
শহিদুল আলমকে ইস্তাম্বুলে স্বাগতম জানালেন কনসাল জেনারেল
অক্টোবর ১০, ২০২৫
বিধ্বস্ত গাজায় ফিরছে বাস্তুচ্যুতরা, ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার শুরু
অক্টোবর ১১, ২০২৫২০২৫ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতেছেন ভেনিজুয়েলার গণতন্ত্র আন্দোলনের নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো। নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি গতকাল বেলা ৩টায় এ ঘোষণা দেয়।
২০২৫ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতেছেন ভেনিজুয়েলার গণতন্ত্র আন্দোলনের নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো। নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি গতকাল বেলা ৩টায় এ ঘোষণা দেয়। কমিটি জানায়, ‘অন্ধকারের মধ্যেও গণতন্ত্রের আলো জ্বালিয়ে রাখার অসাধারণ সাহস ও প্রতিশ্রুতির জন্য তাকে এ বছরের শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে।’
দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে মারিয়া কোরিনা মাচাদো নিকোলাস মাদুরোর দমনমূলক শাসনের সমালোচনা করে আসছেন। হুমকি, গ্রেফতার, মামলার পরও দেশ ছাড়েননি। ২০২৪ সালের নির্বাচনে তিনি বিরোধী জোটের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ছিলেন। কিন্তু সরকারের নিষেধাজ্ঞায় দেশটির ব্যাপক জনপ্রিয় এ নেত্রীর প্রার্থিতা বাতিল হয়। পরে তিনি অন্য প্রার্থী এডমুন্ডো গঞ্জালেজ উরুতিয়াকে সমর্থন দেন। নির্বাচন পর্যবেক্ষণে লাখো স্বেচ্ছাসেবককে সংগঠিত করেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো ভোট কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফলের ভিত্তিতে জানায়, গঞ্জালেজ উরুতিয়া কমপক্ষে ৬০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছিলেন। কিন্তু নিকোলাস মাদুরোর সরকার সেই ফলাফল স্বীকার করেনি। সরকারি নির্বাচন কমিশন মাদুরোকে বিজয়ী ঘোষণা করে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এক সমাবেশে প্রকাশ্যে যাত্রা করতে গিয়ে মাচাদোকে বেশ কয়েক ঘণ্টার জন্য গ্রেফতার করা হয়। পরে মুক্তি পান। এর পর থেকেই গোপনে অবস্থান করছেন। মাচাদোর মতো সাহসী নারী নেতাদের সম্মানিত করা সময়ের দাবি বলে বিবৃতিতে জানায় নোবেল কমিটি। নোবেল কমিটি বলেছে, যখন স্বৈরশাসকরা ক্ষমতা দখল করে নেয়, তখন স্বাধীনতার পক্ষে যারা দাঁড়িয়ে যায়, তাদের স্বীকৃতি দেয়া মানবতার কর্তব্য।
মাচাদোর জন্ম ১৯৬৭ সালের ৭ অক্টোবর, ভেনিজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে। পেশায় তিনি শিল্প প্রকৌশলী। প্রযুক্তি ও অর্থনীতিতে দক্ষ এই নারী ২০০১ সালে প্রথম রাজনীতির ময়দানে নামেন। ২০০২ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন নাগরিক সংগঠন ‘সুমাতে’, যা ভোট পর্যবেক্ষণ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পক্ষে কাজ করত। ২০০৪ সালে ভেনিজুয়েলার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজের বিরুদ্ধে গণভোট আয়োজনের উদ্যোগ নেন তিনি। এর পরই তার বিরুদ্ধে দেশদ্রোহ ও ষড়যন্ত্রের মামলা হয়। কিন্তু তিনি থামেননি। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, গুলির বদলে ব্যালটই আমাদের অস্ত্র।
২০১০ সালে মাচাদো নির্বাচিত হন জাতীয় পরিষদে, সর্বাধিক ভোট পেয়ে। কিন্তু ২০১৪ সালে তিনি মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিবাদ জানাতে অর্গানাইজেশন অব আমেরিকান স্টেটসে বক্তব্য দেয়ার পর তাকে সংসদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। সেই থেকে তার রাজনৈতিক জীবনে শুরু হয় এক দীর্ঘ প্রতিরোধযুদ্ধ।
২০১৩ সালে তিনি গঠন করেন ‘ভেনতে ভেনিজুয়েলা’ নামে উদার রাজনৈতিক দল। এ দলের জাতীয় সমন্বয়ক হিসেবে তিনি এখনো সক্রিয়। গোপনে থেকেও দেশজুড়ে আন্দোলনের দিকনির্দেশনা দেন।
বিবৃতিতে নোবেল কমিটি জানায়, মারিয়া কোরিনা মাচাদো দীর্ঘদিন ভেনিজুয়েলার জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় লড়াই করে যাচ্ছেন। সামরিক শাসন ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে তার অবিচল অবস্থান এবং ন্যায়ভিত্তিক শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রচেষ্টাই তাকে এ সম্মানের যোগ্য করেছে। দীর্ঘ সময় ধরে ভেনিজুয়েলা একটি তুলনামূলক সমৃদ্ধ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র থেকে স্বৈরাচারী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, দেশটিতে অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও মানবিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছে। আর প্রভাবশালী কিছু গোষ্ঠী বিপুল সম্পদ জমাচ্ছে। প্রায় আট মিলিয়ন মানুষ দেশ ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। এ দমননীতির মধ্যেও মারিয়া কোরিনা মাচাদো শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
কমিটি জানায়, আলফ্রেড নোবেলের ইচ্ছাপত্রে শান্তি পুরস্কারের জন্য তিনটি মূল মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছিল—জাতির মধ্যে ঐক্য আনা, সামরিকীকরণের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং শান্তিপূর্ণ পরিবর্তনের প্রতি অঙ্গীকার। মারিয়া কোরিনা মাচাদো এই তিন ক্ষেত্রেই নিজের দৃঢ়তা প্রমাণ করেছেন।
নোবেলজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে অভিনন্দন জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ২০০৬ সালে শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. ইউনূস এক অভিনন্দন বার্তায় বলেন, ‘আমি মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে অভিনন্দন জানাই, যিনি তার প্রিয় ভেনিজুয়েলায় গণতন্ত্র রক্ষায় সাহসিকতার সঙ্গে লড়েছেন। নির্যাতন ও প্রতিবন্ধকতার মুখে তিনি কখনো থেমে যাননি। তার দেশ ও জনগণের জন্য একটি স্বাধীন ও ন্যায়পরায়ণ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে অটল প্রতিশ্রুতি রেখেছেন।’
তিনি নোবেল কমিটির উদ্ধৃতি তুলে ধরে বলেন, ‘গণতন্ত্র নির্ভর করে তাদের ওপর, যারা নীরব থাকতে অস্বীকার করেন, যারা ঝুঁকি নিয়ে সামনে আসেন এবং যারা আমাদের মনে করিয়ে দেন যে স্বাধীনতা স্বাভাবিকভাবে আসে না; সেটিকে সর্বদা রক্ষা করতে হয়—কথায়, সাহসে ও দৃঢ়তায়।’


