
জাতীয় স্মৃতিসৌধে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা
মার্চ ২৬, ২০২৬
২৫ মার্চের ক্র্যাকডাউনের পর ঢাকার ব্রিটিশ উপহাইকমিশন থেকে লন্ডনে যে বার্তা পাঠানো হয়
মার্চ ২৬, ২০২৬১৯৬৬ সালের সেপ্টেম্বর। পাকিস্তান থেকে লন্ডনে পাঠানো একটি গোপন বার্তায় তৎকালীন ব্রিটিশ হাইকমিশনার স্যার সিরিল স্ট্যানলি পিকার্ড অত্যন্ত বিষণ্ন সুরে লিখলেন, আইয়ুব খানের সরকার গভীর সংকটে পড়েছে।
প্রেসিডেন্ট আইয়ুব ‘বিচ্ছিন্ন এবং স্বৈরাচারী’ হয়ে পড়েছেন। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের ভুল হিসাবনিকাশ সরকার সম্পর্কে জনমনে সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। অর্থনৈতিক ক্ষমতা গুটিকয়েকের হাতে কুক্ষিগত, আর পাঞ্জাবের বাইরের অঞ্চলগুলো মনে করছে তারা ন্যায্য অধিকার পাচ্ছে না।
তবু পিকার্ডের মত ছিল স্পষ্ট, ‘পশ্চিমের স্বার্থেই প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের টিকে থাকা উচিত।’ তিনি বিশ্বাস করতেন, বিগত দশকের গণতন্ত্র তৎকালীন পাকিস্তানে কেবল অস্থিতিশীলতাই বয়ে এনেছে। পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ে তার দুই ডেপুটি বার্ট্রাম ফ্ল্যাক ও রয় ফক্সের চেয়ে তিনি ছিলেন কিছুটা বেশি আশাবাদী। কিন্তু ১৯৬৮ সালের নভেম্বরের শেষে ফক্স সতর্ক করে লিখলেন, ‘বিদ্যমান পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে সামান্য একটি প্রভাবক বা স্ফুলিঙ্গ বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারে।’
ঠিক সেই সময়ে পশ্চিম পাকিস্তানে ভুট্টোর ক্রমবর্ধমান প্রচারণার সঙ্গে বাঙালিদের ‘মোহভঙ্গের’ ঢেউ মিলে গেল। রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি দেখে পিকার্ড হতাশ হয়ে পড়লেন। ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারির শুরুতে লন্ডনকে তিনি লিখলেন যে গত ২০ বছর ধরে বিশ্বের এ অংশের ঘটনাবলি সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করার জন্য যে ‘ক্রিস্টাল বল’ তিনি ব্যবহার করতেন, তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি অস্পষ্ট হয়ে পড়ছে।
সংকটের গতি এত তীব্র ছিল যে প্রতিবেদন তৈরির চাপ পিকার্ডের সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছিল। পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথ বিষয়ক দপ্তরের (এশিয়া) উপসহকারী সচিব স্যার জন জনস্টোন তাকে মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনের নিয়ম মনে করিয়ে দিয়ে লিখলেন—
ব্রিটিশ পদ্ধতিতে আমরা সকল উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্যের বিশ্লেষণ, সারসংক্ষেপ ও নির্যাস বের করার জন্য সংশ্লিষ্ট পদ বা দায়িত্বের ওপর নির্ভর করি। আমেরিকানরা সাধারণত যাচাই-বাছাই না করেই বিপুল পরিমাণ তথ্য ও মন্তব্য ওয়াশিংটনে পাঠিয়ে দেয় এবং স্টেট ডিপার্টমেন্টের এক বিশাল কর্মী বাহিনী তা বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেয়। এটি কোনো ভালো ব্যবস্থা নয়। এটি কেবল জনবলই অপচয় করে না, বরং ঘটনাস্থলে থাকা ব্যক্তির বিচার-বিবেচনা ব্যবহারের সুযোগ দেয় না—যে বিচার-বিবেচনা অনেক সময় যুক্তিতর্কের চেয়েও অন্তর্দৃষ্টিনির্ভর হতে পারে।
জনস্টোনের এ বার্তার মাত্র ১১ দিন পর আইয়ুব খান পদত্যাগ করে জেনারেল ইয়াহিয়া খানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করলেন। জনস্টোন কিছুটা বিরক্ত হয়ে পিকার্ডকে জানালেন, ‘সংকটকালে চিঠিপত্র অত্যন্ত ধীরগতিসম্পন্ন… আপনার কোনো চিঠিই আমার কাছে পৌঁছতে ৪ দিনের কম সময় নেয়নি। বেশকিছু চিঠি পৌঁছতে এক সপ্তাহ পর্যন্ত লেগেছে।’ তিনি আরো বললেন, ‘অন্যান্য মাধ্যমের তুলনায় দাপ্তরিক চিঠি দ্রুত বণ্টনের জন্য কম উপযোগী।’
জনস্টোন তিন-স্তরবিশিষ্ট ব্যবস্থার নির্দেশ দিলেন: প্রথমত, তারবার্তা বা টেলিগ্রামের মাধ্যমে সংক্ষিপ্ত সিটরেপ (Sitreps) পাঠিয়ে পরিস্থিতির তাৎক্ষণিক তথ্য; দ্বিতীয়ত, সংকটের বিকাশ ও কারণ নিয়ে সাধারণ বর্ণনা (যা প্রচারিত হবে না); তৃতীয়ত, সংকটের শেষে বা কোনো চূড়ান্ত পর্যায়ে একটি সামগ্রিক বার্তা, যা পুরো বিষয়ের গুরুত্ব স্পষ্টভাবে তুলে ধরবে।
পিকার্ড এরপর থেকে এ পদ্ধতি কঠোরভাবে অনুসরণ করতে শুরু করলেন। কিন্তু সংকট থামল না। ইয়াহিয়া সাধারণ নির্বাচনের ডাক দিয়ে আরেকটি ভুল হিসাব করলেন। তার ধারণা ছিল, এতে একটি ‘ঝুলন্ত পার্লামেন্ট’ তৈরি হবে যা সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকবে। বাস্তবে দেখা গেল, দেশের দুই অংশের মধ্যে ভয়ংকর মেরুকরণ—পশ্চিমে ভুট্টোর পিপিপি ও পূর্বে শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ জয় পেল। ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বরের নির্বাচনের মাত্র পনেরো দিনের মধ্যে পিকার্ড লন্ডনকে জানালেন, ‘পাকিস্তান উন্নতির দিকে যাত্রা শুরু করবে নাকি দ্রুত ধ্বংসের দিকে নামবে, তা নির্ভর করছে রাজনীতিবিদরা ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে পারছেন কিনা তার ওপর।’
পরবর্তী সময়ে জাতীয় পরিষদের অচলাবস্থা নিরসনে ব্যর্থতার দিকে ফিরে তাকিয়ে পিকার্ড লিখলেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমানের সাফল্যই তাকে এক অর্থে তার নিজ দলের চরমপন্থীদের কাছে বন্দি করে ফেলেছিল; আর পশ্চিমে ভুট্টোর তুলনামূলক কম সাফল্য তাকে এমন এক প্রতিপক্ষের মুখোমুখি করেছিল, যে সাংবিধানিক সমাধানের চেয়ে মুজিবকে ধ্বংস করে ক্ষমতা দখলেই বেশি আগ্রহী।’
১৯৭১ সালের ২৭ থেকে ৩০ জানুয়ারি ঢাকায় মুজিবের সঙ্গে ভুট্টোর আলোচনা হলো। কোনো অগ্রগতি ছাড়াই ভুট্টো সাংবিধানিক বিষয়ের চেয়ে মন্ত্রিত্বের ভাগাভাগির ওপর বেশি জোর দিলেন। ইয়াহিয়া যখন তাকে রাওয়ালপিন্ডিতে তলব করলেন, ভুট্টো ঘোষণা করলেন যে পিপিপিকে ছাড়া সংবিধান তৈরি করা হবে ডেনমার্কের রাজপুত্রকে ছাড়া হ্যামলেট নাটক মঞ্চস্থ করার মতো। পিকার্ড লন্ডনকে জানালেন, ইয়াহিয়া খানের জাতীয় পরিষদ স্থগিত করার সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য ছিল ‘উত্তেজনা প্রশমন ও ফলপ্রসূ আলোচনার সুযোগ দেয়া।’
১৯৭০ সালের নভেম্বরের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের দিকে আন্তর্জাতিক নজর পড়ল। ডেইলি এক্সপ্রেসে ইয়ান ব্রোডি ও মিররে জন পিলজারের প্রতিবেদন টেলিভিশন-রেডিওতে ছড়িয়ে পড়ল। বিবিসির প্রতিনিধি এবিএম মূসার সঙ্গে যোগ দিলেন সিঙ্গাপুর থেকে আসা ব্রায়ান ব্যারন। নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অচলাবস্থা, বাঙালিদের ধর্মঘট ও বিক্ষোভ—সবকিছু বিবিসি গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করল। পিকার্ড এ প্রতিবেদনের ‘বস্তুনিষ্ঠতার’ প্রশংসা করলেন ঠিকই, কিন্তু লন্ডনকে জানালেন যে উর্দু সংবাদপত্রগুলো একে ‘উসকানিমূলক পূর্বাভাস’ বলে সমালোচনা করছে।
ইয়াহিয়ার সামরিক অভিযানের মাধ্যমে সংকট এক পর্যায়ে গৃহযুদ্ধে রূপ নিল। হোয়াইট হলে বিবিসির সমালোচনা হলো—তবে ‘পক্ষপাতের’ জন্য নয়, বরং ব্রিটিশ নাগরিকদের সরিয়ে নেয়ার বিষয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেয়ার জন্য। স্যার লরেন্স পামফ্রে কড়া ভাষায় বিবিসির বিরুদ্ধে ‘ভারতের পক্ষে’ সংবাদ প্রচারের অভিযোগ তুললেন।
ঢাকায় ঘটে যাওয়া নাটকীয় ঘটনাবলি থেকে তখন পিকার্ড দূরে ছিলেন। লন্ডনের কাছে সঠিক চিত্র পৌঁছে দিচ্ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের ডেপুটি হাইকমিশনার ফ্রাঙ্ক সার্জেন্টের তারবার্তাগুলো।
৫ মার্চ ফ্রাঙ্ক সার্জেন্ট আরেকটি বিস্তারিত তারবার্তায় জানালেন, ঢাকার বাইরের যোগাযোগ ব্যবস্থা ‘বিপর্যস্ত’। চট্টগ্রাম, খুলনা ও ছোট শহরগুলোতে ‘ব্যাপক’ বিশৃঙ্খলা ঘটেছে।
অপারেশন সার্চলাইট শুরুর আগেই ইয়াহিয়া বিদেশী সাংবাদিকদের বহিষ্কার করলেন ও কূটনৈতিক বেতার যোগাযোগ নিষিদ্ধ করলেন। তখন ঢাকার ব্রিটিশ মিশন জরুরি ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে গোপন যোগাযোগ শুরু করল। লন্ডন জানতে পারল, সেনাবাহিনী একটি ‘ত্রাসের রাজত্ব’ শুরু করেছে। ফ্রাঙ্ক সার্জেন্টের বার্তায় ঢাকায় সেনাবাহিনীর আক্রমণে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারানোর ভয়াবহ বর্ণনা ছিল। ইকবাল হল ও জগন্নাথ হল ছিল প্রধান লক্ষ্য। ‘দুইদিন পরেও পোড়া ঘরগুলোতে মরদেহ জ্বলছিল। বাইরে ছড়িয়ে ছিল মৃতদেহ। পাশের লেকেও ভাসছিল আরো অনেক মরদেহ।’ সেনাবাহিনীর অভিযানে পাশের ব্রিটিশ কাউন্সিল অফিস ও লাইব্রেরিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাঙালিদের প্রতিরোধ তীব্র হওয়ায় ঢাকার বাইরে ভ্রমণ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠল। চট্টগ্রাম ও সিলেটের চা-বাগানে থাকা ব্রিটিশদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিল। যারা ঢাকায় পৌঁছতে পেরেছিল, তারা ভয়াবহ বর্ণনা দিল। কলকাতায় পৌঁছানো শরণার্থীদের সাক্ষাৎকার নিয়ে ক্যাবিনেট ইন্টেলিজেন্স অফিসে পাঠানো হলো। এক প্রত্যক্ষদর্শী বললেন, সেনাবাহিনী ঢাকা থেকে হিন্দুদের ধরে নিয়ে গুলি করে হত্যা করছে। আরেকজন জানালেন, ‘চট্টগ্রামে অন্তত দুই-তিন হাজার মানুষ মারা গেছে। রাস্তায় অনেক মরদেহ পড়ে আছে, যা কুকুর ও শকুনে খাচ্ছে।’
