খালেদা জিয়ার জানাজা ঘিরে ঢাকার যেসব সড়ক বন্ধ থাকবে
ডিসেম্বর ৩১, ২০২৫
স্বর্ণের দাম কমল, কার্যকর বৃহস্পতিবার
ডিসেম্বর ৩১, ২০২৫
খালেদা জিয়ার জানাজা ঘিরে ঢাকার যেসব সড়ক বন্ধ থাকবে
ডিসেম্বর ৩১, ২০২৫
স্বর্ণের দাম কমল, কার্যকর বৃহস্পতিবার
ডিসেম্বর ৩১, ২০২৫

এ রকম একজন নেত্রী বাংলাদেশ অদূর ভবিষ্যতে পাবে কিনা সন্দেহ

দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে না–ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার ইন্তেকালে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোক ও শূন্যতা। তার মৃত্যু কেবল একটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি নয়; বরং বাংলাদেশের ইতিহাসে এক সাহসী, আপসহীন ও দেশপ্রেমিক নেতৃত্বের অবসান।

খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, কিডনি ও লিভারের জটিলতাসহ নানাবিধ শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। চিকিৎসকরা তার অবস্থা স্থিতিশীল বললেও বাস্তবতা ছিল অত্যন্ত জটিল। তবুও তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অসীম মানসিক দৃঢ়তা নিয়ে অসুস্থতার বিরুদ্ধে লড়াই করে গেছেন। যেভাবে তিনি রাজনৈতিক জীবনে স্বৈরাচার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান নিয়েছিলেন, তেমনি ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি ছিলেন অদম্য।

খালেদা জিয়া রাজনীতিতে আসেননি প্রচলিত কোনো রাজনৈতিক প্রস্তুতি নিয়ে। তিনি ছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান–এর সহধর্মিণী ও একজন গৃহিণী। কিন্তু জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল গভীর নেতৃত্ব সংকটে পড়ে। সে সময় দলের তরুণ নেতৃত্বের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি রাজনীতিতে যোগ দেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই দলের হাল ধরেন। একটি অগোছালো ও বিভক্ত দলকে সংগঠিত করে তিনি স্বৈরশাসক এরশাদের বিরুদ্ধে দৃঢ় আন্দোলন গড়ে তোলেন, যা শেষ পর্যন্ত গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।

১৯৯০ সালের ঐতিহাসিক গণআন্দোলনের মাধ্যমে এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ক্ষমতায় আসে। সেই সরকার সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে এবং দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচনা করে। তার শাসনামলে ভ্যাট ব্যবস্থা প্রবর্তন, বাজার অর্থনীতিকে উৎসাহিত করা এবং ব্যক্তিখাতের বিকাশ ঘটানোর মাধ্যমে অর্থনীতিতে গতি আসে।

বিশেষ করে নারী শিক্ষা বিস্তারে তার অবদান অনস্বীকার্য। ‘ফুড ফর এডুকেশন’ ও উপবৃত্তি কর্মসূচির মাধ্যমে গ্রামবাংলায় মেয়েদের স্কুলমুখী করা হয়, যা সামাজিক পরিবর্তনের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এসব উদ্যোগ নারীর ক্ষমতায়ন ও শিক্ষার প্রসারে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে।

১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে দেশব্যাপী সহিংস আন্দোলনের মুখে তিনি রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় দেন। সংবিধানে সংশোধন এনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের নজির স্থাপন করেন। ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার পরিবর্তে গণতন্ত্রের স্বার্থে সরে দাঁড়ানো তার নেতৃত্বের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য।

পরবর্তী সময়ে ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি আবারও বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় ফেরেন। কিন্তু ২০০৬–এর পর রাজনৈতিক অস্থিরতা, এক–এগারোর পটপরিবর্তন এবং পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হন তিনি ও তার পরিবার। কারাবরণ, গৃহবন্দিত্ব এবং চিকিৎসা বঞ্চনার মধ্য দিয়ে তার জীবনের শেষ অধ্যায় কেটেছে।

দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনা–র সরকারের আমলে খালেদা জিয়া নানাভাবে নিপীড়নের শিকার হন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবুও তিনি কখনো প্রতিহিংসাপরায়ণ ভাষা ব্যবহার করেননি। তার রাজনৈতিক শালীনতা, ভদ্রতা ও সহনশীলতা তাকে আলাদা মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে।

খালেদা জিয়া ছিলেন আপসহীন অথচ মার্জিত, দৃঢ় অথচ মানবিক। তার নেতৃত্ব ছিল ক্যারিশম্যাটিক এবং জনপ্রিয়তা ছিল সারাদেশব্যাপী। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কাছেও তিনি সম্মান অর্জন করেছিলেন তার ব্যক্তিত্ব ও আচরণের কারণে।

আজ তার প্রয়াণে জাতি হারাল এক ব্যতিক্রমধর্মী নেত্রীকে। এ রকম সাহসী, দেশপ্রেমিক ও গণতান্ত্রিক চেতনার নেতৃত্ব বাংলাদেশ অদূর ভবিষ্যতে পাবে কিনা, তা নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে। তাকে হারানোর শোক অপরিসীম, তবে এই শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে গণতন্ত্র, ন্যায় ও দেশের স্বার্থে এগিয়ে যাওয়াই হবে তার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা।

জাকির হোসেন, সম্পাদক, সিটিনিউজ সেভেন ডটকম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *