলভেদে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত আমেরিকা অঞ্চলে চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে ৮ হাজার ৮১৪ শিশুর দেহে হাম শনাক্ত হয়েছে। আফ্রিকা অঞ্চলে ৭ হাজার ১৯৩ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রোগটি শনাক্ত হয়েছে ৬ হাজার ৭২৬ শিশুর দেহে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) হিসাব মতে, চলতি বছরে ২৬ মার্চ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে ১ হাজার ৫৭৫ নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। মেক্সিকোয় ৭ হাজার ৪০০-এর বেশি নিশ্চিত সংক্রমণ রেকর্ড হয়েছে।

প্যান-আমেরিকান হেলথ অর্গানাইজেশনের তথ্য মতে, বলিভিয়া, কানাডা, চিলি, যুক্তরাষ্ট্র, গুয়াতেমালা, মেক্সিকো ও উরুগুয়ে—এ সাত দেশে চলতি বছরের এখন পর্যন্ত হামের সংক্রমণ ৪৩ গুণ বেড়েছে। হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে যুক্তরাজ্যের লন্ডন ও বার্মিংহামেও। ইউরোপের দেশ ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স ও রোমানিয়ায়ও নতুন সংক্রমণ দেখা দিয়েছে।

বিপরীতে বাংলাদেশ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সারা দেশে হামের লক্ষণ নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে গেছে ৬ হাজার ৪৭৬ জন। এর মধ্যে ৪ হাজার ৬২৮ শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আর ভাইরাসটি শনাক্ত হয়েছে ৮২৬ শিশুর দেহে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো হামে আক্রান্ত হয়ে বা উপসর্গ নিয়ে মৃতের সংখ্যা এরই মধ্যে ১০০ ছাড়িয়ে গেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে হামে মৃতের সংখ্যা কি বাংলাদেশই সর্বোচ্চ? ডব্লিউএইচওর প্রকাশিত পরিসংখ্যানে যদিও দেশভিত্তিক তুলনামূলক তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, গত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে গোটা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে মোট শনাক্ত ৬ হাজার ৭২৬। আর বাংলাদেশে কেবল মার্চের মাঝামাঝি থেকে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে নিতে হয়েছে ৬ হাজার ৪৭৬ শিশুকে। তাছাড়া লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা, যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো, ভারত বা ইউরোপে হামে আক্রান্তের কথা জানা গেলেও মৃত্যুর উল্লেখযোগ্য কোনো তথ্য মেলেনি। সেখানে বাংলাদেশে এ সংখ্যা শতাধিক। সব মিলিয়ে এ পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এ মুহূর্তে হামের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি বাংলাদেশেই।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের গতকালের বুলেটিনে বলা হয়েছে, দেশে গত শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হাম আক্রান্ত হয়ে এবং এ রোগের লক্ষণ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ছয় শিশুর। এর মধ্যে দুজনের মৃত্যু হামে হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। বাকি চার শিশু হাসপাতালে ভর্তি ছিল হামের উপসর্গ নিয়ে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ নিয়ে দেশে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে ১৬ শিশু এবং রোগটির উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৯৮ জনের। রোগটিতে মূলত শিশুরাই আক্রান্ত হয়।

হাম-সংক্রান্ত গতকালের নিয়মিত বুলেটিনে আরো বলা হয়েছে, এদিন সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৬০ শিশুর দেহে হাম শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া রোগটির লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে ৭৮৭ জন, যার মধ্যে ৪৮৮ শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। হামের লক্ষণ নিয়ে এ সময়ে সবচেয়ে বেশি ৩১৫ জন ভর্তি হয়েছে ঢাকার হাসপাতালগুলোয়। আর সবচেয়ে কম (চারজন) ভর্তি হয়েছে ময়মনসিংহে।

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে গতকাল দুপুর পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হামে আক্রান্ত হয়েছে চার শিশু। অন্যদিকে এ সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে ২৮ শিশুকে ভর্তি করা হয়েছে। আর হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ২৮ শিশু। বর্তমানে ৮৯ রোগী হাম কিংবা এর উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছে।

