
পাকিস্তানকে হারিয়ে ওয়ানডে সিরিজ জয় বাংলাদেশের
মার্চ ১৬, ২০২৬
আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরল সংবিধানে, আগামী নির্বাচন থেকে কার্যকর
মার্চ ১৬, ২০২৬মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার কোনো ইঙ্গিত এখনো দেখা যাচ্ছে না।
বরং সাম্প্রতিক বক্তব্য ও সামরিক পদক্ষেপে স্পষ্ট হচ্ছে, কোনো পক্ষই যুদ্ধ থামাতে আগ্রহী নয়; উল্টো সংঘাত আরো বিস্তৃত হচ্ছে। ফলে এটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করার জন্য কোনো সমঝোতা চুক্তি খোঁজার প্রস্তুতি যুক্তরাষ্ট্রের নেই। এমনকি তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন, প্রয়োজন হলে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো খার্গ দ্বীপে আরো হামলা চালানো হতে পারে। অন্যদিকে ইরানও পাল্টা কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সাফ জানিয়েছেন, চলমান সংঘাতের মধ্যে তেহরান কোনো যুদ্ধবিরতি চায়নি। দেশটির ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) সরাসরি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহুকে নিশানা করার হুমকি দিয়েছে। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে ইরান ও তাদের সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর হামলার ঘটনাও বাড়ছে। ফলে পুরো অঞ্চলে হামলা ও পাল্টা হামলার এক বিপজ্জনক চক্র তৈরি হয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা যত ম্লান হচ্ছে, ততই সংঘাতটি আঞ্চলিক যুদ্ধের সীমা ছাড়িয়ে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক মোকাবেলায় রূপ নিতে পারে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজকে গতকাল দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘তেহরান আলোচনার টেবিলে বসতে আগ্রহী। তবে ওয়াশিংটন আরো ভালো শর্তের জন্য লড়াই চালিয়ে যাবে।’ এমনকি তিনি ইরানের তেলের হাব ‘খার্গ দ্বীপে’ পুনরায় বোমাবর্ষণের ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, ‘এটি স্রেফ ‘‘মজা করার জন্য’’ হতে পারে।’
ট্রাম্প বলেন, ‘ইরান চুক্তি করতে চায়, কিন্তু আমি চাই না। কারণ শর্তগুলো এখনো যথেষ্ট ভালো নয়।’ তিনি আরো জানান, তেলের চালান পুনরায় শুরু করতে মার্কিন বাহিনী প্রণালির উত্তরে ইরানি উপকূলে হামলা জোরদার করবে।
ইরানও স্পষ্ট করে জানিয়েছে, চলমান সংঘাতের মধ্যে তারা কোনো যুদ্ধবিরতি চায় না এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার পথও খুঁজছে না। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, যতদিন প্রয়োজন ততদিন ইরান আত্মরক্ষার লড়াই চালিয়ে যাবে। সিবিএস নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আরাগচি বলেন, ‘আমরা কখনো যুদ্ধবিরতি চাইনি এবং আলোচনার আবেদনও করিনি। যতদিন প্রয়োজন আমরা নিজেদের রক্ষা করতে প্রস্তুত। এখন পর্যন্ত আমরা সেটাই করে আসছি এবং করে যাব, যতক্ষণ না প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বুঝতে পারেন যে এটি একটি অবৈধ যুদ্ধ, যার কোনো বিজয় নেই।’
তিনি অভিযোগ করেন, এ সংঘাতে মানুষ নিহত হচ্ছে মূলত ট্রাম্পের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে। আরাগচির ভাষায়, মানুষ মারা যাচ্ছে শুধু এই কারণে যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এ যুদ্ধকে এক ধরনের খেলা হিসেবে দেখছেন।
এরই মধ্যে হরমুজ প্রণালি সুরক্ষায় পাঁচ হাজারের বেশি মেরিন সেনা মধ্যপ্রাচ্যে পাঠাচ্ছেন ট্রাম্প। ৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট জাপানভিত্তিক উভচর যান ইউএসএস ট্রিপোলিতে করে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে যাচ্ছে। এতে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মেরিনের পাশাপাশি জাহাজ পরিচালনায় নিয়োজিত অতিরিক্ত নৌসদস্যও থাকছেন। স্থল অভিযানে সক্ষম এ ইউনিট এরই মধ্যে ওকিনাওয়া ত্যাগ করেছে এবং তাদের গন্তব্যে পৌঁছতে প্রায় দুই সপ্তাহ লাগবে। মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে তারা আগে থেকেই মোতায়েন থাকা মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হবে, যেখানে বর্তমানে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ও ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড অবস্থান করছে।
এদিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি এক লিখিত বিবৃতিতে হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার অঙ্গীকার করেছেন। তবে ট্রাম্প একে নাকচ করে দিয়ে মোজতবা খামেনির বেঁচে থাকা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘আমি জানি না সে আদৌ বেঁচে আছে কিনা। এখন পর্যন্ত কেউ তা প্রমাণ করতে পারেনি।’
অন্যদিকে, এর আগে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহুকে ‘অপরাধী’ আখ্যা দিয়ে তাকে হত্যার শপথ নেয়। উত্তেজনার মুখে যুক্তরাষ্ট্র তার নাগরিকদের ইরাক ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে, যেখানে ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলো মার্কিন দূতাবাস ও ঘাঁটিতে হামলা চালাচ্ছে।
গতকাল আইআরজিসির নিজস্ব ওয়েবসাইট ‘সেপাহ নিউজ’-এ প্রকাশিত এক বিবৃতিতে নেতানিয়াহু সম্পর্কে বলা হয়, আমরা পূর্ণ শক্তি দিয়ে তাকে ধাওয়া করব।
এদিকে গতকালও ইসরায়েলের বিভিন্ন শহর লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েলে অন্তত দুজন আহত হয়েছেন। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ক্লাস্টার বোমা ওয়ারহেডযুক্ত একটি ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে এ হামলা চালানো হয়। ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রতিহত করলেও এলাত শহরসহ কয়েকটি এলাকায় গুচ্ছ বোমা ছড়িয়ে পড়ে। গতকাল ইসরায়েলের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় সংঘাতের জেরে আহত ১০৮ জনকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরু হওয়ার পর এ পর্যন্ত মোট ৩ হাজার ১৯৫ জন ইসরায়েলিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
গতকাল ইরান দাবি করেছে, তারা ইসরায়েলের ‘লাহাভ ৪৩৩’ বিশেষ পুলিশ ইউনিটের সদর দপ্তর এবং গিলাত প্রতিরক্ষা স্যাটেলাইট যোগাযোগ কেন্দ্র লক্ষ্য করে শক্তিশালী ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তবে হামলার সুনির্দিষ্ট ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরানের অভ্যন্তর থেকে ছোড়া একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র তাদের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে আসতে দেখা গেছে। তেল আবিবের কয়েকটি স্থানে গোলাবারুদ বা ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার ঘটনা তদন্ত করছে পুলিশ। তবে এসব ঘটনায় তাৎক্ষণিক কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।
এছাড়া ইরাকের ইরবিলে অবস্থিত হারির মার্কিন বিমানঘাঁটি এবং কুয়েতে আলি আল সালেম ও আরিফজান মার্কিন ঘাঁটিতে শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবিও করেছে আইআরজিসি। তাদের দাবি অনুযায়ী এসব ঘাঁটি গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকিয়ে দেয়ার তথ্য জানিয়েছে। বাহরাইনের রাজধানী মানামায় বড় ধরনের বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। দেশটি বলছে, সংঘাত শুরুর পর থেকে তারা ১২৫টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ২০৩টি ড্রোন প্রতিহত করেছে। এসব হামলায় বাহরাইনে দুজন এবং উপসাগরীয় অন্যান্য দেশে অন্তত ২৪ জন নিহত হয়েছে। গতকাল সৌদি আরব জানিয়েছে, তারা নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করেছে।
এছাড়া গতকাল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের মধ্যাঞ্চলীয় ইসফাহান প্রদেশের কয়েকটি স্থানে যৌথভাবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এসব হামলায় অন্তত ১৫ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এখন পর্যন্ত ইরানে নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ৩০০ পেরিয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। পেন্টাগন জানিয়েছে, তারা ইরানে ১৫ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে।


