ম্যাচ শেষে কোচ ও অধিনায়ক ইরানের সঙ্গে ‘অন্যায়’ করা হয়েছে, দুর্ভাগ্যও ছিল
জুন ২৮, ২০২৬
ব্রাজিলকে হারাতে চায় ‘এশিয়ার ব্রাজিল’
জুন ২৮, ২০২৬
ম্যাচ শেষে কোচ ও অধিনায়ক ইরানের সঙ্গে ‘অন্যায়’ করা হয়েছে, দুর্ভাগ্যও ছিল
জুন ২৮, ২০২৬
ব্রাজিলকে হারাতে চায় ‘এশিয়ার ব্রাজিল’
জুন ২৮, ২০২৬

নকআউটের স্নায়ুযুদ্ধ আজ থেকে শুরু

গ্রুপ পর্বের ‘মধুচন্দ্রিমা’ ফুরিয়েছে। ফুটবলের সবুজ গালিচায় এখন আর ভুলের কোনো ক্ষমা নেই। শুরু হচ্ছে এমন এক নির্মম প্রহর, যেখানে ঘড়ির প্রতিটি কাঁটার শব্দে মিশে থাকবে বুকের ধুকপুকানি।

৪৮ দলের বিশ্বকাপ গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে এসেছে সবচেয়ে নির্মম অধ্যায়ে। জিতলেই অমরত্বের পথে এক ধাপ, হারলে বাড়ির পথ। নব্বই কিংবা ১২০ মিনিটের লড়াই শেষে টাইব্রেকার—যেভাবেই হোক, ফয়সালা হবেই। উৎসবের আবির মেখে থাকা মাঠগুলো পরিণত হতে যাচ্ছে গ্ল্যাডিয়েটরদের আখড়ায়। আজ থেকে শুরু হচ্ছে নকআউট পর্ব। নকআউটে পা রাখার পর হিসাবনিকাশের খাতাটা বড্ড নিষ্ঠুর হয়ে যায়। অতীত পরিসংখ্যান কেবলই সান্ত্বনা। গ্যালারিতে থাকা হাজারো দর্শকের গগনবিদারী চিৎকার, সারা বিশ্বের কোটি কোটি চোখের নির্নিমেষ দৃষ্টি, আর নিজ দেশের মানুষের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে এক অকল্পনীয় চাপের পাহাড় মাথায় নিয়ে মাঠে নামতে হয় ফুটবলারদের। বলা যায়, বিশ্বকাপ তার ভয়ংকর সুন্দর অবয়ব নিয়ে হাজির হচ্ছে নকআউটের মহাকাব্যিক স্নায়ুযুদ্ধে।

আজ মধ্যরাত ১টায় নকআউটের পর্দা উঠছে দক্ষিণ আফ্রিকা ও কানাডার ম্যাচ দিয়ে। কাগজে-কলমে হয়তো এটি সবচেয়ে বড় আকর্ষণের ম্যাচ নয়, কিন্তু টুর্নামেন্টের চরিত্র বোঝার জন্য এর চেয়ে ভালো সূচনা আর হতে পারে না। গ্রুপ ‘এ’-তে প্রথম ম্যাচে স্বাগতিক মেক্সিকোর কাছে হারার পর অনেকেই দক্ষিণ আফ্রিকাকে বিদায়ী তালিকায় ধরে নিয়েছিলেন। কিন্তু ‘বাফানা বাফানা’ মাটি কামড়ে লড়ে গেছে। চেকিয়ার বিপক্ষে ড্র এবং শেষ ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়াকে ১-০ গোলে হারিয়ে রানার্সআপ হয়ে শেষ ৩২-এ উঠে এসেছে তারা। শারীরিক ফুটবল, রক্ষণে শৃঙ্খলা আর দ্রুত পাল্টা আক্রমণই তাদের হাতিয়ার।

অন্যদিকে কানাডা এসেছে একেবারে ভিন্ন পথ ধরে। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার সঙ্গে ড্রয়ের পর কাতারের জালে ছয় গোল দিয়ে পুরো টুর্নামেন্টকে চমকে দিয়েছে জেসি মার্শের দল। শেষ ম্যাচে সুইজারল্যান্ডের কাছে হারলেও দ্বিতীয় স্থান ধরে রাখতে সমস্যা হয়নি। আলফনসো ডেভিস, জোনাথন ডেভিডদের পায়ে গতির আগুন, উচ্চচাপের প্রেসিংয়ে প্রতিপক্ষকে দম নিতে না দেয়া—এটাই কানাডার ফুটবল। সবচেয়ে বড় কথা, দুই দলের কেউই বিশ্বকাপের নকআউটে কখনো জয় পায়নি। অর্থাৎ প্রথম দিনই নিশ্চিতভাবে ইতিহাস লিখবে একটি দল।

নকআউটের দ্বিতীয় দিনেই মঞ্চে উঠছে পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। প্রতিপক্ষ জাপান। একদিকে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে ভারী জার্সিগুলোর একটি, অন্যদিকে নিঃশব্দে ধারালো হয়ে ওঠা এশিয়ার সামুরাই। কার্লো আনচেলত্তির ব্রাজিলও যেন গ্রুপ পর্বকে ব্যবহার করেছে নিজেদের সুর খুঁজে পাওয়ার অভিযানে। মরক্কোর বিপক্ষে ড্র দিয়ে শুরু, এরপর হাইতি ও স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ছন্দে ফেরা। প্রতিটি ম্যাচে যেন আরো নিখুঁত হয়েছে তাদের পাসের জাল, আরো ধারালো হয়েছে আক্রমণ। কিন্তু জাপান প্রতিপক্ষকে বল দিয়ে নয়, সময় দিয়ে শ্বাসরোধ করতে জানে। বলের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতেও তাদের দ্বিধা নেই; বরং অপেক্ষা করে থাকে একটি ভুলের, তারপর বজ্রপাতের মতো নেমে আসে পাল্টা আক্রমণ। গত বছরের প্রীতি ম্যাচে ব্রাজিলকে হারানোর স্মৃতিও তাদের বাড়তি বিশ্বাস জোগাবে। তাই এটি শুধু ব্রাজিলের আক্রমণ বনাম জাপানের রক্ষণ নয়; এটি শিল্পের সঙ্গে শৃঙ্খলার, ছন্দের সঙ্গে ধৈর্যের, আর সাম্বার সঙ্গে সামুরাইয়ের এক বহুল প্রতীক্ষিত দ্বৈরথ।

নকআউটের দ্বৈরথে জার্মান যন্ত্র নামবে প্যারাগুয়ের বিরুদ্ধে। জুলিয়ান নাগেলসম্যানের জার্মান শিবির যেন এক খামখেয়ালি কালবৈশাখী। এক মুহূর্তে তারা প্রতিপক্ষের ওপর সাত গোলের নির্মম প্রলয় নামিয়ে আনছে, তো পরক্ষণেই নিজেদের দুর্গের নড়বড়ে রূপটাও উন্মোচিত করে ফেলছে। অন্যদিকে প্যারাগুয়ে টুর্নামেন্টের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিধ্বস্ত হয়ে খাদের কিনারায় ছিটকে পড়েছিল, তারাই আবার তুরস্ককে বধ করে এবং অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে চোখে চোখ রেখে লড়াই করে বীরদর্পে ফিরে এসেছে। এমন দলগুলোর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—তাদের কাঁধে প্রত্যাশার পাহাড় থাকে না। তাই তারা খেলতে নামে ভয়হীন, আর সেই ভয়হীনতাই অনেক সময় পরাশক্তির সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হয়ে ওঠে।

নেদারল্যান্ডস-মরক্কো ম্যাচে শুধু দুই দলের লড়াই নয়, মুখোমুখি হবে দুই ফুটবল-দর্শন। একদিকে ডাচদের পরিচিত পজিশনাল ফুটবল। বল পায়ে রেখে প্রতিপক্ষকে ধীরে ধীরে জালে জড়ানোর শিল্প। অন্যদিকে মরক্কো ধৈর্যের দেয়াল তুলে দাঁড়িয়ে থাকা, তারপর সামান্য ফাঁক দেখলেই মরু ঝড়ের মতো পাল্টা আঘাত। ২০২২ বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল পর্যন্ত এই দর্শন নিয়েই গিয়েছিল মরক্কো। পর্তুগাল, স্পেন, বেলজিয়ামের মতো দলগুলো তাদের দেয়ালে মাথা ঠুকে বাড়ি ফিরেছে ব্যর্থ হয়ে। নেদারল্যান্ডস গ্রুপ পর্বে ধারাবাহিক ছিল, তাদের আক্রমণের ছন্দ ছিল, কিন্তু মরক্কোর বিপক্ষে সেই ছন্দ ধরে রাখাটাই হবে আসল পরীক্ষা।

৩০ জুন ডালাসে মুখোমুখি হবে আইভরি কোস্ট ও নরওয়ে। ম্যাচটিকে বলা যায়, মুখোমুখি আফ্রিকান শক্তির বিস্ফোরণ আর নর্ডিক শীতলতার হিসাবি ফুটবল। একদিকে আর্লিং হালান্ড ও মার্টিন ওডেগার্ডের নরওয়ে, যারা ১৯৯৮ সালের পর আবার বিশ্বকাপের নকআউট মঞ্চে ফিরেছে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর পাওয়া এ সুযোগ তাদের কাছে শুধু একটি ম্যাচ নয়, বরং হারানো প্রজন্মের স্বপ্ন ফেরত পাওয়ার মুহূর্ত। কিন্তু ওপারে দাঁড়িয়ে আছে আফ্রিকান চ্যাম্পিয়ন আইভরি কোস্ট। এর আগে তিনবার বিশ্বকাপে খেলেও গ্রুপ পর্ব পেরোতে পারেনি তারা। এবার সেই পুরনো দেয়াল ভেঙে শেষ ৩২-এ উঠে এসেছে। গতিময় উইং, শারীরিক দাপট আর আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রবণতা নরওয়ের রক্ষণকে শুরু থেকেই অস্বস্তিতে ফেলতে পারে। হালান্ড-ওডেগার্ডরা হয়তো নরওয়ের আক্রমণের সুর বাঁধবেন, কিন্তু ভাইকিংদের রক্ষণভাগকে সেদিন আফ্রিকান গতির যে ভয়াবহ সুনামির মুখে পড়তে হবে, তা নিশ্চিতভাবেই হতে যাচ্ছে নকআউটের অন্যতম কঠিন এক অগ্নিপরীক্ষা।

একই দিনে মেটলাইফ স্টেডিয়ামে নামবে ফ্রান্স, যারা কিনা বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ধারালো, সবচেয়ে ভয়ংকর আক্রমণভাগের দল। প্রতিপক্ষ সুইডেন। এমবাপ্পের গতি, দেম্বেলের ড্রিবলিং, মাইকেল ওলিসের নিখুঁত সৃজনশীলতা মিলিয়ে ফরাসি আক্রমণভাগ এখন প্রতিপক্ষ রক্ষণের জন্য দুঃস্বপ্ন। তারা শুধু গোল করে না; আক্রমণের ঢেউ তুলতে তুলতে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত ও অসহায় করে ফেলে। ঠিক তার বিপরীতে সুইডেন সৌন্দর্যের ফুটবল খেলতে নামবে না; নামবে ম্যাচটিকে কঠিন, ভারী ও শারীরিক করে তুলতে। সেট-পিস, বাতাসে লড়াই, শরীরী চাপ দিয়েই ফ্রান্সের ছন্দ ভাঙার চেষ্টা করবে তারা।

১ জুলাই স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের সামনে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় তুলনামূলক সহজ প্রতিপক্ষ পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু বসনিয়া এসেছে সেরা তৃতীয় দলের একটি হয়ে। এছাড়া ৩ জুলাই অস্ট্রেলিয়া ও মিসরের লড়াই হতে পারে সবচেয়ে কৌশলনির্ভর ম্যাচগুলোর একটি। দুই দলই রক্ষণ গুছিয়ে পাল্টা আক্রমণে বিশ্বাসী।

শেষ ৩২-এর সবচেয়ে আবেগঘন লড়াই সম্ভবত মিয়ামিতে আর্জেন্টিনা বনাম কেপ ভার্দে। একদিকে বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন, মেসির আলোয় হাঁটা এক অভিজ্ঞ মহীরুহ; অন্যদিকে প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে এসেই পৃথিবীকে চমকে দেয়া আটলান্টিকের ছোট্ট দ্বীপদেশ। স্পেন ও উরুগুয়ের মতো দুই সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন থাকা গ্রুপ থেকে অপরাজিত উঠে এসেছে কেপ ভার্দে। কিন্তু রূপকথার পরের পাতাতেই অপেক্ষা করছে সবচেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষ দুই লিওনেলের আর্জেন্টিনা। কাগজে-কলমে লড়াই অসম। আর্জেন্টিনার পক্ষে ইতিহাস, অভিজ্ঞতা, তারকা, ট্রফির ভার। কেপ ভার্দের পক্ষে আছে ভয়হীনতা, শৃঙ্খলা আর হারানোর কিছু না থাকার মুক্তি। নকআউটের নিষ্ঠুর মঞ্চে এখন প্রশ্ন একটাই—রূপকথা কি আরেক পৃষ্ঠা বাড়াবে, নাকি মেসির আর্জেন্টিনা সেটির শেষ লাইন টেনে দেবে?

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *