নেপালের ৪৭তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন বালেন্দ্র শাহ
মার্চ ২৮, ২০২৬
আ.লীগ সরকার স্বাধীনতার মিথ্যা দলিল ও বয়ান তৈরি করেছে —স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
মার্চ ২৮, ২০২৬
নেপালের ৪৭তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন বালেন্দ্র শাহ
মার্চ ২৮, ২০২৬
আ.লীগ সরকার স্বাধীনতার মিথ্যা দলিল ও বয়ান তৈরি করেছে —স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
মার্চ ২৮, ২০২৬

জ্বালানি তেলের দাম ২০০ ডলার ধরে ট্রাম্প প্রশাসনের কৌশলগত প্রস্তুতি

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলারে পৌঁছতে পারে— ধরে নিয়ে কৌশলগত প্রস্তুতি নিচ্ছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন।

ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের ধাক্কা আসতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই এ অভ্যন্তরীণ বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। এ বিশ্লেষণ এমন সময় সামনে এল যখন মার্কিন প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে একদিকে যুদ্ধবিরতির ইঙ্গিত দেয়া হচ্ছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের মতো পদক্ষেপও দেখা যাচ্ছে। ফলে নীতিগত বার্তায় এক ধরনের দ্বৈততা তৈরি হয়েছে, যা বাজারে অনিশ্চয়তা আরো বাড়িয়ে তুলছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

মার্চের শুরু থেকেই বাজার বিশ্লেষকরা সতর্ক করে আসছিলেন যে ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম দ্রুত বেড়ে ২০০ ডলারের কাছাকাছি যেতে পারে। যদিও এটি এখনো ‘সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি’ হিসেবে বিবেচিত, তবে এর সম্ভাব্য প্রভাব এতটাই ব্যাপক যে তা শুধু উন্নয়নশীল দেশ নয়—উন্নত অর্থনীতিকেও নাড়িয়ে দিতে পারে।

সূত্রগুলো বলছে, তেলের দামের বড় ধরনের উল্লম্ফন অর্থনীতির ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা যাচাই করতে মার্কিন প্রশাসন যে মডেলিং করছে তা পূর্বাভাস নয়। বরং সংকটের সময়ে সম্ভাব্য সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি ধরে আগাম প্রস্তুতি নেয়া যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ। এ প্রক্রিয়ার লক্ষ্য হচ্ছে যদি সংঘাত দীর্ঘায়িত হয় এবং জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে, তাহলে অর্থনীতিকে কীভাবে স্থিতিশীল রাখা যাবে। এ বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট হচ্ছে, ওয়াশিংটন এখন আর পরিস্থিতিকে স্বল্পমেয়াদি সংকট হিসেবে দেখছে না। বরং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের সম্ভাবনা এবং তার বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক প্রভাব মাথায় রেখে নীতিনির্ধারকরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

প্রভাবশালী বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ম্যাককোয়ারি গ্রুপ তাদের এক বিশ্লেষণে সতর্ক করে বলেছে, যদি হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে, তাহলে তেলের দাম এমন পর্যায়ে যেতে পারে, যেখানে বৈশ্বিক চাহিদার একটি বড় অংশ কমে যেতে বাধ্য হবে। তাদের মতে, এ ধরনের মূল্যবৃদ্ধি কার্যত ‘ডিমান্ড ডেস্ট্রাকশন’ তৈরি করবে অর্থাৎ উচ্চমূল্যের কারণে ব্যবহার নিজেই কমে যাবে। সর্বশেষ হিসাবে গতকাল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার, যা এর আগে মাসের শুরুতে সংকটজনিত সর্বোচ্চ ১১৯ দশমিক ৫০ ডলারে পৌঁছেছিল।

যুদ্ধ শুরুর আগেই মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সতর্ক করেছিলেন, সংঘাত তেলের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে এবং এতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একাধিক সূত্রের মতে, ট্রেজারি বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা কয়েক সপ্তাহ ধরেই হোয়াইট হাউজকে জ্বালানি তেলের দামের ওঠানামা নিয়ে সতর্ক করে আসছিলেন।

এ প্রেক্ষাপটে জ্বালানি তেলের ব্যারেলপ্রতি দাম ২০০ ডলার ধরে ট্রাম্প প্রশাসন যে বিশ্লেষণ করছে, তা মূলত একটি ‘স্ট্রেস টেস্ট’। এর মাধ্যমে প্রশাসন বুঝতে চাইছে কোন পরিস্থিতিতে অর্থনীতি সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বে এবং সেই চাপ মোকাবেলায় কী ধরনের নীতিগত পদক্ষেপ প্রয়োজন হতে পারে। অর্থাৎ ইরানকে ঘিরে সংঘাতের অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে বাস্তব সম্ভাবনা হিসেবে বিবেচনা করেই যুক্তরাষ্ট্র আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছে, যাতে পরিস্থিতি আরো অবনতি ঘটলে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানো যায়।

ইউরোপ এরই মধ্যে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রাথমিক চাপ অনুভব করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে, যার ফলে তাদের অর্থনৈতিক নীতিতে নমনীয়তা কমে এসেছে। যা থেকে বোঝা যায়, দাম আরো বাড়লে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র তুলনামূলকভাবে কিছুটা স্থিতিশীল অবস্থানে থাকলেও সেখানেও চাপ বাড়ছে। দেশটি নিজস্ব জ্বালানি তেল ও গ্যাস উৎপাদনের কারণে ইউরোপের তুলনায় বেশি সহনশীল হলেও ভোক্তা পর্যায়ে এর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম গড়ে প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। সর্বশেষ হিসাবে প্রতি গ্যালন পেট্রলের দাম দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ ডলারে। যা এক বছর আগে ছিল ৩ দশমিক ১ ডলার।

মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ এখনো পরিস্থিতিকে ‘অস্থায়ী’ প্রভাব হিসেবে দেখছে। ফেড চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েল বলেছেন, যুদ্ধের কারণে অর্থনীতিতে যে প্রভাব পড়ছে তা দীর্ঘমেয়াদি নাও হতে পারে। তবে তিনি একই সঙ্গে সতর্ক করে দিয়েছেন যে পরিস্থিতি কীভাবে এগোবে তা এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। এ মন্তব্য অনেক বিশ্লেষকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অতীতে কভিড-১৯ মহামারীর সময়ও প্রথমদিকে প্রভাবকে ‘অস্থায়ী’ বলা হয়েছিল, যা পরে দীর্ঘস্থায়ী সংকটে রূপ নেয়। ফলে এবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিছুটা সতর্ক অবস্থান নিয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এ সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার হবে উন্নয়নশীল দেশগুলো। কারণ তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তুলনামূলক কম এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার কারণে তারা দ্রুত চাপে পড়ে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে তাদের আমদানি ব্যয় বাড়বে, মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি হবে এবং শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে। তবে উন্নত দেশগুলোর জন্যও পরিস্থিতি সহজ নয়। ইউরোপের মতো অঞ্চলগুলো এরই মধ্যে জ্বালানি নির্ভরতা ও উচ্চ আমদানি ব্যয়ের কারণে চাপে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত থাকার কারণে তারাও প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকও একই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছে। ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিন লাগার্দে জানিয়েছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সুদের হার বাড়ানো হতে পারে। এর অর্থ, ইউরোপ এরই মধ্যে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ধাক্কার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মার্কিন প্রশাসনের বার্তায় যে দ্বৈততা দেখা যাচ্ছে, তা বাজারে অস্থিরতা আরো বাড়িয়ে তুলছে। একদিকে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের খবর আসছে—যা দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের প্রস্তুতির ইঙ্গিত দেয়। এ ধরনের পরস্পরবিরোধী সংকেত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে, যার ফলে বাজারে দামের ওঠানামা আরো তীব্র হচ্ছে।

বাজারে উত্তেজনা প্রশমনের আলোচনা থাকলেও জ্বালানির দাম এখন মূলত সংঘাত কতদিন স্থায়ী হবে সে হিসাবেই নির্ধারিত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান ফিলিপ নোভার জ্বালানি বাজার বিশ্লেষক প্রিয়াঙ্কা সচদেবা। তার ভাষায়, জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর সরাসরি হামলা বা দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত যেকোনো একটি ঘটলেই বাজার দ্রুত উচ্চমূল্যের দিকে পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য হবে।

অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক জ্বালানি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এক্সঅ্যানালিস্টসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মুকেশ সাহদেব বলেন, ‘প্রতিদিনই বাজারে চাপ বাড়ছে। এশিয়ার দেশগুলো এরই মধ্যে নিজেদের সংরক্ষিত জ্বালানি মজুদ ব্যবহার শুরু করেছে এবং চাহিদা সমন্বয়ের বিষয়টিও বিবেচনা করছে। যা পরিস্থিতির গভীরতা ও দীর্ঘস্থায়িত্বের ইঙ্গিত দেয়।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *