
ব্রিটিশ তারবার্তায় পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তান সংকট, ১৯৬৬-৭১
মার্চ ২৬, ২০২৬মধ্যপ্রাচ্য সংকটে জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি এশিয়ার চালের বাজারে স্থবিরতা
মার্চ ২৬, ২০২৬১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ অভিযানের মাধ্যমে পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর পরিকল্পিত ও সমন্বিত সামরিক হামলা চালায়। সেই রাতেই শুরু হয় ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ। বিভিন্ন গবেষণা ও বিবরণ অনুযায়ী, শুধু তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকাতেই প্রায় ১৫ হাজার মানুষ নিহত হন বলে ধারণা করা হয়। তবে ব্রিটিশ সরকারি নথিতে ওই রাতের মোট নিহতের সংখ্যা নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
ঢাকায় অবস্থিত ব্রিটিশ উপহাইকমিশন থেকে লন্ডনে পাঠানো সরকারি টেলিগ্রামগুলোতে বলা হয়, রাজধানীতে প্রায় পাঁচ হাজার এবং চট্টগ্রামে আরো তিন হাজার মানুষের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এ হিসাব দেশের অন্যান্য জেলা ও গ্রামীণ অঞ্চলের বাস্তব চিত্রকে অন্তর্ভুক্ত করে না। একই সঙ্গে লন্ডনে পাঠানো প্রায় প্রতিটি বার্তায় সেনাবাহিনীর অভিযানের ধরনকে ‘নির্মম’ ও ‘শাস্তিমূলক’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
ব্রিটিশ কূটনীতিকদের গোপনীয় প্রতিবেদনে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নৃশংসতার একটি সুস্পষ্ট ও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে আসে। এসব প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ঢাকাসহ পূর্ব পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলো দ্রুত সেনাবাহিনী পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। রেডিও পাকিস্তানের প্রতিবেদনে ২৬ মার্চ ঢাকা দখলের কথা ঘোষণা করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ধর্মঘট ও অবরোধ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয় এবং অনুমতি ছাড়া কোনো বিদেশী নাগরিক বা বিদেশী মিশনকে লিফলেট বিতরণের সুযোগ দেয়া হয়নি।
যুক্তরাজ্যের ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিসের (এফসিও) অধীন সাউথ এশিয়া ডেভেলপমেন্ট (এসএডি) বিভাগ দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক, সামরিক ও কূটনৈতিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করত। ঢাকা থেকে পাঠানো টেলিগ্রামের ভিত্তিতে তারা সে সময় একটি বিস্তারিত পরিস্থিতি প্রতিবেদন তৈরি করে। এসব বার্তা পাঠিয়েছিলেন তৎকালীন সহকারী সামরিক উপদেষ্টা মেজর কক্স এবং এফসিডি সার্জেন্ট, যা ঘটনাপ্রবাহের একটি প্রত্যক্ষ ও তাৎপর্যপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।
তাদের পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, ২৬ মার্চ থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করা হয় এবং রাস্তায় বের হলেই গুলি করার নির্দেশ দেয়া হয়। সামরিক আইন কর্তৃপক্ষ বেতার যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। এমনকি কূটনৈতিক টেলিগ্রাম আদান-প্রদানও অত্যন্ত গোপনীয়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, যা পরিস্থিতির তীব্রতা ও নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার কঠোরতা নির্দেশ করে।
কূটনীতিকদের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, সেনাবাহিনীর ভেতরে শৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রণ ছিল দুর্বল। ফলে তারা নির্বিচারে হত্যা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও গুলিবর্ষণের মতো সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। ঢাকায় ব্রিটিশ উপহাইকমিশন ভবনে সরাসরি হামলা না হলেও সেখানে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের নিরস্ত্র করে সরিয়ে দেয়া হয়। একই সময়ে ব্রিটিশ কাউন্সিলের উপপ্রতিনিধির ব্যবহৃত একটি গাড়ি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়।
এফসিডি সার্জেন্ট তার মূল্যায়নে উল্লেখ করেন, ‘সেনাবাহিনী একটি সন্ত্রাসের শাসন প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেছে এবং তা অনেকাংশে সফল হয়েছে।’ লন্ডনে পাঠানো অধিকাংশ টেলিগ্রামেই একই ধরনের মূল্যায়ন পাওয়া যায়, যা পুরো অভিযানের প্রকৃতি সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা দেয়।
ব্রিটিশ কূটনীতিকরা ২৫ মার্চের রাতের ঘটনাগুলো সম্পর্কে প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেন। একজন ব্রিটিশ সাংবাদিকের মাধ্যমে তারা জানতে পারেন, ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের একজন কর্মচারীর অস্ট্রিয়ান স্ত্রী ২৯ মার্চ পায়ে হেঁটে শহরের পরিস্থিতি দেখতে বের হয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানি সৈন্যরা তাকে ফিরিয়ে দেয়। তিনি দেখেন, রাস্তায় নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষের লাশগুলো ফেলার আগে এক জায়গায় জড়ো করে রাখা হচ্ছে।
আরেকজন প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন একজন ইংরেজিভাষী চেক নাগরিক। সে সময়ে তিনি চট্টগ্রামের একটি পাটকলের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছিলেন। তিনি ২৯ মার্চ সেখান থেকে বের হয়ে ৩০ মার্চ সামরিক বিমানে পাকিস্তানের করাচিতে পৌঁছান। তিনি জানান, কয়েকদিন ধরে গুলিবর্ষণ চলছিল, কিছু ভবন ধ্বংস হয়ে গেছে। বন্দর কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
এ ঘটনাকে ‘নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষের ওপর ব্যাপক হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে বর্ণনা করে ঢাকায় দায়িত্বরত ব্রিটিশ কূটনীতিক এফসিডি সার্জেন্ট লিখেছেন—
আমার স্থানীয় কর্মীদের একজনের বাড়ি লুট হয়ে গেছে এবং এখন তার গায়ে শুধু পরনের কাপড় ছাড়া কিছু নেই। আরো চৌদ্দজন (যাদের মধ্যে কয়েকজন হিন্দুও আছেন) নিখোঁজ। … সৈন্যরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ভবনের ফ্ল্যাটে থাকা সব শিক্ষক ও তাদের পরিবারকে হত্যা করেছে। দরজার তালা গুলি করে ভেঙে ভেতরে থাকা সবাইকে গুলি করে মেরে ফেলেছে। নিউ মার্কেটে দোকানে ঘুমিয়ে থাকা কসাইদেরও ঘুমন্ত অবস্থায় গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।
শিক্ষকদের মধ্যে কেউ কেউ সেই হত্যাযজ্ঞ থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন এবং যারা এ ধরনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন, তারা তাদের স্মৃতিকথায়ও একই ধরনের বিবরণ দিয়েছেন।
পাকিস্তানের ইসলামাবাদ থেকে ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ পাঠানো এক বার্তায় ব্রিটিশ হাইকমিশনার সিরিল পিকার্ড উদ্বিগ্ন হয়ে লিখেছিলেন—
২৫ মার্চ মধ্যরাতে সেনাবাহিনী ঢাকা শহরে প্রবেশ করে। একের পর এক বিস্ফোরণের পর সারা রাত ধরে বন্দুকযুদ্ধ চলে এবং পরদিনও তা কম মাত্রায় চলতে থাকে। ঢাকা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন ইঙ্গিত থেকে বোঝা যাচ্ছে, সেনাবাহিনী একটি সন্ত্রাসের শাসন কায়েম করার পরিকল্পনা করেছে এবং এখন পর্যন্ত তাতে অনেকটাই সফল হয়েছে। … পাকিস্তান সেনাবাহিনী মানুষের জীবনের প্রতি নির্মম উদাসীনতা দেখাচ্ছে এবং বাঙালিদের দমন করতে সন্ত্রাসী কৌশল গ্রহণ করছে। রাজনৈতিক নেতাদের খুঁজে বের করে হত্যা করা হচ্ছে (পাকিস্তানের ইতিহাসে যার কোনো নজির নেই) এবং আমি মনে করি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের বড় অংশই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী হত্যার বর্ণনাতেও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অন্তর্ভুক্ত ছিল। সার্জেন্ট লিখেছেন—
আমার এক কর্মী, যিনি গত শনিবার সেখানে গিয়েছিলেন, তাকে ভবনের সামনে বুলডোজারের চিহ্নসহ একটি গণকবর দেখানো হয়। শহরের বেশির ভাগ এলাকায় নির্বিচারে মানুষ হত্যা করা হয়েছে এবং প্রধান সড়কগুলোতে অসংখ্য লাশ পড়ে ছিল। নদীতে ভাসছিল মৃতদেহ। ৯টি ট্রাকে করে লাশ এনে পৌরসভার ময়লার ভাগাড়ে সমাহিত করা হয়েছে।
পাঞ্জাবি সেনারা হিন্দুদের ওপর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়। বিহারিরা (১৯৪৭ সালের পর ভারতের বিহার প্রদেশ থেকে পূর্ব পাকিস্তানে আসা উর্দুভাষী মানুষ) এবং স্থানীয়ভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত অন্যান্য লোকজন সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগ দিয়ে বাঙালিদের দমন করার সুযোগ নেয়। বেশকিছু টেলিগ্রামে কূটনীতিকরা বাঙালিদের ওপর বিহারিদের লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ এবং মারধরের কথা লেখেন। তারা আরো উল্লেখ করেন, ঢাকার পল্লবী, মিরপুর, মোহাম্মদপুর এবং আরো অনেক এলাকায় বিহারিরা এসব অভিযান চালিয়েছিল। মার্চের ঘটনার পরও বিহারিদের এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকে।
ঢাকায় ব্রিটিশ উপহাইকমিশনার তখন তার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন—
সশস্ত্র বিহারি মিলিশিয়ারা সেনাবাহিনীর হয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে; তারা বাঙালিদের ওপর ত্রাস সৃষ্টি করছে এবং হিন্দুদের নির্বিচারে হত্যা করছে। আমি এ বার্তা লেখার সময়ও প্রতিদিন আমার কাছে খবর আসছে যে বড় আকারে হত্যাকাণ্ড চলছে, গ্রামের পর গ্রাম ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে এবং সবখানে ব্যাপক লুটতরাজ চলছে।
ঢাকার মতো বরিশাল, মাদারীপুর, টাঙ্গাইল, মধুপুরের মতো গ্রামীণ এলাকাগুলোতেও একই ধরনের আক্রমণ হয়। কূটনীতিকরা সেসব তথ্যও সংগ্রহ করেছিলেন। ব্রিটিশ কর্মকর্তারা পূর্ব পাকিস্তান থেকে ব্রিটিশ নাগরিকদের সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। এক সংবাদ সম্মেলনে এফসিও কর্মকর্তারা জানান, যদিও নির্দিষ্ট কোনো প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি, তবুও সিঙ্গাপুর হয়ে এবং সে সময় চট্টগ্রাম বন্দরে অবস্থানরত ‘দ্য ক্ল্যান ম্যাকনেয়ার’ জাহাজ ব্যবহার করে তাদের সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ পাকিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন আগ্রহের সঙ্গে পড়তেন। তিনি এফসিওকে নির্দেশ দেন, লন্ডনে পৌঁছানো প্রত্যাগতদের কাছ থেকে যতটা সম্ভব বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করতে। পাকিস্তানের চলমান পরিস্থিতি সম্পর্কে পড়ার পাশাপাশি যখন তিনি জানতে পারেন প্রত্যাগতরা আসছেন, তখন তিনি কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন পাকিস্তানে কী ঘটছে তার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ সংগ্রহ করতে।
[অধ্যাপক সাবিনা নার্গিস লিপির ‘মার্চ ১৯৭১ ইন ইস্ট পাকিস্তান অ্যাজ সিন বাই ব্রিটিশ ডিপ্লোম্যাটস’ শীর্ষক গবেষণা প্রবন্ধের অংশবিশেষ।