ঢাকার ব্রিটিশ মিশন তাদের কর্মী জ্যাক লংকে চট্টগ্রামে পাঠাল। ৪ এপ্রিল তিনি অন্য কূটনীতিকদের সঙ্গে সেনাবাহিনীর প্রহরায় সেখানে পৌঁছালেন। সেনাবাহিনী তখন সদ্য ‘বিদ্রোহী’ ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের কাছ থেকে বন্দর নগরীটি পুনর্দখল করেছে। লং দুই সপ্তাহ ধরে সেখানে থেকে ব্রিটিশদের সরিয়ে নিলেন ও তথ্য সংগ্রহ করলেন। তিনি জানালেন, ‘পুরো শহর চরম আতঙ্কে ছিল। ব্যাপকভাবে লুটপাট চলছিল। ধর্ষণের খবরও পাওয়া যাচ্ছিল।’
২৮ এপ্রিল সার্জেন্ট সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য লংয়ের সঙ্গে যোগ দিলেন। পথ পরিষ্কার হলে লং ও ইউনাইটেড কিংডম অ্যাসোসিয়েশন অব পাকিস্তানের সদস্যরা চট্টগ্রামের বাইরের ব্রিটিশ মালিকানাধীন জুট মিলগুলো পরিদর্শন করলেন।
অন্যদিকে কিছু ব্রিটিশ নাগরিককে বীর হিসেবে দেখা হয়। চন্দ্রঘোনার কর্ণফুলী পেপার মিলের দুই ম্যানেজার বাঙালি রাইফেলস ও আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণের সময় প্রায় ২০০ অবাঙালি নারী ও শিশুর প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন বলে জানা যায়।
চট্টগ্রামের এ বিবরণগুলো ঢাকার চিত্রের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ফ্রাঙ্ক সার্জেন্ট তখন পিকার্ডকে জানালেন, চট্টগ্রামের ব্রিটিশরা মনে করছেন বেলুচ সৈন্যদের দুটি কোম্পানি তাদের আওয়ামী লীগ, ছাত্র ও অন্যান্য বিশৃঙ্খলাকারীদের হাত থেকে রক্ষা করেছে। তিনি লিখলেন, ‘তারা সেনাবাহিনীকে তাদের জীবন ও সম্পদের রক্ষাকর্তা হিসেবে দেখছেন…ফলে তারা ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ও বিবিসির কঠোর সমালোচনা করছেন।’
পিকার্ড লন্ডনকে ‘নিরপেক্ষ’ অবস্থান নেয়ার পরামর্শ দিলেন। এপ্রিলে তিনি লিখলেন, ‘আমার মতে আমাদের নীতি হওয়া উচিত দড়ির ওপর দিয়ে হাঁটার মতো—বর্তমান সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থনও না করা, আবার একতরফাভাবে এর প্রকাশ্য “বিরোধিতাও” না করা।’
কিন্তু যুক্তরাজ্যে টেলিভিশন ও সংবাদপত্র বাঙালি দাবির পক্ষে জনমত তৈরি করে ফেলেছিল। নির্বাসিত রাজনৈতিক কর্মীরা সোচ্চার হয়ে উঠলেন। তাদের মধ্যে আবু সাঈদ চৌধুরী জেনেভায় মানবাধিকার কমিশন থেকে পদত্যাগ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে লন্ডনে চলে এলেন। প্রোপাগান্ডা যুদ্ধে হেরে যাচ্ছে বুঝে তৎকালীন পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রিতভাবে সাংবাদিকদের প্রবেশের অনুমতি দিল। কিন্তু ফল হলো উল্টো।
অ্যান্থনি মাসকারেনহাস স্বতন্ত্র অনুসন্ধান চালিয়ে ১৩ জুন ‘সানডে টাইমস’-এ তিন পৃষ্ঠার কঠোর প্রতিবেদন প্রকাশ করলেন। তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ডকে ‘গণহত্যা’ বলে অভিহিত করলেন। প্রতিবেদনটি ব্রিটিশ জনমনে তীব্র ক্ষোভের ঝড় তুলল। পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের ‘ইন-ট্রে’ এমপিদের চিঠি, সাধারণ মানুষের পিটিশন ও তারবার্তায় ভরে গেল। সবাই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের দাবি জানালেন। লেবার পার্টির এমপি জন স্টোনহাউস পার্লামেন্টে ‘আর্লি ডে মোশন’ জমা দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের সহিংসতাকে ‘গণহত্যা’ ও ‘আন্তর্জাতিক শান্তির জন্য হুমকি’ বলে অভিহিত করলেন।
ব্রিটিশ সরকার তখন পূর্ব পাকিস্তানের কর্মকর্তাদের ও ব্রিটিশ শরণার্থীদের দেয়া তথ্যগুলো ব্যবহার করা সুবিধাজনক মনে করে। এসব তথ্যে প্রমাণিত হয় যে সহিংসতা কেবল একতরফা ছিল না।
পাকিস্তানে থাকা ব্রিটিশ মিশন সহিংসতার সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ দিলেও সামরিক পদক্ষেপের পরিণতি নিয়ে তাদের মূল্যায়ন ছিল নির্মম। ফ্রাঙ্ক সার্জেন্ট লিখলেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনী একটি ‘বিজয় অভিলাষী দখলদার বাহিনীর’ মতো আচরণ করছে। এপ্রিলের শেষে পিকার্ডও একমত হলেন যে এ কর্মকাণ্ড বাঙালিদের মনে সেনাবাহিনীর প্রতি এমন ঘৃণার জন্ম দিয়েছে, যা আর কখনো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে দেবে না।
পরের মাসে তিনি নিরাশ হয়ে বললেন, ‘১৯৪৭ সালের দেশভাগের পুরো ভিত্তি ও যৌক্তিকতা এখন সন্দেহের মুখে।’ এর কিছুদিন পর নতুন হাইকমিশনার লরেন্স পামফ্রে সামরিক হস্তক্ষেপকে ‘ভয়াবহ ভুল’ বলে আখ্যা দিলেন। তিনি অনুমান করলেন যে ইয়াহিয়া পরাজয় স্বীকার করার চেয়ে লড়াই করে ধ্বংস হওয়াকেই বেছে নেবেন।
শেষ পর্যন্ত বাস্তব রাজনীতি বা ‘রিয়েলপলিটিক’ লন্ডনের মনোভাবকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কঠোর করে তোলে। ১৯৭১ সালের আগস্টের মাঝামাঝি দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের সহকারী প্রধান এইচ সি বাইয়াট লিখলেন, ‘আমরা একটি নতুন পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছি যেখানে আমাদের ভবিষ্যতের স্বার্থ মূল্যায়ন করতে হবে। আমরা হয়তো এ সিদ্ধান্তে পৌঁছব যে ভারতের সঙ্গে একটি কার্যকর সম্পর্ক টিকিয়ে রাখাই আমাদের মূল স্বার্থ।’ এ ‘টিল্ট’ বা ঝোঁক শুধু ইসলামাবাদ নয়, ওয়াশিংটনের সঙ্গেও সম্পর্ককে প্রভাবিত করল—কারণ প্রেসিডেন্ট নিক্সন ছিলেন কট্টর ইয়াহিয়াপন্থী। ব্রিটিশ হাইকমিশন তখন দ্বিমুখী চাপে পড়ল—একদিকে পাকিস্তানে গোলাগুলির মধ্যে ব্রিটিশ নাগরিকদের উদ্ধার, অন্যদিকে কূটনৈতিক টানাপড়েন।
ইয়ান ট্যালবটের ‘দ্য হিস্ট্রি অব ব্রিটিশ ডিপ্লোম্যাসি ইন পাকিস্তান’ গ্রন্থের রিপোর্টিং ফ্রম পাকিস্তান অংশের অনুবাদ।


