
সংস্কার ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার শর্তে যেকোনো দলের সঙ্গে জামায়াত: শফিকুর রহমান
জানুয়ারি ২০, ২০২৬জ্বালানি উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে অপারেটররা রমজানের আগেই এলপিজি সংকট কাটার প্রত্যাশা
জানুয়ারি ২১, ২০২৬আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে সম্পন্ন করার আহ্বান জানিয়ে এটিকে একটি ‘মডেল নির্বাচন’ হিসেবে দেখতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। সম্প্রতি ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে মার্কিন পক্ষ থেকে এই প্রত্যাশার কথা জানানো হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে, সরকার একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।
গত সোমবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে ছিলেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেন। বৈঠকে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক, গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং নির্বাচন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয় বলে জানা গেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতায় যাওয়ার কিংবা পরিবর্তন আনার একমাত্র বৈধ ও সাংবিধানিক উপায় হলো নির্বাচন। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটে ভোটের মাধ্যমে। ফলে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন শুধু সরকার গঠনের পথই সুগম করে না, বরং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোকেও শক্তিশালী করে।
তবে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশে যদি সংঘাত, সহিংসতা কিংবা সাংবিধানিক সংকট তৈরি হয়, তাহলে তা গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে এবং অসাংবিধানিক পন্থায় ক্ষমতার পালাবদল ঘটার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই দেশের জন্য কল্যাণকর নয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা সৃষ্টি হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ মানুষ। পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম এবং সরকারের রাজস্ব আয়ের ওপর পড়তে পারে নেতিবাচক প্রভাব। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে সংবিধানের ১১৮(১) অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতির নিয়োগে কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে ১৩তম নির্বাচন কমিশন। এই কমিশনে প্রথমবারের মতো প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার পদে একসঙ্গে তিনজন সিনিয়র সচিব পর্যায়ের সাবেক কর্মকর্তা নিয়োগ পেয়েছেন। বাকি দুই কমিশনারের মধ্যে একজন সাবেক জেলা ও দায়রা জজ এবং অন্যজন অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল। অভিজ্ঞ ও পেশাদার ব্যক্তিদের নিয়ে কমিশন গঠিত হওয়ায় নির্বাচন ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে জনগণের মধ্যে কিছুটা আশার সঞ্চার হয়েছে।
এর আগে গঠিত নির্বাচন কমিশনগুলোর অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় অনুষ্ঠিত চারটি নির্বাচন ছাড়া অধিকাংশ নির্বাচন নিয়েই গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন উঠেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর অভিযোগ, প্রশাসনিক প্রভাব, ভোটার উপস্থিতি কম থাকা এবং অনিয়মের কারণে এসব নির্বাচন বিতর্কিত হয়ে উঠেছিল। ফলে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের নির্বাচনি ব্যবস্থা যতটা শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন, বাস্তবতা বলছে সে লক্ষ্য এখনো পুরোপুরি অর্জিত হয়নি।
তবে আশাব্যঞ্জক দিক হলো, নতুন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল দায়িত্ব নেওয়ার পর সব রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনমুখী করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। তার ভাষায়, সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই এই কমিশনের মূল লক্ষ্য। তিনি আরও জানিয়েছেন, নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কমিশন সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, একটি সত্যিকারের অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে হলে শুধু নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন সরকারের সদিচ্ছা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে ভোটাররা ভয়মুক্ত পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন।
আন্তর্জাতিক মহলের আগ্রহ ও প্রত্যাশাও এবারের নির্বাচনকে ঘিরে বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেখতে চায়, যা দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে আরও সুদৃঢ় করবে। একটি সফল নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাই নয়, বরং অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সব মিলিয়ে, আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। এই নির্বাচন কতটা শান্তিপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য হয়, তার ওপর নির্ভর করছে দেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ পথচলা। নবগঠিত নির্বাচন কমিশন কতটা দক্ষতা, সাহসিকতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারে—সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
দেশবাসী আশা করছে, রাজনৈতিক মতভেদ ভুলে সবাই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হবে। কারণ একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনই পারে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠিত করতে।
জাকির হোসেন, সম্পাদক, সিটিনিউজ সেভেন ডটকম


