
যুদ্ধের কারণে বাড়তে পারে জিনিসপত্রের দাম
মার্চ ২৪, ২০২৬
টানা তিন মাস পতনের পর জানুয়ারিতেও রফতানি কমেছে ২৫.২৫% ইউরোপে পোশাক রফতানি নিয়ে উৎকণ্ঠায় রফতানিকারকরা
মার্চ ২৪, ২০২৬ঈদের ছুটির মধ্যে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় অকটেন-পেট্রলের সংকট তৈরি হয়েছে। বেশির ভাগ পাম্পে ডিজেল মিললেও পর্যাপ্ত পেট্রল-অকটেন না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন ভোক্তারা।
সেই সঙ্গে অকটেন-পেট্রল না থাকায় রাজধানীসহ সারা দেশে অনেক পাম্প বন্ধ থাকার খবর পাওয়া গেছে। যেসব পাম্পে পেট্রল-অকটেন পাওয়া যাচ্ছে সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে থেকে তেল সংগ্রহ করতে দেখা গেছে ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল আরোহীদের। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ঈদের কারণে দুইদিন সরবরাহ বন্ধ থাকায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। তবে পাম্প মালিকরা বলছেন, চাহিদা অনুযায়ী ডিপো থেকে পর্যাপ্ত সরবরাহ না পাওয়ায় জ্বালানি তেলের সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে। এক্ষেত্রে আতঙ্কিত ক্রেতাদের অতিরিক্ত জ্বালানি কেনার প্রতিযোগিতাও বড় ভূমিকা রাখছে বলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
এমন পরিস্থিতিতে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক আছে। তিনি জনগণকে প্যানিক (আতঙ্কিত) না হওয়ার অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, ‘সরকারের নেতৃত্বে ভর্তুকি দিয়েও তেল আমদানি অব্যাহত আছে। ঈদের কারণে গত দুইদিন সরবরাহ বন্ধ থাকায় জনগণকে একটু চাপ পেতে হয়েছে। গত বছরের তুলনায় ২৫ ভাগ বেশি তেল আমদানি করা হচ্ছে। সবাই তেল পাবে, জনগণকে প্যানিক না হয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী তেল নেয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।’
এক প্রশ্নের জবাবে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, ‘স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে কিনে জনগণের স্বস্তির জন্য দাম না বাড়িয়ে আমরা তেল দিচ্ছি। সে জন্যই আমি জনগণের কাছে আহ্বান করছি যে আপনারা প্যানিক করবেন না। আপনাদের প্রয়োজনের বেশি তেল নেবেন না।
কী পরিমাণ জ্বালানি তেল মজুদ আছে জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি তেল সরবরাহ করছি। মজুদটা তো এভাবে থাকে না। আসে-যায়, আসে-যায়। আমরা ২৫ শতাংশ বেশি সরবরাহ করছি। শুধু গত দুইদিন কিছু পাম্প বন্ধ ছিল, এখন আবার শুরু হয়ে গেছে।’
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে দেশে ভোক্তাদের মধ্যে জ্বালানি তেলের সংকট নিয়ে আতঙ্ক ভাব তৈরি হয়েছে কয়েক সপ্তাহ ধরে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার রেশনিং পদ্ধতি গ্রহণ করলেও পরে তা তুলে নেয়। এতে ঈদের আগে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়। তবে বিভিন্ন পাম্পে তেল নিতে ভোক্তাদের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়।
গতকাল রাজধানীর পাম্পগুলোতে অকটেন ও পেট্রলের আকস্মিক সংকট দেখা দেয়। মতিঝিল, গাবতলী, শাহবাগ, তেজগাঁও, মহাখালীর বিভিন্ন পাম্পে অকটেন পাওয়া যায়নি, আবার পেট্রলেরও সংকট ছিল কোথাও কোথাও। এ সরবরাহ ঘাটতির জন্য ঈদের ছুটিতে দুইদিন ডিপো বন্ধ থাকা এবং সেজন্য পর্যাপ্ত তেল উত্তোলন করতে না পারাকে কারণ হিসেবে দেখছেন পাম্প মালিকরা।
শুধু রাজধানী নয়, গতকাল বিভিন্ন বিভাগীয় শহরের পাম্পে তেল না পাওয়ার অভিযোগ ছিল বলে জানিয়েছেন বণিক বার্তার প্রতিনিধিরা। উত্তরের জেলা গাইবান্ধার ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেল সংকটের খবর পাওয়া যায়। সেখানে কয়েক সপ্তাহ ধরে এ সমস্যা চলছে। তেলের সন্ধানে এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে ছুটছেন ভোক্তারা। কোথাও সীমিত পরিমাণ সরবরাহ এলেও দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেকে তা পাচ্ছেন না।
সরজমিনে দেখা গেছে, জেলার অধিকাংশ পাম্পে ‘তেল নেই’ লেখা নোটিস ঝুলছে। কোথাও অল্প পরিমাণ সরবরাহ এলেও তা দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। অনেকে দীর্ঘসময় অপেক্ষা করেও তেল না পেয়ে উত্তেজনা ও বাকবিতণ্ডায় জড়াচ্ছেন।
উত্তরের আরেক জেলা নীলফামারীতে টানা তিন সপ্তাহ ধরে পেট্রল ও অকটেন সংকটের খবর পাওয়া গেছে। সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকায় জেলার অধিকাংশ তেল পাম্প কার্যত বন্ধ রয়েছে। কোথাও সীমিত পরিমাণ তেল এলেও তা দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে।
টাঙ্গাইল জেলায় হঠাৎ করে তীব্র জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। জেলার অধিকাংশ পেট্রল পাম্পে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ ভোক্তারা।
এমন পরিস্থিতিতে অনেক জেলায় বিভিন্ন হাটবাজারে খুচরা বিক্রেতারা বেশি দামে পেট্রল ও অকটেন বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নীলফামারীর ডোমার, কিশোরগঞ্জ, সৈয়দপুর ও জলঢাকা উপজেলার জ্বালানি সংকটের সুযোগে খোলা বাজারে অতিরিক্ত দামে পেট্রল ও অকটেন বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। হাটবাজারে প্রতি লিটার পেট্রল ৩০০ ও অকটেন ৩২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা সরকারি মূল্যের প্রায় তিন গুণ। স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও পাম্প মালিক সিন্ডিকেট করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন।
এদিকে পাম্পে অকটেন-পেট্রল না পাওয়ায় ফিলিং স্টেশন কর্মীদের মারধর ও স্টেশন ভাংচুরের মতো অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিভিন্ন স্থানেই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে বলে জানিয়েছেন পেট্রল পাম্প মালিকরা। এ পরিস্থিতিতে পাম্পগুলোতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে। সেই সঙ্গে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার জন্য পুলিশ-প্রশাসনের সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলারস, ডিস্ট্রিবিউটরস, এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। গতকাল গণমাধ্যমের উদ্দেশে এক বার্তায় এ আহ্বান জানান সংগঠনটির আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল।
বার্তায় তিনি বলেন, ‘বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক চাহিদা বেড়ে গেছে। ডিপো থেকে পেট্রলপাম্পগুলোতে চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ করতে পারছে না। অন্যদিকে মোটরসাইকেল ও সাধারণ ভোক্তাদের ফিলিং স্টেশনে উপচে পড়া ভিড় ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় সাধারণ ভোক্তা ও মোটরসাইকেলচালক কর্তৃক ফিলিং স্টেশনের কর্মীদের মারধর করা হচ্ছে। এমনকি ফিলিং স্টেশনে ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে, প্রতিনিয়ত এসব ঘটনা বেড়েই চলেছে। এ পরিস্থিতিতে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতা নিয়ে ফিলিং স্টেশন চালু রাখতে হবে। অন্যথায় কারো আদেশের অপেক্ষায় না থেকে ফিলিং স্টেশন পরিচালনার ক্ষেত্রে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েই স্টেশন চালাতে হবে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে ফিলিং স্টেশনের সব কর্মচারীকে নিরাপত্তা দিতে প্রশাসনের প্রতি জোর আহ্বান জানান ফিলিং স্টেশন মালিকরা।
বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, দেশে অকটেনের মজুদ পর্যায়ে কোনো সংকট নেই। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৭ মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন চাহিদার চেয়ে দ্বিগুণ পরিমাণ অকটেন বিক্রি হয়েছে। এছাড়া আগামী ২ এপ্রিল ২৫ হাজার টনের একটি অকটেনবাহী কার্গো দেশে আসার কথা রয়েছে। ফলে সংকটের কোনো সুযোগ নেই। এছাড়া সিআরইউ প্লান্টগুলো অকটেন উৎপাদন অব্যাহত রেখেছে। সেখানেও কোনো সংকটের খবর নেই।