জেলার সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে জানান, আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে ঠাণ্ডা-গরমে শিশুদের অসুস্থতা বাড়ছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সব শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে বিষয়টি এমন না। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া সব শিশুকে সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা দেয়া হচ্ছে। সেই সঙ্গে হামের প্রকোপ মোকাবেলায় সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের জন্য বিশেষ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, যাতে হাম সন্দেহে আসা কোনো রোগীকে চিকিৎসাসেবা পেতে ভোগান্তিতে পড়তে না হয়। শনাক্তকৃত ও সন্দেহভাজনদের নিয়মিত চিকিৎসার আওতায় আনা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকার ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হচ্ছে।

হামের প্রকোপ যেসব জেলায় বেশি তার মধ্যে একটি টাঙ্গাইল। ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল হামের লক্ষণ নিয়ে ১৩ শিশু ভর্তি হয়েছে। আর গত তিনদিনে মৃত্যু হয়েছে দুই শিশুর। বর্তমানে হাসপাতালটিতে ভর্তি রয়েছে ২৭ রোগী।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সারা দেশে হামের লক্ষণ নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে যায় ৬ হাজার ৪৭৬ জন। এর মধ্যে ৮২৬ শিশুর দেহে হাম শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া এ সময়ে হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে ৪ হাজার ৬২৮ শিশুকে। চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ২ হাজার ৬৫৪ জন।

এদিকে আজ জরুরি হাম-রুবেলার টিকাদান কর্মসূচি শুরু হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় ছয় থেকে ৫৯ মাস বয়স শিশুদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এ টিকা দেয়া হবে। গতকাল দুপুরে সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এসব কথা বলেন।

প্রাথমিক পর্যায়ে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির ৩০ উপজেলা হলো রাজশাহীর গোদাগাড়ী, ঢাকার নবাবগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জের লৌহজং, সদর ও শ্রীনগর, ঝালকাঠির নলছিটি, ময়মনসিংহের ত্রিশাল, সদর ও ফুলপুর, চাঁদপুরের হাইমচর ও সদর, বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ ও বাকেরগঞ্জ, পাবনার ঈশ্বরদী, সদর, আটঘরিয়া ও বেড়া, নওগাঁর পোরশা, গাজীপুর সদর, নেত্রকোনার আটপাড়া, শরীয়তপুরের জাজিরা, বরগুনা সদর, মাদারীপুর সদর, কক্সবাজারের মহেশখালী ও রামু, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, শিবগঞ্জ, ভোলাহাট, নাটোর সদর ও যশোর সদর।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত নির্ধারিত কেন্দ্রগুলোয় টিকা দেয়া হবে। আগের টিকাদান কেন্দ্রগুলো ছাড়াও স্থানীয়ভাবে নির্ধারিত স্থান, স্কুল ও কমিউনিটি সেন্টারে এ কার্যক্রম পরিচালিত হবে। যেসব শিশুর জ্বর রয়েছে বা বর্তমানে অসুস্থ, তাদের এ সময় টিকা না দিয়ে সুস্থ হওয়ার পর টিকা প্রদানের পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল জানান, দেশের ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলায় আজ সকাল ৯টায় একযোগে জরুরি টিকাদান কার্যক্রম শুরু হবে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে এ কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে।

আগে টিকা নেয়া থাকুক বা না থাকুক, এ বয়সসীমার সব শিশুকেই পুনরায় টিকা দেয়া হবে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৮২ শতাংশই ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। এ কারণে প্রথম পর্যায়ে ছয় থেকে ৫৯ মাস বয়সী সব শিশুকে টিকার আওতায় আনা হচ্ছে।’

এ সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, টিকাদান কর্মসূচির পাশাপাশি হামে আক্রান্ত বা জ্বরে আক্রান্ত শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল দেয়া হবে। এছাড়া প্রাথমিকভাবে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোয় কার্যক্রম শুরু হলেও তা ধীরে ধীরে সারা দেশে সম্প্রসারণ করা হবে এবং জুলাইয়ের মধ্যে এটি নিয়মিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে চালু থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *