
পবিত্র শবেকদর: এ রজনি তাৎপর্যময় হয়ে উঠুক
জানুয়ারি ২২, ২০২৬
তালিকাভুক্ত কোম্পানির খাতভিত্তিক শ্রেণীবিন্যাস আন্তর্জাতিক মান অনুসারে নির্ধারণ চায় ডিবিএ
জানুয়ারি ২২, ২০২৬দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সংখ্যা কমিয়ে আনার লক্ষ্যে দুটো রেখে বাকিগুলো মার্জ (একীভূত) করার জন্য সরকারকে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর।
দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সংখ্যা কমিয়ে আনার লক্ষ্যে দুটো রেখে বাকিগুলো মার্জ (একীভূত) করার জন্য সরকারকে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। পাশাপাশি বাস্তবতা বিবেচনায় বাংলাদেশে ১০-১৫টি ব্যাংকই যথেষ্ট বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
রাজধানীর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে গতকাল ‘ব্যাংক খাত: বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন গভর্নর। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন জবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম।
অনুষ্ঠানে ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘দেশে বর্তমানে ৬১টি ব্যাংক রয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি। বাস্তবতা বিবেচনায় বাংলাদেশে ১০-১৫টি ব্যাংকই যথেষ্ট। ব্যাংকের সংখ্যা কমানো গেলে সুশাসন নিশ্চিত করা সহজ হবে।’
এ সময় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সংখ্যা কমিয়ে আনার পরিকল্পনা তুলে ধরে গভর্নর বলেন, ‘সরকারের কাছে প্রস্তাব দিয়েছি, দুটো রাষ্ট্রীয় ব্যাংক রেখে বাকিগুলো মার্জ (একীভূত) করে দেন সবগুলো ব্যাংকের সঙ্গে। তো সরকার যা হয়, দেখি দেখি করছে। কিছু সিগন্যাল দেয় আবার পিছিয়ে যায়। আমরা চেষ্টায় আছি; এ সরকারের আমলে তো হবে না, পরবর্তী সরকারের সময়ে এটা যদি সম্ভব হয়।’
পার্শ্ববর্তী দেশের উদাহরণ টেনে ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘ভারতে মাত্র চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক আছে। সে হিসেবে আমাদের কি এতগুলো ব্যাংক দরকার? আমাদের বড় ও শক্তিশালী ব্যাংক দরকার। এতে আমাদের ওভারহেড খরচ কমবে; ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমবে। আমাদের মুনাফা সক্ষমতা বাড়বে।’ বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য ৬১টি ব্যাংক তদারকি করা চাপের বলেও মন্তব্য করেন গভর্নর।’
দেশে বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের সংখ্যা ছয়টি। ব্যাংক খাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এসব ব্যাংক সরকারি খাতে লেনদেন, আমদানি-রফতানি ও বৃহৎ প্রকল্পে অর্থায়নে ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে বিশেষায়িত সরকারি ব্যাংকের সংখ্যা তিনটি। এসব ব্যাংক মূলত কৃষি, গ্রামীণ উন্নয়ন ও শ্রমবাজারমুখী কার্যক্রমে বিশেষায়িত সেবা দিয়ে থাকে। এছাড়া অ-তালিকাভুক্ত ব্যাংক রয়েছে পাঁচটি।
ব্যাংক খাতের বর্তমান অবস্থার জন্য সুশাসনের ব্যর্থতাকে দায়ী করে ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘এটা সব পর্যায়েই হয়েছে—সরকারি পর্যায়ে হয়েছে, রাজনৈতিক পর্যায়ে হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে নির্দেশিত হয়ে ঋণ দেয়া হয়েছে; নির্দেশিত হয়ে ব্যাংক অধিগ্রহণ করা হয়েছে। একই পরিবার থেকে অনেক ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে এবং সেখান থেকে লাখ লাখ কোটি টাকা নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই হয়নি—এটা একটা বড় কারণ।’
এ সময় দুর্বৃত্তায়ন, অনিয়ম, পরিবারতন্ত্র ও সুশাসনের অভাবে দেশের ব্যাংক খাত কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে—দাবি করে গভর্নর বলেন, ‘এসব কারণে ব্যাংক খাত থেকে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা বেরিয়ে গেছে, যার একটি বড় অংশ সম্ভবত বিদেশে পাচার হয়েছে।’ পাশাপাশি পরিবারতন্ত্রের মাধ্যমে ২০ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলার পাচারের অভিযোগও করেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংক স্বায়ত্তশাসন না পেলে ভবিষ্যতে আবারো লুটপাট হবে বলেও মন্তব্য করেন গভর্নর। তিনি বলেন, ‘ব্যাংক খাতে যা হয়েছে, এখন তা হচ্ছে না। কেউ চাইলেই নীতি বদলানো হচ্ছে না। এর ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন দিতে সরকারের কাছে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধন করতে হবে। সেটা না হলে পরবর্তী সময়ে কী হবে, তা বলতে পারব না।’
তিনি বলেন, ‘কোনোভাবেই যেন ব্যক্তিকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত ব্যাংক খাতে প্রভাব না ফেলে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। সঠিক গভর্ন্যান্সের অভাবেই এ খাত ধ্বংসের মুখে পড়েছে। ব্যাংক খাতে সংস্কারের বহু দিক রয়েছে এবং সব ক্ষেত্রেই সংস্কার জরুরি।’
আগামী মার্চের মধ্যে খেলাপি ঋণের হার ২৫ শতাংশে নেমে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন গভর্নর। তবে সংশোধিত বাংলাদেশ ব্যাংক অধ্যাদেশ জারি না হলে ভবিষ্যতে আবারো ব্যাংক খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ফিরে আসতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক একটি ব্যাংক রেজলিউশন ফান্ড গঠনের কাজ করছে। এ তহবিলে ৩০-৪০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে। শুধু ব্যাংক নয়, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এ রেজলিউশন কাঠামোর আওতায় আনা হবে।’
ক্যাশলেস সমাজ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়ে গভর্নর বলেন, ‘রাজস্ব ফাঁকির প্রধান মাধ্যম হলো নগদ লেনদেন। ক্যাশলেস ব্যবস্থা চালু করা গেলে বছরে দেড় থেকে ২ লাখ কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আহরণ সম্ভব।’ এজন্য প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে জবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম বলেন, ‘প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি খাতকে এগিয়ে নিতে বর্তমান গভর্নরের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংক খাত কতটা নাজুক অবস্থায় রয়েছে, তা এখন স্পষ্ট।’ বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে এ খাত পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চলছে এবং ইতিবাচক ধারার উন্নয়ন অব্যাহত থাকবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে জবির অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শরিফ মোশারফ হোসেন বলেন, ‘দেশের ব্যাংক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি সবারই জানা। ঋণখেলাপির হার বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকের ঋণ বিতরণ কমেছে, ফলে বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।’ ভবিষ্যতে ব্যাংক খাতকে আরো কঠোর মনিটরিংয়ের আওতায় আনতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা এবং অর্থনীতি সমিতির সদস্য সচিব অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন।


