অব্যাহত লোকসানে খুলনায় কমেছে তরমুজের আবাদ
মার্চ ১৯, ২০২৬
গাইবান্ধায় খাল খনন কর্মসূচি উদ্বোধন
মার্চ ১৯, ২০২৬
অব্যাহত লোকসানে খুলনায় কমেছে তরমুজের আবাদ
মার্চ ১৯, ২০২৬
গাইবান্ধায় খাল খনন কর্মসূচি উদ্বোধন
মার্চ ১৯, ২০২৬

ঈদের দীর্ঘ ছুটি সমুদ্রসৈকত পাহাড় চা বাগান ঘিরে দেশীয় পর্যটনে চাঙ্গা ভাব

দীর্ঘ ছুটি মানেই শহুরে ক্লান্তির গণ্ডি পেরিয়ে মুক্ত বাতাসে ডানা মেলার আহ্বান। ছুটি যদি উৎসবের রঙে রঙিন হয় তাহলে উদযাপনের মাত্রাও বেড়ে যায় বহু গুণ।

এবারের ঈদুল ফিতর উপলক্ষে গত মঙ্গলবার থেকেই সরকারি ছুটি শুরু হয়েছে। ঘোষিত এ ছুটির মেয়াদ টানা সাতদিন হলেও চলতি মার্চের বাকি সময়জুড়েও ছুটির আমেজে থাকবে গোটা দেশ। কারণ ২৬ মার্চ বৃহস্পতিবার স্বাধীনতা দিবস হওয়ায় আবারো টানা তিনদিনের ছুটি শুরু হবে। আর দীর্ঘ এ ছুটিকে কেন্দ্র করে জমে উঠতে শুরু করেছে দেশের পর্যটন খাত।

দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটনের জন্য সবচেয়ে আকর্ষণীয় জেলা কক্সবাজার এরই মধ্যে সরগরম হয়ে উঠেছে। সমুদ্র-তীরবর্তী জেলাটির প্রায় ৯০ শতাংশ আবাসিক হোটেল-মোটেল আগাম বুকিং হয়ে গেছে। কক্সবাজার ছাড়াও পর্যটকদের বরণ করে নিতে প্রস্তুত বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, সিলেট, পটুয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলার পর্যটনসংশ্লিষ্টরা।

উচ্চ ও উচ্চ মধ্যবিত্তরা বরাবরের মতোই দীর্ঘ ছুটি কাটাতে বিদেশে ছুটছে। তবে গত বছরের মতো এবারো স্বল্প খরচে মধ্যবিত্তদের ছুটি কাটানোর সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থান ভারতের ভিসা প্রায় বন্ধ রয়েছে। নিকট দূরত্বের দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলংকা, নেপাল ও ভুটানেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশী ঘুরতে যাচ্ছেন বলে খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

পর্যটনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘ ছুটি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আবহাওয়া অনুকূল থাকায় এবার অভ্যন্তরীণ পর্যটন বেশ ভালো জমবে। উচ্চমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা কক্সবাজার, সিলেট অঞ্চল, পার্বত্য অঞ্চলসহ দেশের পর্যটনসমৃদ্ধ জেলাগুলোয় ভিড় করবে। ঢাকার আশপাশে গড়ে ওঠা আবাসিক হোটেল ও রিসোর্টগুলোর বেশির ভাগ কক্ষও আগাম বুকিং হয়ে গেছে।

ছুটির দিনগুলোতে ১০ লাখের বেশি পর্যটককে বরণ করে নিতে প্রস্তুত রয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের জেলা কক্সবাজার। স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ীদের হিসাবে এখানে পর্যটকসেবার সঙ্গে যুক্ত নিবন্ধিত আবাসিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৫২০। এসব প্রতিষ্ঠানের মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার। তাছাড়া অনিবন্ধিত হোটেল-মোটেল ও সরকারি রেস্ট হাউজসহ আরো অন্তত ৩০ হাজার পর্যটকের রাতযাপনের সুযোগ রয়েছে। এসব হোটেল-মোটেলের বেশির ভাগ রুম আগাম বুক হয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এবার সমুদ্রবিলাসীরা পরিচ্ছন্ন সৈকত উপভোগ করতে পারবেন। গত ৯ মার্চ কক্সবাজারে আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাতদিনের আলটিমেটাম দিয়ে সমুদ্রসৈকত এলাকার স্থায়ী-অস্থায়ী সব দোকান ও ঝুপড়ি উচ্ছেদ করিয়েছেন। এতে সৈকতে সৌন্দর্য ফিরে এসেছে। সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টের বালুচরে এখন কোনো স্থাপনা নেই। সৈকতের অন্যান্য স্থানেও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

সমুদ্রসৈকত ছাড়াও পর্যটকরা হিমছড়ি, ইনানী, মেরিন ড্রাইভ, টেকনাফের জিরো পয়েন্ট, মহেশখালী, সোনাদিয়া, রামু, সাফারি পার্কসহ বিভিন্ন স্পটে ভ্রমণ করেন। হোটেল কক্স টুডের সহকারী জেনারেল ম্যানেজার আবু তালেব জানান, ‘এবারের ছুটিতে পর্যটকদের বরণ করে নিতে আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি। হোটেলের প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হয়েছে। ঈদের পরদিন থেকে এক সপ্তাহ আমাদের অগ্রিম বুকিং রয়েছে।’

ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজারের (টুয়াক) সাবেক সভাপতি রেজাউল করিম রেজা বলেন, ‘কক্সবাজারের পর্যটন সেক্টরের প্রতিদিন ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ থাকার সক্ষমতা রয়েছে। আশা করছি, এবারের টানা ১০ দিনের ছুটিতে প্রতিদিন লাখেরও বেশি মানুষ কক্সবাজার আসবেন।’

পর্যটকদের হয়রানিমুক্ত ভ্রমণ নিশ্চিত করতে প্রশাসনও প্রস্তুত রয়েছে বলে জানান কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান। তিনি বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে কক্সবাজারে আসা পর্যটকদের স্বাচ্ছন্দ্য ভ্রমণ ও নিরাপত্তার জন্য আমরা কাজ করছি। এরই মধ্যে হোটেল-মোটেল মালিক ও পর্যটনসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে এক দফা বৈঠক করা হয়েছে। ঈদের আগে আরো একটি বৈঠক করা হবে। পর্যটকদের কাছ থেকে যেন অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা না হয় সে বিষয়টিও দেখা হচ্ছে। হোটেল মালিকদের বলে দেয়া হয়েছে যেন পর্যটকদের কাছ থেকে ন্যায্য ভাড়া নেয়া হয়।’

পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম বৃহৎ পর্যটন কেন্দ্র বান্দরবান। খাগড়াছড়ি বা রাঙ্গামাটির চেয়ে এখানে পর্যটক সমাগম বেশি। বান্দরবান সদর ছাড়াও জেলার দুর্গম ছয় উপজেলা থানচি, রোয়াংছড়ি, আলীকদম, রুমা, লামা ও নাইক্ষ্যংছড়িতে সারা বছরই পর্যটকরা ঘুরতে যান। তবে ঈদের ছুটিকে কেন্দ্র করে বান্দরবানের পর্যটন খাত বেশ রমরমা।

বান্দরবান শহরে হোটেল-মোটেল আছে অন্তত ৮৫টি। উপজেলাভিত্তিক হোটেল-মোটেলকে হিসাবে নিলে এ সংখ্যা দাঁড়ায় দেড় শতাধিকে। ঈদের ছুটিকে কেন্দ্র করে প্রায় সব কক্ষ আগাম বুকিং হয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বান্দরবানের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বেশ ভালো বলে জানান জেলা প্রশাসক শামীম আরা রিনি। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘পর্যটকদের নিরাপত্তা ও স্বস্তিকর ভ্রমণের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। জেলার সব হোটেল-মোটেলও আগাম বুকিং হয়ে গেছে। আইন-শৃঙ্খলা নিশ্চিতে জেলা প্রশাসন কাজ করছে। আশা করছি, বান্দরবান ভ্রমণকারীরা নিরাপদে সবুজ পাহাড় ও ঝরনার সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন।’

ঈদের টানা ছুটিকে কেন্দ্র করে মেঘ, জল, পাহাড়ের উপত্যকা রাঙ্গামাটি জেলাও পর্যটকদের স্বাগত জানাতে প্রস্তুত হচ্ছে। এরই মধ্যে জেলার বিভিন্ন হোটেল-মোটেল, কটেজ-রিসোর্টগুলোর আগাম বুকিং সম্পন্ন হয়েছে। পর্যটকদের সেবা দেয়ার জন্য সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্নের কথা বলছেন ব্যবসায়ীরা। আর নিরাপত্তাজনিত কোনো শঙ্কা দেখছে না আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও। রাঙ্গামাটি জেলা শহরের পর্যটন মোটেল ছাড়াও ৫৪টির বেশি হোটেল-মোটেল এবং ২০টির বেশি রিসোর্ট-কটেজ প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সবুজ চা বাগান, টিলা, ঝরনাসহ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত সিলেট অঞ্চল। জাফলং, বিছনাকান্দিসহ বহু পর্যটন এলাকায় সমৃদ্ধ এ অঞ্চল ঘিরে ভ্রমণপিপাসুদের টান থাকে বছরজুড়ে। তবে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের উন্নয়ন প্রকল্পকে ঘিরে সিলেটের রাস্তার অবস্থা বেশ খারাপ। ভাঙা রাস্তার পাশাপাশি ধুলাবালির কারণে কয়েক বছর ধরেই পর্যটকরা বিমুখ হচ্ছেন।

সিলেট অঞ্চলের পাঁচ তারকা মানের অবকাশ কেন্দ্রগুলোর একটি হবিগঞ্জের দ্য প্যালেস লাক্সারি রিসোর্ট। ছোট ছোট টিলার মধ্যে সবুজের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের রিসোর্টটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফুর রহমান জানান, ‘ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কাজ কয়েক বছর ধরে চলছে। রাস্তার অবস্থা ভালো না থাকায় সিলেটের পর্যটন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে আমাদের প্যালেস লাক্সারি রিসোর্টের বুকিং বেশ ভালো। ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ছুটির কারণে পুরো মার্চের বুকিং ৯০ শতাংশ শেষ হয়ে গেছে। আশা করছি, বাকি রুম ও ভিলাগুলোও বুকড হয়ে যাবে।’

একই সঙ্গে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত উপভোগ করার জন্য বিখ্যাত সমুদ্রসৈকত পটুয়াখালীর কুয়াকাটা। ঈদের ছুটিতে সাগরকন্যা খ্যাত এ পর্যটন এলাকাটিও সমুদ্রপ্রেমীদের বরণ করে নিতে প্রস্তুত রয়েছে। তবে অন্য পর্যটন এলাকার তুলনায় আগাম বুকিংয়ের ক্ষেত্রে কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে এলাকাটির হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টগুলো।

হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা যায়, সংগঠনটির ১০০ সদস্যের প্রায় আড়াইশ হোটেল রয়েছে, যেগুলোর ধারণক্ষমতা ২৫-৩০ হাজার অতিথি। এছাড়া আরো দুই শতাধিক হোটেল রয়েছে, যেগুলো এখনো সমিতির আওতায় আসেনি। সব মিলিয়ে শতভাগ বুকিং হলে ৫০-৬০ হাজার পর্যটকের আবাসনের ব্যবস্থা রয়েছে।

নিউ শিকদার প্যালেসের মার্কেটিং ম্যানেজার মোহাম্মদ আল মামুন বলেন, ‘প্রতি বছর ঈদের মৌসুমে হোটেলগুলোর ৮০-৯০ শতাংশ আগাম বুকিং থাকে। এ বছর সব হোটেলে বুকিং খুবই কম। আমাদের হোটেলেরও অর্ধেকের বেশি রুম এখনো বুকিং হয়নি। তবে আশা করছি, প্রত্যাশা অনুযায়ী পর্যটক কুয়াকাটা ভ্রমণে আসবেন।’

কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এমএম মোতালেব শরিফ বলেন, ‘রোজা শুরুর আগে জাতীয় নির্বাচন হয়েছে। এ কারণে চলতি বছরের শুরু থেকেই পর্যটক কম ছিল। এখন নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ভালো। আশা করছি, ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের উপস্থিতি অনেক ভালো হবে। পর্যটকরা হোটেল ভাড়া নিয়ে যাতে বিড়ম্বনায় না পড়েন, সেটি আমরা নিশ্চিত করেছি।’

(প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন বণিক বার্তার কক্সবাজার প্রতিনিধি সৈয়দ আলম ও পটুয়াখালী প্রতিনিধি মো. বাদল হোসেন)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *