
নির্বাচনে ডিজিটাল অপপ্রচার: সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে
জানুয়ারি ২৯, ২০২৬
আন্তর্জাতিক কাস্টমস দিবসে বরিশালে সেমিনার
জানুয়ারি ২৯, ২০২৬আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তবে এর মাধ্যমে শেখ হাসিনার দীর্ঘ কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনামলে যে দুর্নীতি, প্রশাসনিক আস্থাহীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক ভাঙন তৈরি হয়েছে তার দ্রুত অবসান ঘটবে এমনটি বলা সম্ভব নয়।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তবে এর মাধ্যমে শেখ হাসিনার দীর্ঘ কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনামলে যে দুর্নীতি, প্রশাসনিক আস্থাহীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক ভাঙন তৈরি হয়েছে তার দ্রুত অবসান ঘটবে এমনটি বলা সম্ভব নয়। বরং ক্ষমতার পরিবর্তনের পরও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা, নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, অর্থনীতি স্থিতিশীল করা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনয়নে নতুন নেতৃত্বকে কঠিন পরীক্ষা দিতে হবে। একই সঙ্গে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মাঝখানে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার চ্যালেঞ্জও রয়েছে বাংলাদেশের সামনে।
ইতালিভিত্তিক আন্তর্জাতিক নীতিগবেষণা প্রতিষ্ঠান ইতালিয়ান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্যাল স্টাডিজের (আইএসপিআই) এক বিশ্লেষণে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ওই বিশ্লেষণে ইতালীয় গবেষক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক মিশেল দানেসি লিখেছেন, ফেব্রুয়ারির নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রপথ নির্ধারণের একটি সন্ধিক্ষণ। তার মতে, ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের নির্বাচনের ফল দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কী ধরনের পরিবর্তন আনবে তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। কারণ সরকারি প্রতিষ্ঠান ও আমলাতান্ত্রিক এলিটদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অনাস্থা এবং দুর্নীতির অভিযোগ থেকে বেরিয়ে আসা সহজ নয়। এ ক্ষত সারাতে সময় লাগবে। নতুন নেতৃত্বকে গণতান্ত্রিক জবাবদিহি শক্তিশালী করার পাশাপাশি সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিভাজন ও তিক্ততাকে পেছনে ফেলার পথও খুঁজে নিতে হবে।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের ভূ-কৌশলগত অবস্থান এবং অবকাঠামো ও বিনিয়োগের তীব্র চাহিদা দেশটিকে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রেই রাখবে। এ অবস্থানকে উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য কাজে লাগানো সম্ভব হলেও রাজনৈতিক নির্ভরশীলতার ঝুঁকি এড়িয়ে চলতে হবে। কারণ আওয়ামী লীগের শাসনকালীন অভিজ্ঞতার ক্ষত মানুষের স্মৃতিতে এখনো তাজা। সামনে বৈদেশিক সম্পর্কের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভারতের সঙ্গে দূরত্বকে স্থায়ী কাঠামোগত পরিবর্তন নয়, বরং গত বছরের গণ-অভ্যুত্থানের পরিণতির প্রেক্ষাপটগত প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা উচিত। আর চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার হওয়াকে বেশি করে ভারসাম্য তৈরির কৌশল হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়, যা দিল্লির সঙ্গে দরকষাকষিতে ঢাকার জন্য কার্যকর চাপ তৈরির মাধ্যমও হতে পারে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ড. ইউনূস যে পরিস্থিতিতে দেশের দায়িত্ব নিয়েছেন তা মোটেও সহজ ছিল না। শেখ হাসিনা পালানোর পর থেকেই দেশে নিরাপত্তা পরিস্থিতি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বহু স্থাপনা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সাবেক শাসক দলের সমর্থক আমলা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও অন্যান্য ব্যক্তির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক হামলা ছিল বিশেষভাবে সহিংস, কারণ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে এক হাজার চারশর বেশি বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর জন্য তাদের দায়ী করা হচ্ছিল। অক্টোবরে গঠিত পুলিশ সংস্কার কমিশন বাহিনীর প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনা ও সহিংসতা কমাতে খুব একটা অগ্রগতি দেখাতে পারেনি।
এছাড়া গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও চাপ বেড়েছে জানিয়ে আইএসপিআইয়ের বিশ্লেষণে বলা হয়, ২০২৫ সালে প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৬৯ শতাংশে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় দশমিক ৫ শতাংশ কম। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে প্রতিযোগিতা ক্রমেই বাড়তে থাকায় সরকার রফতানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনার কথা ভাবছে। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারকে সামলাতে হচ্ছে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে শেখ হাসিনার সরকারের নেয়া আইএমএফ ঋণের ব্যবস্থাপনাও। সে সময় উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে মোট প্রায় ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের ঋণ অনুমোদন করানো হয়েছিল। এ ঋণের মেয়াদ আরো ছয় মাস বাড়ানো হয়েছে। অতিরিক্ত ৮০০ মিলিয়ন ডলার যুক্ত হওয়ায় মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এর মধ্যে প্রায় ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার এরই মধ্যে ছাড় হয়েছে।
এ জটিল বাস্তবতায় ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান দায়িত্ব ছিল দেশকে নতুন একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচনের দিকে নিয়ে যাওয়া। তবে নির্বাচন ঘোষণায় দীর্ঘ সময় নেয়ায় তিনি তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন। পরে জুলাইয়ে তিনি একটি জাতীয় সনদ জারি করেন, যেখানে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ সনদের বিষয়ে ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনের দিনই গণভোট আয়োজনের কথা বলা হয়েছে। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরে গৃহীত এ সনদে গণতান্ত্রিক কাঠামো শক্তিশালী করার লক্ষ্যে ৮৪টি প্রস্তাব রাখা হয়েছে। নির্বাচনের প্রস্তুতি বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা ধীরগতির হলেও অগ্রগতির কথা বলছেন। ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের একটি মূল্যায়ন মিশন জানিয়েছে, নির্বাচন প্রস্তুতি প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে, তবে একই সঙ্গে আইনি, নিরাপত্তা ও প্রক্রিয়াগত অমীমাংসিত চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনে আঞ্চলিক অংশীদারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ধাক্কা খেয়েছে ভারত। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর নেতৃত্ব পরিবর্তনকে প্রথম দিকে গুরুত্ব না দেয়ায় দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক সাময়িকভাবে শীতল হয়ে পড়ে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার এক সপ্তাহ পর ২০২৪ সালের ১৬ আগস্ট প্রথমবার টেলিফোনে কথা বলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। ওই আলোচনার মূল উদ্দেশ্য ছিল সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে দিল্লির উদ্বেগ প্রশমিত করা। যদিও পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, এ বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত অনেক আশঙ্কাই অতিরঞ্জিত ছিল।
২০২৫ সালের মে নাগাদ দুই দেশের সম্পর্ককে বিশ্লেষকরা ‘পারস্পরিক সন্দেহ, কৌশলগত অবস্থান বদল এবং একধরনের দায় চাপানোর রাজনীতি’ হিসেবে বর্ণনা করেন। ভারতের তিনটি বড় ভুল বিশেষভাবে আলোচিত। এগুলো হলো শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেয়া; মোদি সরকারের অধীনে দীর্ঘদিন ধরে চলা হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রবণতা এবং জনগণের আন্দোলনের মাধ্যমে আসা রাজনৈতিক পরিবর্তনকে যথাযথভাবে স্বীকৃতি না দেয়া।
মিশেল দানেসি তার বিশ্লেষণে বলছেন, ইউনূস সরকারের পক্ষে ভারতকে পুরোপুরি দূরে সরিয়ে রাখা সম্ভব ছিল না, যেমন মোদির পক্ষেও ঢাকা থেকে বিচ্ছিন্নতা দীর্ঘস্থায়ী করা কঠিন। কারণ বাংলাদেশ উপমহাদেশের জন্য একটি সম্ভাব্য সংযোগকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। এছাড়া কৃষিপণ্য, ইস্পাত, জ্বালানি ও তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামালের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারতের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। আর এ পোশাক খাতই বাংলাদেশের প্রধান রফতানি আয়ের উৎস। বিশ্লেষণে আরো উঠে এসেছে, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর তৎপরতা বেড়েছে। বিষয়টি ভারতের জন্য যেমন উদ্বেগের, তেমনি ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আঞ্চলিক পরিসরে ইউনূস প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়তে তারা ইসলামপন্থী দলগুলোর সঙ্গে তার সরকার যোগাযোগ বাড়িয়েছে। হাসিনার পতনের পর কয়েকজন প্রভাবশালী ইসলামপন্থী নেতা মুক্তি পান এবং তাদের দাবিও আগের চেয়ে জোরালো হয়।
পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে চীন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠেছে জানিয়ে আইএসপিআইয়ের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ড. ইউনূস সরকার বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক আরো পুনরুজ্জীবিত করেছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের আওতায় বাংলাদেশ এরই মধ্যে চীনা ঋণের দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্রহীতা। যার বড় অংশ পরিবহন ও জ্বালানি অবকাঠামোতে ব্যয় হচ্ছে। টেক্সটাইল ও টেলিযোগাযোগের পাশাপাশি সৌরশক্তি ও ‘ব্লু ইকোনমি’ খাতেও চীনা বিনিয়োগ বাড়ছে। কভিড-পরবর্তী সময়ে ঢাকা ও বেইজিংয়ের সম্পর্কে যে স্থবিরতা ও টানাপড়েন তৈরি হয়েছিল, তা কাটাতে ২০২৫ সালের ২৮ মার্চ চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন মুহাম্মদ ইউনূস। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তিতে তারা পারস্পরিক রাজনৈতিক সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন এবং বাংলাদেশে ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ ও বিনিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এসব চুক্তির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি হলো চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল (সিইআইজেড) প্রকল্প পুনরুজ্জীবন, যেখানে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে এবং প্রায় ২০০টি চীনা কোম্পানি অংশ নিতে আগ্রহ দেখিয়েছে; আর তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প (টিআরসিএমআরপি), যা আগে ভারতকে দেয়ার কথা থাকলেও পরে চীনকে দেয়া হয়।
আইএসপিআই বলছে, এক বছরেরও বেশি সময় পর বাংলাদেশ এখন জাতীয় নির্বাচনের বিজয়ীর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য প্রস্তুত। এ নির্বাচনের ফল শুধু দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎই নির্ধারণ করবে না, বরং আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান ও কৌশলগত সংযুক্তিও প্রভাবিত করতে পারে।


