সংসদ কমিটির প্রথম বৈঠক আজ
মার্চ ২৮, ২০২৬
টাঙ্গাইলে ট্রেনে কাটা পড়ে শিশুসহ নিহত ৫
মার্চ ২৮, ২০২৬
সংসদ কমিটির প্রথম বৈঠক আজ
মার্চ ২৮, ২০২৬
টাঙ্গাইলে ট্রেনে কাটা পড়ে শিশুসহ নিহত ৫
মার্চ ২৮, ২০২৬

বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত আলুখেত

অকাল বৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টিতে দেশের উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার আলুখেত তলিয়ে গিয়ে নতুন করে বিপাকে পড়েছেন চাষীরা। বগুড়া, জয়পুরহাট, গাইবান্ধা, দিনাজপুর ও পঞ্চগড়ের বিভিন্ন এলাকায় খেতের নিচু অংশ পানিতে তলিয়ে থাকায় মাঠে থাকা আলু পচে নষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব জমিতে এখনো আলু উত্তোলন শেষ হয়নি, সেসব খেতে ক্ষতির পরিমাণ বেশি দেখা যাচ্ছে। শিলাবৃষ্টির কারণে দেরিতে লাগানো আলুর গাছও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে ফলন ও বীজ—দুই ক্ষেত্রেই ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ছে। এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত থাকায় আলুসহ অন্যান্য ফসলের ক্ষতি আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত সরকারি সহায়তা ও বাজার ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপ না হলে কৃষকরা আগামী মৌসুমে আলু চাষ কমিয়ে দিতে পারেন বলে মনে করছেন তারা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চলতি মৌসুমে ৪ লাখ ৬৭ হাজার হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ১ কোটি ১৩ লাখ ৬৪ হাজার ৭০০ টন। যদিও ৪ লাখ ৬৯ হাজার হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৯০০ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়। ওই বছর রেকর্ড ১ কোটি ১৫ লাখ ৭৩ হাজার ৬০০ টন আলুর উৎপাদন হয়।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, খাদ্য ও বীজ হিসেবে ব্যবহারের জন্য বছরে সর্বোচ্চ ৯০ লাখ টনের মতো আলুর চাহিদা রয়েছে। গত মৌসুমে চাহিদার চেয়ে ২৫-৩০ লাখ টন বেশি উৎপাদন হয়। যার প্রভাবে সারা বছর খুচরা বাজারে ২০-২৫ টাকায় মিলেছে আলু। হিমাগারের স্বল্পতার কারণে কৃষক পর্যায়ে ৯ থেকে ১৫ টাকা কেজিতে বাজারে বিক্রি করতে হয়েছে কৃষককে। এতে লোকসানের বোঝা বড় হয়েছে। তবে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাবে হিমাগার খরচ মিলিয়ে প্রতি কেজি আলুতে কৃষকের খরচ হয় প্রায় ১৮ থেকে ২৫ টাকা। এবারো একই ধরনের লোকসানে পড়েছেন কৃষকরা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, এরই মধ্যে ৭৫ শতাংশের মতো আলু সংগ্রহ করা হয়েছে। মাঠে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ আলু রয়েছে। বৃষ্টিতে বগুড়া, জয়পুরহাট, গাইবান্ধায় আলুখেতের ক্ষতি হয়েছে।

রমজানের মাঝামাঝি সময় থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলায় মাঝারি থেকে মাঝারি-ভারি বৃষ্টিপাত হচ্ছে।

সেই সঙ্গে শিলাবৃষ্টিও হচ্ছে। যেটি বিক্ষিপ্তভাবে এখনো বিভিন্ন এলাকায় চলমান আছে। শুক্রবার সকাল থেকে আগামী পাঁচদিনের আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসে দেশের আটটি বিভাগেই প্রতিদিন দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টি/বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। ফলে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে আলুসহ অন্যান্য ফসলের চাষীদের দুর্দশা আরো বাড়তে পারে বলেই মনে করেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা।

গত ১২ মার্চ ভোরে হঠাৎ ভারি বৃষ্টিতে তলিয়ে যায় গাইবান্ধার আলুখেত। এতে দুশ্চিন্তায় পড়েন স্থানীয় চাষীরা। চাষীরা জানান, হঠাৎ বৃষ্টিতে জেলার বিভিন্ন এলাকায় আলুখেতে পানি জমে যায়। অনেক জায়গায় জমির নিচু অংশে থাকা খেত আংশিক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় আলু পচে গেছে।

