
চট্টগ্রাম অঞ্চলে বন্যা মিল, গুদাম ও কৃষকের মজুদ ধান-চাল ডুবে বড় ক্ষতি
জুলাই ২০, ২০২৬
উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৫ জেলায় আকস্মিক বন্যার শঙ্কা
জুলাই ২০, ২০২৬সকালের বাজার শেষের দিকে। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে মাছের সারির সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেন রিকশাচালক আবদুল করিম। বিক্রেতার কাছে একের পর এক মাছের দাম জানতে চাইলেন।
ইলিশ, রুই, কাতল—সবই তার নাগালের বাইরে। শেষ ভরসা ছিল পাঙাশ। কিন্তু ‘সস্তা’র সে মাছটিরও দাম শুনে থমকে গেলেন। বছর দুই আগেও যেটি ১৫০-১৮০ টাকার মধ্যে কিনতে পারতেন, সেটিই এখন ২৪০-২৫০ টাকা কেজি। শেষ পর্যন্ত ছোট একটি পাঙাশ নিয়েই বাজার ছাড়লেন তিনি।
কেবল আবদুল করিমই নন, মূল্যস্ফীতির দীর্ঘস্থায়ী চাপে থাকা দেশের কোটি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য একই বাস্তবতা। একসময় ‘গরিবের মাছ’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া পাঙাশ এখন আর ততটা সস্তা নয়। দুই বছরের ব্যবধানে খুচরা বাজারে এ মাছের দাম কেজিপ্রতি ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। উৎপাদন ব্যয়, মাছের খাদ্য, পোনা, জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধির প্রভাব শেষ পর্যন্ত এসে পড়ছে ভোক্তার পাতে। ফলে সহজলভ্য প্রাণিজ আমিষের অন্যতম এ উৎসও ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ-২০২৫-এর তথ্যও বলছে, ২০২৪ সালের তুলনায় গত বছর বড় পাঙাশের গড় পাইকারি মূল্য কেজিপ্রতি ২৭ টাকা ৬০ পয়সা বা ১৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ বেড়ে যায়। দুই বছর আগে বড় আকারের পাঙাশের গড় পাইকারি বিক্রয়মূল্য ছিল ১৯১ টাকা ১৪ পয়সা কেজি। সেটি ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ২১৮ টাকা ৭৪ পয়সায়। ছোট আকারের পাঙাশের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। এর প্রভাব খুচরা বাজারে আরো বেশি। চলতি বছরেও সে ধারাবাহিকতায় বেড়েছে পাঙাশের দাম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে আগামী দিনগুলোয় সাশ্রয়ী আমিষের সংকট আরো প্রকট হতে পারে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার, নতুন বাজার, বাড্ডা কাঁচাবাজার ও বসুমতি বাজারে গত কয়েকদিন ঘুরে দেখা যায়, খুচরায় ২২০-৩৫০ টাকা কেজিতে পাঙাশ বিক্রি হচ্ছে। বাজারসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাছের উৎপাদন ব্যয় ও বিপণন ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকায় এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাজারে। মাছের খাদ্য, পোনা, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, শ্রমিক মজুরি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যয় বাড়ার কারণে খামার থেকে আড়ত এবং আড়ত থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত প্রতিটি স্তরেই দাম বাড়ছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, পাঙাশ এমন একটি মাছ, যা তুলনামূলক কম দামে সহজলভ্য হওয়ায় নিম্ন আয়ের মানুষের প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে সে সুবিধা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়ার অর্থ হলো খুচরা বাজারে এর প্রভাব আরো বেশি পড়বে। কারণ সেখানে পরিবহন, সংরক্ষণ, বাজারজাত ও বিক্রয় ব্যয়ও যুক্ত হয়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের হিট প্রজেক্টের রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট ড. আকতার হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে এক-দেড় কেজি ওজনের একটি পাঙাশ তৈরি করতে করতে ৯০-১১০ টাকা খরচ হয়। দুই বছর আগে তা আরো কম ছিল। ফিড, মেডিসিন ও পুকুর লিজের ব্যয় বেড়েছে। পুরনো পুকুরে রোগবালাই বেড়েছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। খুচরা বাজারে মাছের দাম বাড়ার পেছনে উৎপাদন ব্যয় বড় প্রভাব রেখেছে।’
শুধু পাঙাশ নয়, মধ্যবিত্তের কাছে জনপ্রিয় তেলাপিয়া মাছের দামও একই সময়ে বেড়েছে। ২০২৪ সালে পাইকারি বাজারে কেজিপ্রতি তেলাপিয়ার গড় দাম ছিল ১৬০ টাকা। গত বছর তা বেড়ে হয় ১৬৭ টাকা ৭৬ পয়সা। একইভাবে সিলভার কার্পের দামও এক বছরের ব্যবধানে পাইকারি বাজারে কেজিতে বেড়েছে ৯ টাকা ১২ পয়সা। অর্থাৎ নিম্ন আয়ের ভোক্তার জন্য সাশ্রয়ী আমিষের বিকল্প ক্রমেই সীমিত হয়ে পড়ছে।
মৎস্য খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, গত কয়েক বছরে মাছ উৎপাদনের প্রধান উপকরণগুলোর দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। মৎস্যখাদ্যের কাঁচামাল আমদানিনির্ভর হওয়ায় ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি এবং আমদানি ব্যয় বাড়ার প্রভাব সরাসরি উৎপাদন খরচে পড়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য সমন্বয়, শ্রম ব্যয় বৃদ্ধি এবং পরিবহন খরচও উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে উৎপাদকদের জন্য আগের দামে মাছ বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ঝিনাইদহের তরুণ উদ্যোক্তা লিখন আহমেদ। তিনি মৎস্য উৎপাদন ও বিভিন্ন জায়গা থেকে কিনে বিক্রি করেন। এ বিষয়ে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দুই বছরের ব্যবধানে পাইকারি বাজারেই বড় পরিবর্তন হয়েছে। আগে নিজের পুকুরে পাঙাশ পাইকারিতে প্রতি কেজি ১১০-১৫০ টাকা হলেই অনেক ছিল। সেখানে বড় লাভ হতো। কিন্তু এখন দাম বাড়ার পরও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় লাভ কম।’
তিনি জানান, গতকাল তিনি যেসব আড়তে মাছ বিক্রি করেন সেখানে এক-দেড় কেজি পাঙাশের পাইকারি দাম ছিল ১৪৫-১৫২ টাকা। দেড়-আড়াই কেজির পাঙাশ বিক্রি হয় ১৬২-১৭০ টাকায়। ক্ষেত্র বিশেষে ১৮০ টাকা পর্যন্ত দাম ছিল। আর আড়াই-তিন কেজি পাঙাশের পাইকারি দাম ২২০ টাকা পর্যন্ত ছিল।
পুষ্টিবিদরা বলছেন, আমিষজাতীয় খাদ্য শরীরের বৃদ্ধি, পেশি গঠন ও মেরামত এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। পাঙাশ মাছের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকলে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো মাছ কেনার পরিমাণ কমিয়ে দিতে বাধ্য হতে পারে। এতে তাদের খাদ্যতালিকায় প্রোটিন গ্রহণের পরিমাণও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউট্রিশন অ্যান্ড ডায়েটেটিকস বিভাগের প্রধান ডা. নিশাত শারমিন নিশি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পাঙাশ বা যেকোনো ধরনের মাছ প্রোটিনের বড় উৎস। প্রোটিন শরীরের বৃদ্ধি ও গঠনে সহায়তা করে। শরীরের ক্ষত সারায়, পেশি শক্তিশালী রাখে, হরমোন তৈরি, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানো, পুষ্টির চাহিদা মেটানো, দাঁত ও হাড় মজবুত করা, রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি এবং শরীরের শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে। দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় নিম্ন আয়ের মানুষের প্রোটিনের অন্যতম উৎস পাঙাশ। পাঙাশের চর্বিতে যথেষ্ট পরিমাণ প্রোটিন পাওয়া যায়। এছাড়া ফসফরাস ও পটাশিয়াম পাওয়া যায়। এর ফ্যাটও গুড ফ্যাট। ফলে এ মাছের দাম বেড়ে গেলে মানুষের প্রোটিন গ্রহণ কমে যাবে, যেটি স্বাস্থ্যে বড় প্রভাব ফেলবে।’


