
পাকিস্তান সুপার লিগে যোগ দিলেন মুস্তাফিজ
জানুয়ারি ৭, ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা বন্ড তালিকায় এবার বাংলাদেশ
জানুয়ারি ৭, ২০২৬জনগণের ঘাম, শ্রম আর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত প্রতিটি রক্তাভ মুদ্রা আজ ক্ষমতার নিষ্ঠুর দাবার বোর্ডে কেবল একেকটি নির্বাক ঘুঁটি। যে অর্থের মর্যাদা রক্ষা করার কথা ছিল, সেই অর্থকেই আজ বারবার ক্ষমতার সিঁড়ি বানিয়ে নির্লজ্জভাবে নির্দ্বিধায় আরোহণ করা হচ্ছে। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে পরিচিত মুদ্রা আজ কয়েক বছর পরপর বদলে যাওয়া রঙিন কাগজের টুকরোতে পরিণত হওয়ায় জনমনে জন্ম নিচ্ছে গভীর অনাস্থা ও প্রশ্ন।
সম্প্রতি নতুন নোট বাজারে ছাড়ার ঘোষণার পর থেকেই সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি ও সন্দেহ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন উঠছে—এই পরিবর্তন কি সত্যিই অর্থনীতির স্বার্থে, নাকি এর পেছনে রয়েছে ভিন্ন কোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক অভিপ্রায়? অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, প্রতিবারই নতুন নোটের আগমন মানেই পুরোনো নোট নিয়ে আতঙ্ক, ব্যাংকের সামনে দীর্ঘ লাইন, কালোবাজারে নোট বদলের নামে প্রতারণা এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, একটি দেশের মুদ্রা কেবল লেনদেনের মাধ্যম নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থার প্রতিফলন। কিন্তু যখন সেই মুদ্রা ঘন ঘন পরিবর্তিত হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে—রাষ্ট্র কি তার নিজস্ব আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্থিতিশীল? নাকি এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে কোনো ব্যর্থতা আড়াল করার চেষ্টা চলছে?
নতুন নোট চালুর ক্ষেত্রে সরকার সাধারণত যুক্তি দেখায় জাল নোট প্রতিরোধ, নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য উন্নয়ন কিংবা নান্দনিক পরিবর্তনের। কিন্তু বাস্তবতা হলো, জাল নোটের কারবার বন্ধ হয় না, বরং নতুন নোট আসার সঙ্গে সঙ্গে জালিয়াতির নতুন কৌশলও জন্ম নেয়। এতে লাভবান হয় একটি সীমিত গোষ্ঠী, আর ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ—বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি।
গ্রামাঞ্চল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য এই সমস্যা আরও প্রকট। ব্যাংকিং ব্যবস্থার সীমিত প্রবেশাধিকার, ডিজিটাল লেনদেনে অদক্ষতা এবং তথ্যের অভাবে তারা নতুন নোট সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, পুরোনো নোট গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানো হচ্ছে, অথচ নির্দিষ্ট সময়সীমা বা দিকনির্দেশনা স্পষ্ট নয়। ফলে জনগণ পড়ছে চরম অনিশ্চয়তায়।
বিশ্লেষকদের মতে, নোট পরিবর্তনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো অর্থনীতির মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধান—মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং দুর্নীতি রোধ। কিন্তু এসব কাঠামোগত সমস্যার সমাধান না করে কেবল নতুন নোট চালু করলে তা অনেকটা ক্ষতস্থানে রঙিন ব্যান্ডেজ লাগানোর মতোই।
সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা নতুন নোটে সৌন্দর্যের চেয়ে স্থায়িত্ব ও বিশ্বাসযোগ্যতাকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলেন, “নোটের রঙ বদলালেই আমাদের জীবন বদলে যায় না। দরকার নোটের মান আর টাকার মূল্য যেন ঠিক থাকে।” এই বক্তব্যই প্রতিফলিত করে জনমনের প্রকৃত চাওয়া।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও মনে করেন, মুদ্রাকে বারবার পরিবর্তনের মাধ্যমে একধরনের প্রতীকী ক্ষমতা প্রদর্শনের চেষ্টা চলে। রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতীক যখন ক্ষমতার প্রচারণার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন সেই প্রতীকের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা ও আস্থা ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে। মুদ্রাও তার ব্যতিক্রম নয়।
অতএব প্রশ্ন থেকেই যায়—নতুন নোট কি সত্যিই জনগণের স্বার্থে, নাকি এটি ক্ষমতার এক নতুন মুখোশ? জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে হলে প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা। অন্যথায়, প্রতিটি নতুন নোট আগের চেয়ে আরও বেশি অনাস্থার জন্ম দেবে, আর রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতীক কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
জাকির হোসেন, সম্পাদক, সিটিনিউজ সেভেন ডটকম


