ইরাকে ইরানের হামলায় মার্কিন সেনা নিহত
জুলাই ২০, ২০২৬
দুই বছরের ব্যবধানে পাঙাশের দাম কেজিতে বেড়েছে ৫০ টাকা
জুলাই ২০, ২০২৬
ইরাকে ইরানের হামলায় মার্কিন সেনা নিহত
জুলাই ২০, ২০২৬
দুই বছরের ব্যবধানে পাঙাশের দাম কেজিতে বেড়েছে ৫০ টাকা
জুলাই ২০, ২০২৬

চট্টগ্রাম অঞ্চলে বন্যা মিল, গুদাম ও কৃষকের মজুদ ধান-চাল ডুবে বড় ক্ষতি

চট্টগ্রাম ও পার্বত্যাঞ্চলের টানা ভারি বর্ষণ ও বন্যায় ক্ষেতের ফসলের পাশাপাশি কৃষকের উৎপাদিত ধান-চালের মজুদেও ক্ষতি হয়েছে।

বিশেষ করে গুদামঘরে পানি প্রবেশ করে ব্যক্তি ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে ক্ষতি হয়েছে সবচেয়ে বেশি। পাশাপাশি এসব এলাকার বৃহৎ পাইকারি আড়তেও চালের মজুদের একটি বড় অংশ পানিতে নষ্ট হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নিতে চালের বাজার ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার ঝুঁকি দেখছেন স্থানীয়রা।

জানা গেছে, ৭ জুলাই থেকে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় চার দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়। টানা ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে পার্বত্য এলাকা ছাড়াও প্রবাহিত নদী, খাল ও ছড়ায় স্রোত বেড়ে যায়। এতে উপকূলের অনেক উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রাম প্লাবিত হয়। টানা তিন-চারদিন চট্টগ্রামের ৮-১০টি উপজেলার বিভিন্ন এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত থাকায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, মিল ও আড়তে পানি প্রবেশ করে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

বাঁশখালী উপজেলার কাথারিয়া ইউনিয়নের মো. নাসির উদ্দিন জানিয়েছেন, ‘নিজেদের চাষের জমিতে উৎপাদিত ধান ও ব্যবসার উদ্দেশ্যে ক্রয় করে মজুদ রাখা ধান ও চাল বন্যার পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে। নতুন মৌসুমের ধান তোলার পর মাড়াই শেষে গুদামে রাখা হলেও স্থানীয়ভাবে তৈরি মাটির গুদামে পানি প্রবেশ করে ভেঙে পড়ে। এতে সেখানে থাকা ১৫০ মণ ধান পানিতে ভেসে যায়। এবারের বর্ষায় ভারি বৃষ্টিপাতের আভাস পাওয়া গেলেও বন্যার পানির স্তর এতটা উঁচু হবে তা ভাবতে পারিনি।’

জানতে চাইলে চাক্তাই রাইস মিল মালিক সমিতির সভাপতি মো. রফিকউল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় বন্যার কারণে কৃষিসহ বিভিন্ন ধরনের ক্ষতি হয়েছে। সব এলাকায় ক্ষতি না হলেও উপকূলীয় এলাকা ও পাহাড়ের সমতল হাটবাজারগুলোতে পানিতে অনেক মিল ও গুদামে থাকা ধান-চাল নষ্ট হয়েছে। ভারী পণ্য হওয়ায় দ্রুত সময়ের মধ্যে তা সরিয়ে নেয়ার সুযোগ ছিল না। এ কারণে ব্যাপারি, কৃষক ও আড়তদার ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হয়েছে।’ তবে বন্যার কারণে চাহিদা কমে আসায় এখনো চালের বাজার স্থিতিশীল রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

প্রশাসন ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাঁশখালী উপজেলার পশ্চিম অংশের বিভিন্ন ইউনিয়নে বন্যার পানি সবচেয়ে বেশি সময় স্থায়ী ছিল। এর মধ্যে পুকুরিয়া-পুঁইছড়ি আঞ্চলিক সড়কের ছনুয়া, শেখেরখীল, দক্ষিণ চাম্বল, শিলকুট, গণ্ডামারা, সরল, বাহারছড়া, খানকানাবাদ, কাঠরিয়া, পশ্চিম পুঁইছড়ি ইউনিয়নের পশ্চিমাংশে বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এসব এলাকায় হাটবাজার ও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন গ্রামের কৃষকের গুদামে পানি প্রবেশ করে মজুদ ধান-চাল নষ্ট হয়েছে। মূলত সমুদ্র উপকূলীয় এসব এলাকায় প্রতিবন্ধকতার কারণে বন্যার পানি দ্রুত নামতে না পারায় ধান-চালসহ কৃষিপণ্য পানিতে ভিজে নষ্ট হয়েছে। আবার বাঁশখালী উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে মাটির ঘর-গুদাম বেশি হওয়ায় বন্যায় সেসব ভেঙে মজুদ ধান-চাল ভাসিয়ে নিয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

এদিকে বাঁশখালীর পাশাপাশি সাতকানিয়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন, লোহাগাড়া, বোয়ালখালী, হাটহাজারী উপজেলা, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমতলের বেশকিছু হাটবাজারে পাহাড়ি ঢলের পানিতে গুদামের ধান-চাল নষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে রাঙ্গুনিয়া, বোয়ালখালী, রাউজান, হাটহাজারী, ফটিকছড়ি উপজেলার নদী ও খাল তীরবর্তী বাজারগুলোতে স্থাপিত গুদামে ধান-চাল নষ্ট হয়েছে সবচেয়ে বেশি।

জানতে চাইলে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক জিএম ফারুক হোসেন পাটওয়ারী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বন্যার পানিতে চট্টগ্রাম অঞ্চলের সরকারি খাদ্যগুদামগুলো সুরক্ষিত ছিল। বিশেষ করে ৭ জুলাইয়ের অতিবৃষ্টির পর দ্রুত সময়ের মধ্যে গুদামগুলোর (ছোট-বড় মিলিয়ে ৪০টি গুদাম) প্রবেশমুখের কয়েক ফুট অংশ ইট-সিমেন্টের মাধ্যমে অস্থায়ীভাবে সিলগালা করা হয়। তাছাড়া সরকারি খাদ্যগুদামগুলো স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা উঁচু স্থানে নির্মাণ করা ছিল। তাই বন্যা ও জলাবদ্ধতা হওয়ার আগেই প্রবেশ মুখে প্রতিবন্ধকতা দেয়ায় বড় ধরনের ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া গেছে। তবে প্রত্যন্ত উপজেলা ও নিচু এলাকায় বন্যা ও জলাবদ্ধতায় বেসরকারি গুদামে পানি ঢুকে ধান-চাল নষ্ট হওয়ার কথা শুনেছি।’

চট্টগ্রামের চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ, পাহাড়তলী পাইকারি বাজারের বিভিন্ন গুদাম মালিক, আড়তদারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্ষার শুরুতে ব্যবসায়ীরা আড়ত ও গুদামে পণ্যের সুরক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়। একসময় চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতায় ধান-চালের বড় ক্ষতি হতো। বর্তমানে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের অধীনে কর্ণর্ফুলী নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে স্লুইস গেট, রেগুলেটর বসানোর ফলে পানি দীর্ঘসময় আটকে ছিল না। এ কারণে নদীতীরবর্তী খাতুনগঞ্জ-চাক্তাই এলাকায় পানি প্রবেশ করে ধান-চালের ক্ষতি হয়নি। তবে উপজেলা ও পার্বত্য এলাকার বাজারগুলোতে বেসরকারি পর্যায়ের গুদামে পানি ঢুকে ধান-চাল নষ্ট হওয়ায় সার্বিকভাবে দেশের চালের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

কক্সবাজারের মেসার্স রনি এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী জহির উদ্দিন সাগর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমার আড়তে রাখা চালের একটি বড় অংশই পানিতে ডুবে যায়। গুদামে অনেক চাল থাকায় পানি প্রবেশের পর কিছুই করার ছিল না। এখন বৃষ্টি ও বন্যার পানি কমে যাওয়ায় পানিতে ডুবে যাওয়া চাল সরিয়ে নেয়া হয়েছে।’ ভেজা চাল শুকিয়ে কোনো রকমে লোকসান কমানোর চেষ্টা করা হলেও তাতে কাজ হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন তিনি।

পার্বত্য জেলাগুলোসংলগ্ন চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় ধান-চালের মিল ও গুদাম রয়েছে। বিশেষ করে রাঙ্গুনিয়া উপজেলার মরিয়মনগর, চন্দ্রঘোনা বাজার, রোয়াজার হাট, ইছাখালী, শান্তিরহাট, ইসলামপুর, রাণীরহাট, ধামাইরহাটসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে পার্বত্য এলাকা থেকে আসা ধানের জন্য মিল ও গুদাম রয়েছে। টানা বৃষ্টিতে এসব এলাকার নিচু স্থানে পানি প্রবেশ করে মজুদ ধান নষ্ট হয়েছে। আবার পার্বত্য জেলাগুলোর দুর্গম ছোট-বড় হাটবাজারেও সাম্প্রতিক বন্যায় গুদামে পানি প্রবেশ করে ধান-চাল নষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে ফারুয়া বাজার, বান্দরবানের বিভিন্ন বাজারে পাহাড়ি ঢলে বন্যা ও জলাবদ্ধতায় ধান-চাল নষ্ট হয়ে এসব এলাকায় নিত্যপণ্যটির দাম বেড়ে গেছে।

জানতে চাইলে রাঙ্গামাটির রাণীরহাট বাজারের সততা রাইস মিলের স্বত্বাধিকারী শহীদ উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গুমাইবিলসহ রাঙ্গামাটির সমতলে উৎপাদিত ধান সংগ্রহ করা হলেও বিক্রির সুযোগ পাওয়া যায়নি। এ মৌসুমে আমাদের গুদামে নিজস্ব ধান ছাড়াও ব্যাপারিদের ধানও মজুদ রাখা হয়। বৃষ্টিতে পানি জমে বেশকিছু ধান নষ্ট হয়েছে।’ রোদে শুকালেও ধানের মান কমে বড় ধরনের লোকসান হবে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।

পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমদানি বন্ধের পর কয়েক মাস ধরে দেশের বাজারে ধান-চালের বাজার ঊর্ধ্বমুখী। নতুন মৌসুমের ধান আসায় বাজারে দাম কমে স্থিতিশীল হওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু বন্যার কারণে চট্টগ্রামসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় গুদামে ধান নষ্ট হয়েছে সবচেয়ে বেশি। যার কারণে সারা দেশে দাম না বাড়লেও স্থানীয়ভাবে চালের দাম বেড়ে গেছে। বন্যা-পরবর্তী সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ত্রাণ কার্যক্রম শেষ হলে দেশের চালের বাজার অস্থিতিশীল হওয়ার ঝুঁকি দেখছেন ব্যবসায়ীরা।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *