পোশাক শিল্প সম্প্রসারণে বাড়বে নারীদের কর্মসংস্থান, গাজীপুরে তারেক রহমান
জানুয়ারি ২৮, ২০২৬
ইতালিয়ান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্যাল স্টাডিজের বিশ্লেষণ ভোটের পরও কঠিন পথ বাংলাদেশের সামনে
জানুয়ারি ২৯, ২০২৬
পোশাক শিল্প সম্প্রসারণে বাড়বে নারীদের কর্মসংস্থান, গাজীপুরে তারেক রহমান
জানুয়ারি ২৮, ২০২৬
ইতালিয়ান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্যাল স্টাডিজের বিশ্লেষণ ভোটের পরও কঠিন পথ বাংলাদেশের সামনে
জানুয়ারি ২৯, ২০২৬

নির্বাচনে ডিজিটাল অপপ্রচার: সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রত্যাশার পর এই নির্বাচনকে ঘিরে জনমনে তৈরি হয়েছে নতুন আশাবাদ। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনই এখন দেশের প্রধান চাহিদা। কিন্তু এমন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ডিজিটাল পরিসরে যে ভয়াবহ অপপ্রচার শুরু হয়েছে, তা এই নির্বাচনী পরিবেশের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সম্প্রতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমগুলোর নাম, লোগো ও নকশা নকল করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া সংবাদ, বিভ্রান্তিকর ফটোকার্ড ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দ্বারা তৈরি কনটেন্ট ছড়ানো হচ্ছে। প্রথম আলোসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও টেলিভিশন চ্যানেলের আদলে বানানো এসব ফেক কার্ড সাধারণ মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। ফলে ভোটাররা সহজেই বিভ্রান্ত হচ্ছেন এবং প্রকৃত তথ্য থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। এই ডিজিটাল জালিয়াতি শুধু গণমাধ্যমের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে না, এটি সরাসরি ভোটারের স্বাধীন মতামত গঠনের অধিকারকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে যেখানে তথ্য দ্রুত পাওয়া সম্ভব হয়েছে, সেখানে একই প্রযুক্তি এখন অপপ্রচারের প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, গত এক বছরে গড়ে প্রতিদিন দুটির বেশি ভুয়া তথ্য শুধু মূলধারার গণমাধ্যমের নাম ব্যবহার করেই ছড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতাদের নামে বানানো মিথ্যা বক্তব্য, ভুয়া ফটোকার্ড এবং ডিপফেক ভিডিও সাধারণ মানুষের আবেগকে উসকে দিচ্ছে। বিএনপির মহাসচিব, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দ কিংবা নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে সম্প্রতি যে ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয়েছে, তা রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চরম লঙ্ঘন।

ডিজিটাল অপপ্রচারের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, এটি মূলধারার গণমাধ্যমের আস্থাকে ব্যবহার করে। সাধারণ মানুষ সাধারণত বড় গণমাধ্যমের তথ্যকে বিশ্বাসযোগ্য বলে ধরে নেয়। সেই আস্থার সুযোগ নিয়ে যখন হুবহু লোগো, ফন্ট ও ডিজাইন ব্যবহার করে ভুয়া সংবাদ কার্ড ছড়ানো হয়, তখন প্রকৃত ও মিথ্যা তথ্য আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে করে জনমনে বিভ্রান্তি বাড়ে, গুজব ছড়ায় এবং সহিংস পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও নির্বাচনের আগে ডিপফেক ও ভুয়া তথ্যের অপব্যবহার গণতন্ত্রকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে এমন প্রযুক্তির অপব্যবহার ইতোমধ্যে আলোচিত হয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ঝুঁকি আরও বেশি, কারণ দেশের একটি বড় অংশ এখনো ডিজিটাল সাক্ষরতার দিক থেকে পিছিয়ে। অনেকেই যাচাই-বাছাই ছাড়াই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া তথ্য বিশ্বাস করেন এবং তা ছড়িয়ে দেন।

অতীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। ধর্মীয় বা রাজনৈতিক ইস্যুতে ভুল তথ্য ছড়িয়ে দাঙ্গা ও প্রাণহানির ঘটনাও দেশ দেখেছে। নির্বাচনের সময় এ ধরনের অপপ্রচার আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। এআই ও ডিপফেক প্রযুক্তি যুক্ত হওয়ায় এখন অপপ্রচারের ধরন আরও সূক্ষ্ম ও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং ভোটের পরিবেশ অস্থিতিশীল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন, সরকার এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি তাদের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। কেবল বিদ্যমান ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রয়োগ করে এই সুনামি ঠেকানো সম্ভব নয়। প্রয়োজন বিশেষায়িত সাইবার ফরেনসিক ইউনিট, যা দ্রুত ভুয়া কনটেন্ট শনাক্ত ও অপসারণ করতে পারবে। পাশাপাশি নির্বাচনী আচরণবিধিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহারকে স্পষ্টভাবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।

রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রেও দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। দলগুলোকে ডিজিটাল নৈতিকতা বা ‘ডিজিটাল এথিকস’ মেনে চলার অঙ্গীকার করতে হবে। নির্বাচনী প্রচারে মিথ্যা তথ্য, ভুয়া ভিডিও বা বিভ্রান্তিকর ফটোকার্ড ব্যবহার না করার বিষয়ে দলীয় পর্যায়ে কঠোর নির্দেশনা দিতে হবে। প্রয়োজনে সব দলের সম্মতিতে একটি আচরণবিধি প্রণয়ন করা যেতে পারে।

তবে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন সাধারণ নাগরিকরা। যেকোনো চটকদার শিরোনাম, বিতর্কিত ফটোকার্ড বা ভিডিও দেখলেই তা শেয়ার না করে আগে যাচাই করা এখন নাগরিক দায়িত্ব। সংবাদটির উৎস কি কোনো ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ? ওয়েবসাইটের বানান ঠিক আছে কি না? সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমে সত্যিই এমন সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে কি না—এই প্রশ্নগুলো করলেই অনেক গুজব থেমে যাবে। প্রথম আলোসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম ইতিমধ্যে পাঠকদের সচেতন করতে সতর্কবার্তা দিয়েছে।

গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো সচেতন নাগরিক। একটি গুজব যেমন সমাজকে বিষিয়ে তুলতে পারে, তেমনি সচেতনতা পারে সমাজকে রক্ষা করতে। প্রযুক্তি আমাদের হাতকে শক্তিশালী করেছে, কিন্তু যদি আমরা তা দায়িত্বহীনভাবে ব্যবহার করি, তবে সেই প্রযুক্তিই গণতন্ত্রের শত্রু হয়ে উঠবে। তাই আজ সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো—রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ।

সবশেষে বলা যায়, নির্বাচনে ডিজিটাল অপপ্রচার শুধু একটি প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়; এটি একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকট। যদি এই অপপ্রচার নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে ভোটারদের স্বাধীন মতামত গঠনের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। সরকারকে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে—আইনগত, প্রযুক্তিগত ও সামাজিক—তিন স্তরেই। প্রযুক্তির কাছে যেন গণতন্ত্র পরাজিত না হয়, সেটিই হোক আমাদের আজকের অঙ্গীকার।

জাকির হোসেন, সম্পাদক, সিটিনিউজ সেভেন ডটকম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *