
লারিজানির নিহতের খবর নিশ্চিত করলেন ইরানের জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ
মার্চ ১৮, ২০২৬
পাকিস্তানের বিমান হামলায় কাবুলে ৪ শতাধিক নিহতের দাবি তালেবান সরকারের
মার্চ ১৮, ২০২৬ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান আলী লারিজানি ও বাসিজ বাহিনীর প্রধান গোলামরেজা সোলেইমানিকে হত্যার দাবি করেছে ইসরায়েল। তবে গতকাল রাত পর্যন্ত এ দাবির বিষয়ে তেহরানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহু গতকাল এক টেলিভিশন ভাষণে বলেন, ইরানের জাতীয় নিরাপত্তাপ্রধান আলী লারিজানিকে হত্যার মূল উদ্দেশ্য দেশটির জনগণকে তাদের শাসকদের উৎখাত করার একটি সুযোগ করে দেয়া।
এছাড়া দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ দাবি করেন, আইডিএফের অভিযানে আলী লারিজানি নিহত হয়েছেন। একই অভিযানে নিহত হয়েছেন বাসিজ মিলিশিয়ার প্রধান গোলামরেজা সোলেইমানিও।
বাসিজ বাহিনী ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও জননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে আলী লারিজানির মৃত্যুর দাবি ঘিরে ধোঁয়াশা রয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় নিহত নৌসেনাদের স্মরণে লারিজানির হাতে লেখা একটি বার্তা প্রকাশ করা হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর লারিজানি ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোতে আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে দেশটির নিরাপত্তা ও কৌশলগত নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর মধ্যে বাস্তববাদী সমন্বয়ক হিসেবেও পরিচিত ছিলেন।
এদিকে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, মধ্যস্থতাকারী দুটি দেশ ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে উত্তেজনা কমানো বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পৌঁছে দেয়। তবে সদ্য দায়িত্ব পাওয়া সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে আগে ‘হাঁটু গেড়ে পরাজয় স্বীকার’ করতে হবে, তার পরই শান্তির প্রশ্ন উঠতে পারে। ওই কর্মকর্তা আরো দাবি করেন, নতুন সর্বোচ্চ নেতা দায়িত্ব নেয়ার পর প্রথম বৈদেশিক নীতি বৈঠকেই এ অবস্থান জানিয়েছেন। তবে তিনি বৈঠকে সরাসরি উপস্থিত ছিলেন নাকি দূরবর্তী মাধ্যমে অংশ নেন, সে বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ এখন তৃতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে। এ সংঘাতে এখন পর্যন্ত অন্তত ২ হাজার মানুষের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে যুদ্ধের অভিঘাত পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি প্রায় অচল হয়ে রয়েছে, যার মাধ্যমে বিশ্বে সরবরাহ হওয়া তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। গতকাল সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল স্থাপনায় ইরানের নতুন হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় ২ শতাংশ বেড়েছে।
গতকালও মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মধ্যে হামলা-পাল্টাহামলার ঘটনা ঘটেছে। ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, ইসরায়েলে পুলিশের সাইবার টেকনোলজি কেন্দ্র এবং রাফায়েল অস্ত্র কারখানায় ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। রাফায়েল ইসরায়েলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা শিল্পপ্রতিষ্ঠান, যেখানে আয়রন ডোমসহ উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি তৈরি হয়। ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ইরান থেকে দেশটির দিকে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে এবং সেগুলো প্রতিহত করতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় রয়েছে। এছাড়া ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড (আইআরজিসি) জানিয়েছে, ইসরায়েল ও মার্কিন ঘাঁটি থাকা বিভিন্ন দেশে নতুন দফার হামলা শুরু হয়েছে। এতে ড্রোনের পাশাপাশি সলিড ও লিকুইড ফুয়েলযুক্ত ওয়্যারহেড ব্যবহার করা হচ্ছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতেও হামলার প্রভাব দেখা গেছে। আবুধাবিতে একটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করার পর এর ধ্বংসাবশেষ পড়ে এক পাকিস্তানি নাগরিক নিহত হয়েছেন। একই সঙ্গে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে একটি জ্বালানি ট্যাংকে ড্রোন আঘাত হেনেছে বলে জানা গেছে। কাতারের দিকেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেষ্টা করা হয়, যা দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রতিহত করেছে। তবে ভূপাতিত ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে শিল্প এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
এদিকে ইসরায়েল ইরান ও লেবাননে ব্যাপক হামলা অব্যাহত রেখেছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তেহরানসহ ইরানের বিভিন্ন শহরে বড় ধরনের হামলা শুরু হয়েছে। ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র ১৮তম দিনে এ হামলাকে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তেহরানের গভর্নরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ দিনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় রাজধানীতে অন্তত ১২ হাজার ঘরবাড়ি আংশিক বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে। লেবাননেও ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত রয়েছে। দেশটির জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৯১২ জন নিহত এবং ২ হাজার ২২১ জন আহত হয়েছেন।
রাজধানী বৈরুতের বিমানবন্দরের কাছেও বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। বুর্জ আল-বারাজনেহ এলাকায় আনসার স্টেডিয়ামের পাশের পুরনো বিমানবন্দর সড়ক লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলেও উত্তেজনা ছড়িয়েছে। ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ খিয়াম শহরে ইসরায়েলি সেনাদের লক্ষ্য করে রকেট হামলা চালিয়েছে। এর আগে সীমান্তবর্তী মারুন আল-রাস এলাকাতেও একই ধরনের হামলার কথা জানানো হয়।
ইরাকের রাজধানী বাগদাদে মার্কিন সেনা ও ইরানপন্থী গোষ্ঠীর মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা হয়েছে। মার্কিন দূতাবাস লক্ষ্য করে ড্রোন ও রকেট হামলা চালানো হয়, যার কিছু অংশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভূপাতিত করলেও একটি ড্রোন দূতাবাস প্রাঙ্গণে আঘাত হানে। পাল্টা বিমান হামলায় একটি ইরানপন্থী গোষ্ঠীর ব্যবহৃত ভবনে অন্তত চারজন নিহত হয়েছেন।
এ সংঘাতের প্রভাব শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি সতর্ক করে বলেছে, যুদ্ধ জুন পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হলে আরো প্রায় সাড়ে চার কোটি মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে পড়তে পারে। খাদ্য, জ্বালানি ও শিপিং ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক ক্ষুধা পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইরান ও ইরান-সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর হামলা চালানোর সক্ষমতা ধ্বংস করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার জন্য বিভিন্ন দেশের সরকারকে রাজি করাতে বিশ্বজুড়ে মার্কিন কূটনীতিকদের নির্দেশনা দিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদেশগুলোয় ইরান ও দেশটির সমর্থক গোষ্ঠীগুলোর হামলার ঝুঁকি বৃদ্ধির মধ্যে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এ উদ্যোগ নেয়ার বিষয়টি সামনে এনেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজ। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের তারবার্তার ভিত্তিতে গতকাল এ খবর দিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি। সোমবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এ নির্দেশনা যুক্তরাষ্ট্রের সব কূটনৈতিক ও কনস্যুলার দপ্তরে পাঠানো হয়। ‘আইআরজিসির তৎপরতা নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ’ শীর্ষক এ নির্দেশনায় ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে (আইআরজিসি) ইঙ্গিত করা হয়েছে। এ তারবার্তাকে ‘স্পর্শকাতর তবে অতি গোপনীয় নয়’ উল্লেখ করা হয়েছে। মার্কিন কূটনীতিকদের এ বার্তা ২০ মার্চের মধ্যে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ‘উপযুক্ত সর্বোচ্চ পর্যায়ে’ পৌঁছে দিতে বলা হয়েছে।


