ইরানি হামলায় কাতারের এলএনজি উৎপাদন বন্ধ
মার্চ ২, ২০২৬
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপসহ ৭ হুইপ নিয়োগ
মার্চ ২, ২০২৬
ইরানি হামলায় কাতারের এলএনজি উৎপাদন বন্ধ
মার্চ ২, ২০২৬
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপসহ ৭ হুইপ নিয়োগ
মার্চ ২, ২০২৬

ভূরাজনীতি খামেনির মৃত্যু ও ইরানে এক যুগের অবসান

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তিনি সারা জীবন ধরে এমন এক বিপ্লবকে ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন, যা ক্রমেই ইতিহাসের অচল জিনিসের স্তূপে গিয়ে পড়ছিল।

জর্জ অরওয়েল তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘নাইনটিন এইটি ফোর’-এ লিখেছিলেন—অলিগার্কিক শাসনের সারকথা হলো মৃতদের চাপিয়ে দেয়া এক বিশ্বদৃষ্টি, যা জীবিতদের জীবনযাপনকে নিয়ন্ত্রণ করে। বিগত প্রায় চার দশক ধরে ইরানে খামেনি ঠিক সেই কাজটাই করেছেন।

ইসলামী প্রজাতন্ত্র তিনি নিজে নির্মাণ করেননি, এটি তিনি উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছিলেন। অর্থাৎ এ প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির উত্তরসূরি হিসেবে তিনি দায়িত্ব নিয়েছিলেন। সে ইতিহাস একবার দেখে নেয়া যাক। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে তখন রাজতন্ত্রকে উৎখাত করা হয়। এ রাজতন্ত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রঘনিষ্ঠ ছিল। রাজতন্ত্র উৎখাত করার মাধ্যমে ইরানে ইসলামপন্থী ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এ ইসলামপন্থী প্রজাতন্ত্রের তিনটি আদর্শিক স্তম্ভ ছিল। এ তিনটি স্তম্ভ হলো— ‘আমেরিকার মৃত্যু’, ‘ইসরায়েলের মৃত্যু’ এবং ‘নারীর বাধ্যতামূলক হিজাব।’ নারীর বাধ্যতামূলক হিজাব পরাকে খোমেনি বলেছিলেন ‘বিপ্লবের পতাকা’।

এরপর ১৯৮৯ সালে খোমেনির মৃত্যুর পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেন খামেনি। দায়িত্ব নেয়ার পর খামেনির মূল কাজ হয়ে দাঁড়ায়, সমাজ এগিয়ে গেলেও বিপ্লবকে অতীতে আটকে রাখা। আর এ কাজে তিনি নির্মমভাবে সফল ছিলেন। কিন্তু যে বিশ্বদৃষ্টি তিনি চাপিয়ে দিয়েছিলেন, তা প্রকৃতপক্ষে তার নিজের ছিল না। বলা যেতে পারে, তিনি আসলে ছিলেন এক ভূতের মুখপাত্র। অতীতের ভূতের মুখপাত্র।

যে রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার আহ্বান তিনি সারা জীবন জানিয়ে গেছেন, সে শক্তির হাতেই তার মৃত্যু—এ ঘটনা ৪৭ বছরের বিপ্লবের ইতিহাসে এক মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। তিনি ছিলেন ইরানের ইসলামপন্থী শাসন কাঠামোর প্রথম প্রজন্মের শেষ শাসক। এখানে একটি বিষয় বলে নেয়া উচিত। খামেনির উত্থান আসলে নিয়তির নয়। বরং এটি ইরানের শাসনকাঠামোর কৌশলের ফল। ১৯৮৯ সালে পার্লামেন্টের স্পিকার আলি আকবর হাশেমি রাফসানজানি এক দাবি তোলেন। তিনি বলেন, খোমেনির মৃত্যুর আগে শেষ ইচ্ছা ছিল খামেনিকে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা করা। ওই সময় আলি আকবর সম্ভবত ভেবেছিলেন, খামেনিকে ক্ষমতায় বসানোর মাধ্যমে ইরানে একটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য প্রতীকী নেতা প্রতিষ্ঠা করা যাবে। কিন্তু মাশহাদের দরিদ্র এক আলেমের ছেলে খামেনির পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন। তিনি চলেছেন ভিন্নপথে।

এরপর এ দুজনের মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তিন দশক ধরে চলে। রাফসানজানি চেয়েছিলেন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন। অন্যদিকে খামেনির বিশ্বাস, বিপ্লবের নীতিতে আপস মানেই সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো ভয়াবহ পতন। এমন অবস্থা দেখলে মেকিয়াভেলির সতর্কবাণী যেন সত্যি হয়ে ওঠে। মেকিয়াভেলি বলেছিলেন, রাষ্ট্রকাঠামোতে অন্যকে ক্ষমতাবান করার জন্য যিনি কাজ করেন, তিনি নিজেই শেষ পর্যন্ত ধ্বংস হন।

ধর্মীয় বৈধতার ঘাটতি ও ব্যক্তিগত অনিরাপত্তা সবসময়ই খামেনির জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ ছিল। এজন্য দেশটিতে ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে তিনি নিজের প্রেটোরিয়ান শক্তি হিসেবে গড়ে তোলেন বা এ বাহিনীর সদস্যদের তা হয়ে উঠতে বাধ্য করেন। এ বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের তিনি নিজেই নির্বাচন করতেন। এমনভাবে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দায়িত্ব দিতেন যাতে কেউ শক্তিশালী হয়ে উঠতে না পারে। এরপর ধীরে ধীরে এ বাহিনীই রাষ্ট্রের সবচেয়ে ক্ষমতাবান প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। আর এ বাহিনীর ক্ষমতায়নের কিছু সুবিধা পেয়েছেন খামেনি। রাজনৈতিকভাবে খামেনির জন্য এ বাহিনী ছিল সুবিধাজনক। অন্যদিকে এ বাহিনীর গার্ডরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতেন। ইরানে নির্বাচনী প্রতিষ্ঠানগুলোকে তিনি নানাভাবে ব্যবহার করতেন। সেটি করতেন কেবল ক্ষমতার বৈধতা অর্জনের নাটক মঞ্চস্থ করার জন্য। রাফসানজানির বাস্তববাদ, খাতামির উদার আকাঙ্ক্ষা, আহমাদিনেজাদের জনতুষ্টিবাদ, রুহানির পারমাণবিক কূটনীতি—যে প্রেসিডেন্টই আসুক সবাইকে তিনি ঠিকই ক্ষমতাহীন করে রেখেছেন।

একজন ইরানি অধ্যাপক একসময় বলেছিলেন বিপ্লবের শুরুতে শাসকগোষ্ঠীর ৮০ শতাংশ ছিল আদর্শে বিশ্বাসী। আর বাকি ২০ শতাংশ ছিল সুবিধাবাদী। কিন্তু আমরা দেখছি খামেনির শেষ সময়ে এ অনুপাত একেবারে উল্টে গেছে। বলা যায়, ইরানের রাজনীতিতে ২০ শতাংশ এ বিপ্লবের আদর্শে বিশ্বাসী। আর বাকি ৮০ শতাংশই আসলে সুযোগসন্ধানী।

খামেনির আমেরিকাবিরোধিতা শুধু মতাদর্শ নয়, আত্মরক্ষার কৌশলও ছিল। প্রো-আমেরিকান শক্তি ক্ষমতায় এলে সবকিছু শেষ হয়ে যাবে এ ভয় শাসকগোষ্ঠীর গভীরে ছিল। এ বিষয়ে খামেনি একবার বলেছিলেন ইরান ও আমেরিকার মধ্যে সমঝোতা সম্ভব হলেও ইসলামী প্রজাতন্ত্র ও আমেরিকার মধ্যে তা কোনোদিন সম্ভব নয়। এরিক হোফার এক্ষেত্রে একটি দারুণ উক্তি লিখেছিলেন। তার মতে ঘৃণাই গণ-আন্দোলনের সবচেয়ে সহজ ঐক্যের শক্তি; ঈশ্বর ছাড়াও আন্দোলন টিকে থাকতে পারে, কিন্তু শয়তান ছাড়া নয়। খামেনির জন্য সেই শয়তান ছিল আমেরিকা।

খামেনি কিন্তু জানতেন ইরানে তার ক্ষমতা টিকে থাকবে নিয়ন্ত্রিত বিচ্ছিন্নতার মধ্যে। কারণ ইরানকে তেল বিক্রি করতে হবে। এ তেলই তাদের আয়ের প্রধান উৎস। শাহের কারাগারে বসে তিনি যে সাইয়্যিদ কুতুবের লেখা অনুবাদ করেছিলেন, জীবনের শেষ পর্যন্ত সেই একই বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্গে অবস্থান করেছেন। তার বিশ্বাস ছিল পশ্চিমা সংস্কৃতি পশ্চিমা বোমার চেয়েও বড় হুমকি।

আর তার এ বিচ্ছিন্নতার মূল্য দিতে হয়েছে ইরানের সাধারণ মানুষকে। রাষ্ট্র-নাগরিক সম্পর্ককে তিনি সামাজিক চুক্তি হিসেবে বিবেচনা করতেন না। এ সম্পর্ককে দেখতেন ইজারা হিসেবে। রাজনৈতিক স্বার্থ আদায়ের জন্য তিনি মানুষের ব্যক্তিগত জীবন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করেছেন। কে কাকে ভালোবাসবে, কী পান করবে, নারী কী পরবে সবকিছুতে হস্তক্ষেপ। একদিকে কৃচ্ছ্রসাধনের বয়ান, অন্যদিকে গার্ডদের করমুক্ত অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য। বৈশ্বিক প্লাটফর্ম বন্ধ রেখে শাসকগোষ্ঠীর নিজস্ব প্রচারণা চালানো। প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে ‘ঈশ্বরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ অভিযোগ, বিশ্বের সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ডের হার এবং শেষ পর্যন্ত গণবিক্ষোভ দমনে ভয়াবহ রাষ্ট্রীয় সহিংসতা।

প্রত্যেক বিপ্লবের অভিভাবকের মতো তাকেও এক বিরোধাভাসের মুখোমুখি হতে হয়েছে। যে বিপ্লব তিনি রক্ষা করছিলেন, সেটি এমন এক পৃথিবীর জন্য নির্মিত, যা আর নেই। জর্জ কেনান সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্কে লিখেছিলেন কোনো মেসিয়ানিক আন্দোলন অনির্দিষ্টকাল বাস্তবতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। খামেনি প্রায় চার দশক ধরে শক্তি, নির্মমতা ও অনমনীয়তার মাধ্যমে সেই সমন্বয় ঠেকিয়ে রেখেছিলেন।

শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যু ঘটেছে সেই আমেরিকা ও ইসরায়েলের আঘাতে, যাদের বিরুদ্ধে তার আজীবনের স্লোগান ছিল ‘আমেরিকার মৃত্যু’, ‘ইসরায়েলের মৃত্যু’। ইতিহাসের বিদ্রূপ যেন এখানেই সম্পূর্ণ হয়। যে স্লোগান নিয়ে তিনি বেঁচে ছিলেন, সেই শক্তির হাতেই তার মৃত্যু।

জাকির হোসেন, সম্পাদক, সিটিনিউজ সেভেন ডটকম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *