
খার্গ দ্বীপে মার্কিন হামলা, তেল স্থাপনায় আঘাতের হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের
মার্চ ১৪, ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ধাক্কায় ঝুঁকিতে বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতি
মার্চ ১৪, ২০২৬ইরানকে লক্ষ্য করে সামরিক অভিযান আরো জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
গতকাল পেন্টাগনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, ‘ইরানের বিরুদ্ধে চলমান অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং আজকের দিনটি হতে পারে ইরানের আকাশসীমা ও তেহরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চালানো এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চসংখ্যক হামলার দিন।’
এ সময় হেগসেথ দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র এমনভাবে ইরানের সামরিক বাহিনীকে ধ্বংস করছে, যা বিশ্ব আগে কখনো দেখেনি। তার ভাষায়, আমেরিকা ইরানের উগ্রপন্থী শাসকগোষ্ঠীর সামরিক সক্ষমতাকে পদ্ধতিগতভাবে ধ্বংস করছে আর এ চাপ অব্যাহত থাকবে। খবর রয়টার্স ও আল জাজিরা।
সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন সামরিক বাহিনীর জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনও যুদ্ধের সর্বশেষ পরিস্থিতি তুলে ধরেন। তিনি জানান, এখন পর্যন্ত ইরানের ভেতরে ছয় হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। এছাড়া ইরানের নৌবাহিনীকে কার্যত অকার্যকর করে দেয়া হয়েছে।
কেইন আরো বলেন, ইরানের সমুদ্রপথে মাইন স্থাপনের সক্ষমতাকে লক্ষ্য করে হামলা অব্যাহত রেখেছে মার্কিন বাহিনী। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ক্ষতি করার মতো কিছু সামরিক সক্ষমতা এখনো ইরানের রয়েছে।
এদিকে তুরস্কের মালিকানাধীন একটি জাহাজ ইরানের অনুমতি সাপেক্ষে নিরাপদে হরমুজ প্রণালি পার হতে সক্ষম হয়েছে। তুরস্কের পরিবহনমন্ত্রী আবদুলকাদির উরালোগলু সাংবাদিকদের এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালিতে তুরস্কের মালিকানাধীন ১৫টি জাহাজ আটকা পড়েছিল। এর মধ্যে একটি জাহাজ এর আগে ইরানের একটি বন্দর ব্যবহার করেছিল। আমরা ওই নির্দিষ্ট জাহাজটির জন্যই ইরানি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমতি জোগাড় করতে পেরেছি এবং সেটি সফলভাবে প্রণালিটি পার হয়েছে।’
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইরানকে উদ্দেশ করে নতুন হুমকি দিয়েছেন। ফক্স নিউজ রেডিওকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আগামী সপ্তাহের মধ্যেই ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর আঘাত হানা হবে।’
ট্রাম্প বলেন, ‘প্রয়োজনে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বিভিন্ন দেশের জাহাজকে সুরক্ষা দেবে যুক্তরাষ্ট্র।’ একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধ পরিকল্পনা অনুযায়ী ভালোভাবেই এগিয়ে যাবে।
একই সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলার পর শেষ পর্যন্ত ইরানের সরকার পতন ঘটতে পারে। তবে তিনি বলেন, এটি তাৎক্ষণিকভাবে ঘটবে না। ট্রাম্প বলেন, ‘অস্ত্রবিহীন সাধারণ মানুষের জন্য সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরু করা বড় বাধা হলেও শেষ পর্যন্ত ইরানের জনগণই তাদের সরকারকে বদলে দেবে।’
এছাড়া নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প ইরানের নেতৃত্বের বিরুদ্ধেও তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন। তিনি লিখেছেন, ‘আজ এ উন্মাদ জঘন্য লোকদের কী হয়, তা দেখে নিও।’
তিনি আরো দাবি করেন, ইরানের নৌবাহিনী শেষ হয়ে গেছে, তাদের বিমান বাহিনী আর নেই। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনসহ সামরিক সক্ষমতার বড় অংশ ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে। ট্রাম্প আরো বলেন, ‘তারা ৪৭ বছর ধরে সারা বিশ্বে নিরীহ মানুষ হত্যা করে এসেছে, আর এখন আমি যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাদের হত্যা করছি। এটি করতে পারা কত বড় সম্মানের বিষয়।’
যদিও এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরানে বড় ধরনের বিক্ষোভ বা শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য বিদ্রোহের কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। তবে সরকারবিরোধী নতুন কোনো বিক্ষোভ দমনে গত জানুয়ারির চেয়েও ‘আরো কঠোর ব্যবস্থা’ নেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানের ইসলামী রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি)।
গতকাল ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এ হামলায় এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৪৪৪ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১৮ হাজার ৫৫১ জন।
এদিকে ইরান ‘কাপুরুষোচিত হামলার সামনে কখনো মাথা নত করবে না’ বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। আন্তর্জাতিক কুদস দিবস উপলক্ষে দেয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, ইরানের জনগণ নিজেদের অবস্থানে অটল থাকবে।
চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে একাধিক সামরিক ও নিরাপত্তা ঘটনা ঘটেছে। পশ্চিম ইরাকে একটি মার্কিন সামরিক বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ছয়জন ক্রু নিহত হয়েছেন। একই সময়ে হরমুজ প্রণালির কাছে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার খবরও পাওয়া গেছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, পশ্চিম ইরাকে বিধ্বস্ত হওয়া কেসি-১৩৫ রিফুয়েলিং বিমানে থাকা ছয়জন ক্রুর সবাই নিহত হয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে সেন্টকম জানায়, দুর্ঘটনার কারণ এখনো তদন্তাধীন। প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, বিমানটি কোনো শত্রুপক্ষ বা মিত্রপক্ষের গুলিতে বিধ্বস্ত হয়নি।
এদিকে, শুক্রবারেও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে হামলা চালিয়েছে ইরান। সৌদি আরব জানিয়েছে, সকাল থেকে তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা অন্তত ৫৬টি ড্রোন প্রতিহত করেছে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। প্রতিহত করা ড্রোনগুলোর একটি রাজধানী রিয়াদের কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত কূটনৈতিক এলাকায় প্রবেশের চেষ্টা করেছিল।
ওমানেও ড্রোন বিধ্বস্তের ঘটনায় দুই বিদেশী নাগরিক নিহত হয়েছেন। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ওমান নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, সোহারের আল-আওয়াহি শিল্প এলাকায় একটি ড্রোন বিধ্বস্ত হলে ওই দুই ব্যক্তি নিহত হন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই শহরে শুক্রবার সকালে বিকট শব্দে বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, ইরানের পাশাপাশি লেবাননেও হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল। লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর সাইদনে একটি আবাসিক ভবনে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত আটজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরো নয়জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। হামলার সত্যতা নিশ্চিত করে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ঘোষণা করেছে, সাম্প্রতিক সময়ে তারা ইরানে প্রায় ৭ হাজার ৬০০টি আর লেবাননে ১ হাজার ১০০টি বিমান হামলা চালিয়েছে।
এদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত লেবাননের জনগণের সঙ্গে সংহতি জানাতে গতকাল দেশটির রাজধানী বৈরুতে গেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া সংঘাতে লেবাননে ৬৮৭ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু ও আট লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। গুতেরেসের এ সফরে দেশটিতে ক্রমবর্ধমান মানবিক প্রয়োজনের বিষয়টি তুলে ধরার কথা রয়েছে।
জাতিসংঘ মহাসচিব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘লেবাননের জনগণের সঙ্গে সংহতি জানাতে আমি বৈরুতে এসে পৌঁছেছি। তারা এ যুদ্ধ বেছে নেয়নি। বরং তাদের এতে টেনে আনা হয়েছে। লেবানন এবং এ অঞ্চলের যে শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ প্রাপ্য, তা নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ এবং আমি সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাব।’
জাতিসংঘ জানিয়েছে, তার এ সফরের সময় জরুরি তহবিল সংগ্রহের জন্য একটি বিশেষ আহ্বান জানানো হবে।