কৃষক আরিফুল ইসলাম লিটন জানান, একদিকে আলুর দাম কম, তাতে বিক্রি করে উৎপাদন খরচ উঠছে না। এর ওপর ভারি বর্ষণে জমিতে দীর্ঘ সময় পানি জমে কিছু আলু পচে নষ্ট হয়েছে। এ অবস্থায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের। অনেক কৃষক ঋণ করে আলু চাষ করেছেন। ফলে ফসল নষ্ট হলে তাদের চরম বিপাকে পড়তে হবে।

ফসল ঘরে তোলার সময়ে ঝড়-বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের কৃষকরা। বিশেষ করে আলু উত্তোলনের শেষ সময়ে খেত তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়। মার্চের মাঝামাঝি সময়ে দুইদিনের বৃষ্টিতে উত্তরের আরেক জেলা দিনাজপুরের হাকিমপুর উপজেলার ইসমাইলপুর ও মোল্লাবাজার আদর্শ গ্রামের কয়েকশ বিঘা জমির আলু ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

মোল্লাবাজার এলাকার কৃষক কামরুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আলু একটু শুকিয়ে রাখলে বীজের জন্য ভালো হয়। এজন্য জমিতেই রাখা হয়েছিল। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অনেক ক্ষতি হয়ে গেল। পর পর দুদিন বৃষ্টিপাতে আমার ৭০ বিঘা জমির আলু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’

উত্তরের শস্য ভাণ্ডারখ্যাত জয়পুরহাটেও হঠাৎ বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে ৮৭১ হেক্টর জমির আলু। পানিতে পচে আলু নষ্ট হওয়ায় বাজারে এক কেজি আলু বিক্রি করে উৎপাদন খরচের অর্ধেকও উঠছে না। এতে আলু ঘরে তুলতে দ্বিগুণ মজুরি পরিশোধ করতে হয়েছে কৃষকদের। এছাড়া গত বছর হিমাগারে রাখা আলুতেও লোকসান গুনেছেন কৃষক। টানা দুই মৌসুমের লোকসানে দিশেহারা তারা।

ক্ষেতলাল উপজেলার কৃষক শারফুল ইসলাম বলেন, ‘হঠাৎ বৃষ্টিতে আলু পচে যাওয়ায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। এলাকার অনেক কৃষকের ক্ষতি হয়েছে। লোকসান গুনতে গুনতে আলুচাষীরা নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছেন।’ এম ইশরাত হিমাগারের ব্যবস্থাপক মো. রায়হান আলম বলেন, ‘হিমাগারের ধারণক্ষমতা শেষ হয়েছে। নতুন করে আলু হিমাগারে নেয়ার সুযোগ নেই। বর্তমান আলুর দাম প্রতি মণ ৪৫০ টাকা।’

বৃষ্টিতে কী পরিমাণ আলুর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মাঠপর্যায়ে তার হিসাব করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। চলতি মার্চের ১২, ১৩ ও ১৫ তারিখের বৃষ্টিতে জয়পুরহাট, বগুড়া ও গাইবান্ধায় ৮৩৬ হেক্টর জমির আলু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আলুর ফলন হিসেবে যা প্রায় ২০ হাজার টন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা ৩ হাজার ১৬০ জন।

এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে দুই হাজার হেক্টরের মতো বেশি জমিতে চাষ হয়েছে। ফলনও বেশি হবে। এরই মধ্যে ৭৫ শতাংশ জমির আলু সংগ্রহ হয়েছে। মাঠে ২০-২৫ শতাংশ আছে। উত্তরাঞ্চলের জয়পুরহাট, বগুড়া ও গাইবান্ধায় বৃষ্টিতে আক্রান্ত হয়েছে। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও জমির তথ্য সংগ্রহ করছি।’

কৃষকদের লোকসানের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যে শস্যে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হন, তার পরের শস্যে তারা প্রণোদনা পান। আলুচাষীদের প্রণোদনার বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। কৃষিমন্ত্রী মহোদয় কৃষকদের বিষয়গুলো আন্তরিকতার সঙ্গে নজর রাখছেন।’ তিনি বলেন, ‘প্রতি মৌসুমে ২০ লাখ টনের মতো আলু উদ্বুত্ত থাকছে। অন্তত ১০ লাখ টন রফতানি করা গেলে উদ্বৃত্তের চাপ কমবে। এতে কৃষকের লোকসান কমবে।’

বৃষ্টির পাশাপাশি দামে ধস নামায় ক্ষতি বয়ে বেড়াতে হচ্ছে কৃষককে। গত মৌসুমের লোকসানের কারণে কোনো কোনো এলাকায় আলুর আবাদ কমেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের সবচেয়ে বেশি আলু চাষ হয় রংপুর জেলায়। গত মৌসুমের লোকসানের কারণে এবার জেলায় ১১ হাজার ৭৮০ হেক্টর জমিতে কম আলু চাষ হলেও লোকসান এড়াতে পারেননি কৃষকরা। রফতানির জন্য কৃষি বিভাগের পরামর্শে বিশেষ জাতের আলু আবাদ করেও লোকসানে পড়েছেন বেশকিছু কৃষক। প্রতি কেজি আলুর দাম পাচ্ছেন মাত্র ৮-১০ টাকা।

রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় আলুর আবাদ হয়েছে ৫৪ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে। যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় ১১ হাজার ৭৮০ হেক্টর জমি কম।

জেলার পীরগাছা উপজেলার ২৫ জন কৃষক উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শে গুড এগ্রিকালচার প্র্যাকটিস (গ্যাপ) মেনে রফতানির জন্য সানশাইন জাতের আলু আবাদ করে পড়েছেন মহাবিপাকে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নেতা পারুল ইউনিয়নের বিরাহিমপুর গ্রামের কৃষক মো. মোকসেদুল ইসলাম জানান, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, জ্বালানি তেলের সংকট এবং বিদেশে আলুর দাম কম হওয়ায় রফতানি হচ্ছে না। এদিকে সানশাইন সাদা আলু দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা কম থাকায় বর্তমান প্রতি কেজি আলু ৮ টাকার বেশি বিক্রি করতে পারছেন না। অথচ প্রতি কেজি আলু উৎপাদন করতে তাদের খরচ হয়েছে সাড়ে ১৩ টাকা। এখন উৎপাদিত আলু নিয়ে মহাবিপাকে পড়েছেন তারা।

রংপুর সিটি করপোরেশন এলাকার ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের বকশি রঘুবাজারের বাসিন্দা ভুপাল চন্দ্র রায়। এ বছর সাড়ে ছয় একর জমিতে স্টার্স জাতের আলু রোপণ করেছেন। গত বছর একই পরিমাণ জমিতে লোকসান হয়েছে প্রায় নয় লাখ টাকা। তিনি বলেন, ‘প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে তার খরচ হয়েছে ১৮-১৯ টাকা। অথচ বিক্রি করতে হচ্ছে ১০ টাকা কেজিতে।’

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বৃষ্টি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগকে আমরা থামাতে পারব না। তবে চাইলে কৃষকের লোকসান কমাতে পারি। দাম কম থাকলে কৃষক দেরিতে আলু ঘরে তোলেন। কিছুদিন মাঠে থাকলে ফলনটা বাড়ে। তারা তার পরও লোকসান গোনেন। কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণ—বাজারে সরকারের হস্তক্ষেপ নেই। উৎপাদনের ১ শতাংশও রফতানি হয় না। আলুর ইন্ডাস্ট্রিয়াল ও বহুমাত্রিক ব্যবহার নেই। দেশে যে পরিমাণ চাহিদা তার তুলনায় উৎপাদন বেশি। ফলে কৃষকের পণ্য অবিক্রীত থেকে যাচ্ছে।’

আলুচাষীদের রক্ষায় সরকারের পদক্ষেপের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মোট উৎপাদনের ন্যূনতম ১০ শতাংশ সরকারকে কিনে হিমাগারে রাখতে হবে। কৃষকের উৎপাদনের ব্যয়ের চেয়ে কমপক্ষে ২০ শতাংশ বেশি মূল্যে সেসব কিনতে হবে। বাজারে দাম যখন বেড়ে যাবে তখন সেগুলো ছাড়বে। এতে কৃষক বাঁচবে বাজারও অস্থিতিশীল হবে না। প্রতি বছর এ প্রকিউরমেন্টটা করতে হবে। এরপর কৃষক পর্যায়ে আলুর বিভিন্ন পণ্যের মেলা করতে হবে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আলুর বহুমাত্রিক ব্যবহার সম্পর্কে ধারণা ও সচেতনতা বাড়বে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *