নড়াইলে নবগঙ্গা নদীর ওপর সেতু নির্মাণ দেড় বছরের প্রকল্প শেষ হয়নি আট বছরেও, নকশা পরিবর্তনে ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণ
জানুয়ারি ১৫, ২০২৬
সিজিএস সংলাপে বক্তারা গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের ওপর হামলার দায় সরকারের
জানুয়ারি ১৫, ২০২৬
নড়াইলে নবগঙ্গা নদীর ওপর সেতু নির্মাণ দেড় বছরের প্রকল্প শেষ হয়নি আট বছরেও, নকশা পরিবর্তনে ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণ
জানুয়ারি ১৫, ২০২৬
সিজিএস সংলাপে বক্তারা গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের ওপর হামলার দায় সরকারের
জানুয়ারি ১৫, ২০২৬

ঢাকায় মাঠ পার্ক জলাশয় দখল হলেও পরিবেশ আন্দোলনে নীরবতা

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ধানমন্ডির সাত মসজিদ রোডে গাছ কাটা, তেঁতুলতলা মাঠে থানা ভবন নির্মাণসহ বিভিন্ন ঘটনার প্রতিবাদে নাগরিক সমাজ ও পরিবেশবাদীদের পক্ষ থেকে আন্দোলন দেখা গিয়েছিল।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ধানমন্ডির সাত মসজিদ রোডে গাছ কাটা, তেঁতুলতলা মাঠে থানা ভবন নির্মাণসহ বিভিন্ন ঘটনার প্রতিবাদে নাগরিক সমাজ ও পরিবেশবাদীদের পক্ষ থেকে আন্দোলন দেখা গিয়েছিল। বিগত শাসনামলে নেয়া পান্থকুঞ্জ পার্ক ও হাতিরঝিলের সংরক্ষিত জলাধারে এফডিসি থেকে পলাশী পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সংযোগ সড়ক প্রকল্প বাতিলের দাবিতে পরিবেশকর্মীরা ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে টানা কয়েক মাস আন্দোলন করেন। সেখানে ১৫০ দিনের বেশি সময় ধরে পরিবেশকর্মীরা অবস্থান নেন। সে সময় পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান এবং শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান পান্থকুঞ্জে এসেছিলেন আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলতে। উপদেষ্টারা আশ্বাস দিয়েছিলেন অন্তর্বর্তী সরকার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বসে কথা শুনবেন। কিন্তু তা করা হয়নি। আন্দোলকারীরা পরবর্তী সময়ে আদালতে যান। ‘পান্থকুঞ্জ পার্ক’ ও হাতিরঝিল জলাধারের উন্মুক্ত স্থানে যেকোনো ধরনের নির্মাণকাজ থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। সম্প্রতি আবার পান্থকুঞ্জ পার্কে কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে। পরিবেশ আন্দোলনকারীরা বলছেন, পান্থকুঞ্জ পার্ক নিয়ে সরকারের ভূমিকা তাদের হতাশ করেছে।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে পান্থকুঞ্জ পার্কে এসে সড়ক উপদেষ্টা ঘোষণা করেছিলেন পরের বছর মার্চেই (২০২৫ সাল) ফার্মগেটের শহীদ আনোয়ারা উদ্যান উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। কিন্তু আনোয়ারা উদ্যান উন্মুক্ত হয়েছে গত শুক্রবার এবং তা-ও ব্যবহারের উপযোগী পরিবেশ ছাড়াই।

ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘পরিবেশকর্মীদের প্রত্যাশা ছিল এ সরকারের সময়ে তেমন কোনো পরিবেশবিষয়ক আন্দোলনই করা লাগবে না। বরং সরকার নিজ থেকেই পার্ক-মাঠ-জলাশয় দখল রোধ করবে। কিন্তু আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করলাম, এ সরকারও অতীত সরকারের মতো পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। আমরা পান্থকুঞ্জ পার্কে দিনের পর দিন পড়ে রইলাম। কিন্তু সরকারের কেউ আমাদের কথা শোনার প্রয়োজনও মনে করেনি। এ দৃশ্য তো আগের সরকারের কথা মনে করিয়ে দেয়। ধানমন্ডিতে গাছ রক্ষার জন্য তখনকার দোর্দণ্ড প্রতাপশালী মেয়র তাপসের অফিসে গেলে, তিনি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দেখাই করেননি। আমরা পান্থকুঞ্জ পার্ক রক্ষা করতে আদালতে গিয়ে স্থিতাবস্থা নিয়ে এসেছি। সরকার তার বিরুদ্ধে আপিল করে এখন আবার পার্ক ধ্বংস শুরু করছে। এর চেয়ে হতাশার ঘটনা আর কী হতে পারে।’

শুধু পান্থকুঞ্জ পার্কই নয়, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেও চলছে পরিবেশের জন্য বিরূপ কর্মকাণ্ড। সেখানে শিশুপার্ক সংস্কারের নামে পার্কের বড় অংশই কংক্রিটের আচ্ছাদনে ঢেকে দেয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে উদ্যানের ভেতর সম্প্রতি আনসার ক্যাম্প নির্মাণ করা হয়েছে। বর্তমানে উদ্যানে ওয়াকওয়ে নির্মাণের নামে কংক্রিটের আচ্ছাদন দেয়া হচ্ছে।

জলবায়ু ন্যায়বিচারকর্মী নয়ন সরকার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সম্প্রতি আমরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পরিদর্শন করেছি। এটিকে এখন আর উদ্যান বলা কঠিন। এখানে এরই মধ্যে কাছ কাটা শুরু হয়েছে। ডিএসসিসি আরো গাছ কাটবে।’

অন্তর্বর্তী সময়ে রাজধানীর আজিমপুর স্টাফ কোয়ার্টার কলোনির বড় মাঠে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আবাসন নির্মাণের প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। রামপুরা মাঠে শিশুদের খেলার সুযোগ বন্ধ করে ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। রামপুরা ও খিলগাঁও ঝিলে থানা নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড়া ওসমানী উদ্যানেও নতুন করে কংক্রিটের আচ্ছাদন দেয়া হয়েছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকার অন্তত তিনটি মাঠ হাতছাড়া হওয়ার কথা জানা গেছে। এর মধ্যে মিরপুরের কালশী মাঠ ও কলোনি মাঠ এবং মোহাম্মদপুরের টাউন হল পার্ক দীর্ঘদিন জনপরিসর হিসেবে ব্যবহার হলেও সম্প্রতি জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ এসব স্থানে আবাসন নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে।

ডিএনসিসি এলাকার মাঠ-পার্কগুলো বেহাত হওয়ার বিষয়ে সংস্থাটির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের পক্ষে সম্প্রতি এক লিখিত বিবৃতিতে ডিএনসিসির গণসংযোগ বিভাগ জানায়, ‘এগুলোর মালিকানা ডিএনসিসির নয়, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের (ইউআরপি) অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌আমরা আগেও দেখেছি, পরিবেশকর্মীদের একটা অংশ পরিবেশ আন্দোলন শুরু করে পরে আবার পরামর্শকের ভূমিকায় চলে যান। বিষয়টা আসলে কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট হয়ে যায়। তবে এটা ঠিক যে এখন যেভাবে নাগরিক আন্দোলন বন্ধ হয়ে গেছে, ঢাকায় এর আগে কখনো এ রকম নীরবতা আসেনি। আগে সরকার পরিবেশ ধ্বংস করে কোনো প্রকল্প নেয়ার কথা বলেছে, সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় মানুষজনকে সঙ্গে নিয়ে পরিবেশবাদীরা মাঠে নেমেছে। মিছিল করেছে, মিটিং করেছে, নানাভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছে। কিন্তু এখন পরিবেশ বিধ্বংসী কাজ হচ্ছে, পার্ক, মাঠ দখল হচ্ছে; কিন্তু কোনো আন্দোলন দেখা যাচ্ছে না। এটা পরিবেশ আন্দোলনের জন্য অবশ্যই খারাপ খবর।’

দেশের পরিবেশ আন্দোলনে দীর্ঘদিন ধরে ভূমিকা পালন করছে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ধানমন্ডি গাছ রক্ষা, তেঁতুলতলা মাঠ সব আন্দোলনেই সরব উপস্থিতি ছিল সংগঠনটির। দেশের পরিবেশ আন্দোলনের পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে বাপার সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাপার জাতীয় সম্মেলন থাকার কারণে সমাবেশ ও মিছিলের কর্মসূচি না থাকলেও পান্থকুঞ্জ পার্ক পরিদর্শন, কাজ বন্ধ করার জন্য প্রেস বিজ্ঞপ্তি এবং জাতীয় সম্মেলনে নিন্দা জানিয়ে একটি ঘোষণাপত্র পাঠ করা হয়েছে। আমাদের জাতীয় সম্মেলনে পরিবেশ উপদেষ্টা উপস্থিত ছিলেন। আমরা জোরালোভাবে পান্থকুঞ্জ পার্ক রক্ষার দাবি জানিয়েছি। উপদেষ্টা তার ব্যাখ্যা আমাদের সামনে তুলে ধরেন।’

জানা গেছে একটি শাখা বা উইং কয়েকটি পিলারের মাধ্যমে পান্থকুঞ্জ অতিক্রম করে ধানমন্ডি, হাতিরপুল হয়ে পুরান ঢাকা অবধি বিস্তৃত হবে। এছাড়া ওই উইং থেকে পান্থকুঞ্জ হয়ে সার্ক ফোয়ারার কাছাকাছিতে একটি র‍্যাম্প কানেকশনের মাধ্যমে এক্সপ্রেসওয়েতে উত্তরণের পথ খোলা হবে। সেফটি অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের (এসএএফ) সহসভাপতি স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, ‘আমরা তো মনে করি সংগত কারণেই এ সরকার অর্থনৈতিক ক্ষতি বা ক্ষতিপূরণের বিষয়টিকে মোকাবেলা করে অথবা মেনে নিয়ে হলেও পুরো উইং তথা এ শাখাকে বাতিলের দৃঢ়তা দেখাতে পারে। এক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ-প্রতিবেশগত সম্ভাব্য ক্ষতি, জনক্ষোভ নিরসনের ব্যর্থতার দায়ভার এবং ওই গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ট্রাফিক ইম্প্যাক্টজনিত জটিলতার সম্ভাবনার বিপরীতে সিদ্ধান্তটি দৃঢ়, যৌক্তিক ও মানবিক বলে বিবেচিত হতে পারত।’

ইকবাল হাবিব আরো বলেন, ‘নির্বাচন কাছে চলে আসার পাশাপাশি মব ভায়োলেন্সের কারণে পরিবেশ আন্দোলনে এক ধরনের স্থবিরতা এসেছে। তবে এটা ঠিক, নির্বাচিত সরকার এলে পরিবেশ আন্দোলনের স্থবিরতা কেটে যাবে। তখন আমরা আবার ঢাকার মাঠ-পার্ক-জলাশয় উদ্ধারে পূর্ণ উদ্যমে কাজ করে যাব।’

তেঁতুলতলা মাঠ রক্ষা আন্দোলনে সরব ছিলেন সৈয়দা রত্না। তিনি বলেন, ‘আমরা এ সরকারের কার্যক্রমে হতাশ। রাজধানীর অন্য কোথাও পরিবেশ আন্দোলন হচ্ছে না। পান্থকুঞ্জে আমরা দিনের পর দিন পড়ে ছিলাম। কিন্তু পরিবেশের ব্যাপারে এ সরকারের কাছে আমরা কোনো সহযোগিতাই পাইনি।’

সার্বিক বিষয়ে মন্তব্য জানতে পরিবেশ উপদেষ্টার হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদেবার্তা পাঠানো হয়। তবে গত রাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *