সাপ্তাহিক পুঁজিবাজার ব্লুচিপ সূচক ডিএস-৩০ কমেছে পৌনে ১ শতাংশ
মার্চ ১৯, ২০২৬
সিটি ব্যাংকের ৩৫ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন
মার্চ ১৯, ২০২৬
সাপ্তাহিক পুঁজিবাজার ব্লুচিপ সূচক ডিএস-৩০ কমেছে পৌনে ১ শতাংশ
মার্চ ১৯, ২০২৬
সিটি ব্যাংকের ৩৫ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন
মার্চ ১৯, ২০২৬

ইরানে সর্বনিম্ন মজুরি ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি, যুদ্ধ ও রেকর্ড মূল্যস্ফীতির কবলে জনজীবন

তেহরানে চলমান যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে বিপর্যস্ত ইরানের অর্থনীতি।

দেশটির সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় যখন আকাশচুম্বী, ঠিক তখনই সরকারিভাবে সর্বনিম্ন মজুরি ৬০ শতাংশ বৃদ্ধির ঘোষণা দেয়া হয়েছে। সোমবার ইরানের শ্রমমন্ত্রী আহমাদ মেদরি মজুরি বৃদ্ধির বিষয়টি নিশ্চিত করেন। খবর ইউরো নিউজ।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মাসিক সর্বনিম্ন মজুরি ১০ কোটি ৩০ লাখ রিয়াল (৬৭ দশমিক ৫ ইউরো) থেকে বাড়িয়ে ১৬ কোটি ৬০ লাখ রিয়াল (১০৯ ইউরো) নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে ইরান। একদিকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ, অন্যদিকে কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা। সব মিলিয়ে দেশটির সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। মূল্যস্ফীতি রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছানোয় সাধারণ পরিবারের বাজেট এখন তছনছ হয়ে গেছে।

এর আগে ২০২৩ সালের শুরুতে ইরানে ব্যাপক বিক্ষোভ দেখা দিয়েছিল, যার মূল কারণ ছিল অর্থনৈতিক দুর্দশা। সেই বিক্ষোভ দমনে ইরানের সামরিক ও নিরাপত্তা সংস্থা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নেয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি অনুযায়ী, এতে অন্তত ৩৬ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।

সরকারি তথ্যানুযায়ী, মূলত শ্রমিক সংগঠনগুলোর তীব্র চাপ ও সমাজকে স্থিতিশীল করার প্রয়াস হিসেবেই কর্তৃপক্ষ মজুরি বৃদ্ধির এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বর্তমানে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের মান মার্কিন ডলারের বিপরীতে ভয়াবহভাবে কমে গেছে। ১ মার্কিন ডলারের বিনিময় হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩ লাখ ৫০ হাজার রিয়াল। চরম মূল্যস্ফীতির কারণে ইরানি শ্রম আইনের অধীনে থাকা সাধারণ শ্রমিকদের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। যদিও আইআরজিসির প্যাকেজের অংশ হিসেবে পারিবারিক এবং শিশু ভাতাও বৃদ্ধি করা হয়েছে, তবু তা বর্তমান চাহিদার তুলনায় নগণ্য বলে মনে করেন অনেকে।

নতুন মজুরি কাঠামো আগামী ২০ মার্চ থেকে কার্যকর হবে, যা পারস্য ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নতুন বছর ১৪০৫ সালের শুরু। উল্লেখ্য, পারস্য ক্যালেন্ডার একটি সৌর ক্যালেন্ডার, ইরান এবং আফগানিস্তানে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবহৃত হয় এবং এটি ৬২২ খ্রিস্টাব্দ থেকে গণনা শুরু হয়েছিল।

বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতি বছর মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ইরান সরকার মজুরি পুনর্নির্ধারণ করে থাকলেও এবার যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার কারণে এ নীতি কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হচ্ছে। সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হওয়া ও রিয়ালের দ্রুত দরপতনের মধ্যেই ৬০ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধি অনুমোদন করা হয়েছে, তবে পরিসংখ্যান বলছে, এ বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির তুলনায় যৎসামান্য।

ইরানে একটি সাধারণ পরিবারের মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্য প্রতি মাসে অন্তত ৫৮ কোটি রিয়াল (৩৮০ ইউরো) প্রয়োজন, সেখানে নতুন নির্ধারিত মজুরি মাত্র ১৬ কোটি ৬০ লাখ রিয়াল। এর আগে শ্রমিক সংগঠনগুলো অন্তত ৬০ কোটি রিয়াল (৩৯৩ ইউরো) মজুরির দাবি জানায়।

২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, ইরানে খাদ্য মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯০ শতাংশের কাছাকাছি এবং সামগ্রিক ভোক্তা মূল্যসূচক ৪৪ দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্ট্যাটিস্টিক্যাল সেন্টার অব ইরান ৬৮ দশমিক ১ শতাংশ মূল্যস্ফীতির খবর দিয়েছে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেশটিতে সর্বোচ্চ।

অন্যদিকে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূল্যস্ফীতির হার ৬২ দশমিক ২ শতাংশ বলে দাবি করেছে। ২০২২ সালের ভর্তুকি সংস্কারের পর থেকে মাসিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা একটি নতুন রেকর্ড।

পাশাপাশি দেশটির খাদ্যপণ্যের দামের দিকে তাকালে এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। খাদ্যসামগ্রীর দাম সামগ্রিকভাবে ১১০ শতাংশ বেড়েছে। রুটি ও খাদ্যশস্য বেড়েছে ১৪২ শতাংশ। মাংসের দামে ১১৭ শতাংশ উল্লম্ফন হয়েছে। ভোজ্যতেল বেড়েছে ২০৭ শতাংশ।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত এক দশকে মার্কিন ডলারের তুলনায় ইরানের শ্রমিকদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ৩০০ শতাংশেরও বেশি কমে গেছে। অর্থাভাবে অনেক পরিবার তাদের খাদ্য তালিকা থেকে প্রোটিন বাদ দিতে বাধ্য হয়েছে, বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারগুলোতে মাংস খাওয়ার হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। জীবন ধারণের জন্য অনেক ইরানি অতিরিক্ত কাজ বা সম্পদ বিক্রির পথ বেছে নিচ্ছে। মানুষ এখন বেশি করে শর্করা জাতীয় খাবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ৬০ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধি শ্রমিকদের সাময়িক স্বস্তি দিলেও কাঠামোগত সংস্কার, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং মুদ্রার পতন রোধ না করলে এর প্রভাব দ্রুত ম্লান হয়ে যাবে। কারণ বর্তমান দ্রব্যমূল্য ১৯৪১ সালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার ভয়াবহতাকেও ছাড়িয়ে গেছে। সেই সময় ব্রিটেন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন ইরানের সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে নিতে দেশটিকে দখল করে, ফলে সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়ে এবং তীব্র দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। ১৯৪২-৪৩ সালে সেই খাদ্য সংকট ও রোগে আক্রান্ত হয়ে হাজার হাজার ইরানি প্রাণ হারায়। অনেকে বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি সেই ভয়াবহ উল্লম্ফনের স্মৃতিকেই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *