ইরানে স্কুলে হামলা: পেন্টাগনের তদন্তে মার্কিন বাহিনীর সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত
মার্চ ৭, ২০২৬
দেশে জ্বালানি তেলের সংকট নেই, উদ্বিগ্ন হবেন না: জ্বালানি মন্ত্রী
মার্চ ৭, ২০২৬
ইরানে স্কুলে হামলা: পেন্টাগনের তদন্তে মার্কিন বাহিনীর সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত
মার্চ ৭, ২০২৬
দেশে জ্বালানি তেলের সংকট নেই, উদ্বিগ্ন হবেন না: জ্বালানি মন্ত্রী
মার্চ ৭, ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে হামলা-পাল্টাহামলা অব্যাহত, ইরানে নিহত ১৩০০ ছাড়িয়েছে

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের লেলিহান শিখা আরো ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। গতকাল সংঘাতের সপ্তম দিনে ইরান ও লেবাননজুড়ে একের পর এক বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র।

একই সঙ্গে তেহরানের সামরিক সক্ষমতা ও শাসন ব্যবস্থা পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দিতে ‘নাটকীয়’ ও ‘নজিরবিহীন’ হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছে দেশ দুটি। ইরানের রাজধানী তেহরান, ইসফাহান ও কোম শহরে গতকাল নতুন করে হামলার ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে লেবাননেও ব্যাপক বিমান হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েলের প্রধান বিমানবন্দর বেন গুরিয়ন, তেল আবিব ও হাইফা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। এছাড়া কুয়েতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও উপকূলে একটি মার্কিন তেলবাহী ট্যাংকার লক্ষ্য করে হামলার কথাও জানিয়েছে তেহরান। এদিকে ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার থেকে দেশটিতে চালানো হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৩২০ জন নিহত হয়েছেন। দুই হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। একই সময় লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় ২১৭ জন নিহত ও ৭৯৮ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে আরো বোমারু বিমান মোতায়েন করা হচ্ছে এবং মার্কিন সামরিক শক্তি নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেতে চলেছে। একই সুরে ইসরায়েলি বাহিনীর (আইডিএফ) চিফ অব স্টাফ ইয়াল জামির বলেছেন, ইসরায়েল এখন অভিযানের নতুন ধাপে প্রবেশ করছে, যার লক্ষ্য ইরানি শাসন ব্যবস্থা ও তাদের সামরিক কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে ফেলা। তিনি সতর্ক করে বলেন, সামনে আরো বড় চমক অপেক্ষা করছে, যা এখন প্রকাশ করতে চাই না।

গতকাল ইরানের রাজধানী তেহরান ও গুরুত্বপূর্ণ শিল্পনগরী ইসফাহানে নতুন করে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। শুক্রবার এ হামলার কথা জানায় ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক বার্তায় তারা দাবি করে, ইরানের শাসকগোষ্ঠীর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে বড় ধরনের হামলা চালানো হয়েছে। এছাড়া ইরানের কোম শহরের অন্তত তিনটি স্থানে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। হামলার আগে কোমের একটি শিল্প এলাকা থেকে বেসামরিক নাগরিকদের সরে যাওয়ার সতর্কতা দেয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছে ইরানি গণমাধ্যম নূর নিউজ।

এছাড়া ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, তেহরানের একটি ভূগর্ভস্থ বাংকারে তাদের ৫০টি যুদ্ধবিমান হামলা চালিয়েছে। তাদের দাবি, এ স্থাপনাটি ইরানের সর্বোচ্চ নেতার ব্যবহারের জন্য নির্মিত ছিল এবং বর্তমানে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এটি ব্যবহার করতেন। এছাড়া লেবাননেও হামলা অব্যাহত রেখে ইসরায়েল। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার থেকে দেশটিতে চালানো ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ২১৭ জন নিহত এবং ৭৯৮ জন আহত হয়েছেন। হামলা প্রধানত দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় চালানো হয়েছে বলে জানা গেছে। গতকাল লেবানন সীমান্তে অ্যান্টি-ট্যাংক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েলের আটজন সেনা আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে পাঁচজনের অবস্থা গুরুতর। আহতরা সবাই গিভাতি ব্রিগেডের সদস্য বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী।

যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে ইরানে যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবারের মতো দেশটির ওপর বি-২ স্টিলথ বোমারু বিমান ব্যবহার করা হয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ইরানের ভূগর্ভস্থ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার লক্ষ্য করে ডজনখানেক দুই হাজার পাউন্ডের ‘পেনিট্রেটর’ বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছে।

এদিকে ইসরায়েলে পাল্টা হামলা অব্যাহত রেখেছে ইরান। তেহরান জানিয়েছে, নতুন প্রজন্মের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ইসরায়েলের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বেন গুরিয়নে হামলা চালানো হয়েছে। একই সঙ্গে হাইফা ও তেল আবিব শহরেও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে বলে দাবি করেছে ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। যদিও এ বিষয়ে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। ইরানের সশস্ত্র বাহিনী দাবি করেছে, কুয়েত উপকূলে একটি মার্কিন তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালানো হয়েছে এবং এতে আগুন ধরে গেছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় রেডিও জানিয়েছে, হামলার পর জাহাজটি জ্বলতে দেখা গেছে। কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে একাধিক বিধ্বংসী ড্রোন হামলা চালানোর দাবিও করেছে তেহরান। দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের বরাতে বলা হয়েছে, আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আরো হামলা চালানো হতে পারে। এছাড়া কুয়েতের আল জাহরা এলাকায় অবস্থিত আলী আল সালেম বিমানঘাঁটির দিক থেকে বিস্ফোরণের পর ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, হামলার পর ওই এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। ইরাকের বসরা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে একটি ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে আল জাজিরা। কে বা কারা হামলা চালিয়েছে তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ইরানি রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানে মোট ১ হাজার ৩২০ জন নিহত হয়েছেন। আহত দুই হাজারের বেশি। ৩ হাজার ৬৪৩টি বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৩ হাজার ৯০টি বাড়িঘর, ৫২৮টি বাণিজ্যিক কেন্দ্র, ১৪টি চিকিৎসা কেন্দ্র এবং রেড ক্রিসেন্টের নয়টি স্থাপনা। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, গত শনিবার থেকে চালানো হামলায় অন্তত ১ হাজার ৩২০ জন নিহত হয়েছেন। আহত দুই হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাদের মধ্যে ৬২৫ জনের বেশি মানুষের অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। ইউনিসেফ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ২০০ শিশু নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ১৮১ জন ইরানে, সাতজন লেবাননে, তিনজন ইসরায়েলে এবং একজন কুয়েতে নিহত হয়েছে।

যুদ্ধ বন্ধে কিছু দেশ মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে প্রেসিডেন্ট লিখেছেন, কিছু দেশ মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা শুরু করেছে। পরিষ্কার করে বলি, আমরা অঞ্চলে স্থায়ী শান্তির প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ। তবে আমাদের জাতির মর্যাদা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কোনো দ্বিধা নেই। তিনি আরো লেখেন, মধ্যস্থতা তাদের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত, যারা ইরানি জনগণকে অবমূল্যায়ন করেছে এবং এ সংঘাতকে উসকে দিয়েছে।

যদিও গতকাল নিজের ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টে ট্রাম্প জানিয়েছেন, আত্মসমর্পণ না করা পর্যন্ত ইরানের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা নয়। ট্রাম্প ইরানের জন্য ‘গ্রহণযোগ্য’ নতুন নেতৃত্বের আহ্বান জানিয়ে বলেন, এরপরই কেবল যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা ইরানের পুনর্গঠনে সহায়তা করার জন্য কাজ করবে। ট্রাম্প একই সঙ্গে ইরানের সামরিক বাহিনী, পুলিশ ও বিশেষ বাহিনী আইআরজিসি সদস্যদের অস্ত্র ছেড়ে দেয়ার আহ্বান জানান। তিনি লেখেন, তারা আত্মসমর্পণ করলে ‘পূর্ণ নিরাপত্তা বা দায়মুক্তি’ দেয়া হতে পারে; অন্যথায় তাদের জন্য ‘নিশ্চিত মৃত্যু’ অপেক্ষা করছে। তিনি আরো লেখেন, ইরানের ভবিষ্যৎ হবে উজ্জ্বল। ইরানকে আবারো মহান করে তুলুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *