
এশিয়ার চালের বাজার ভারতের রফতানি মূল্য কমেছে বাংলাদেশে কর হ্রাসের প্রস্তাব
জুন ১৫, ২০২৬
হিউস্টনে ফিরল বেলো হরিজন্তে
জুন ১৫, ২০২৬বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা একটি মামলায় সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে দুবাইয়ে গ্রেফতার করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পুলিশ।
ইন্টারপোলের সহায়তায় এ গ্রেফতার কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে। সাবেক এ পুলিশপ্রধানকে ধরতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস জারি করা হয়েছিল। ইন্টারপোলের সহযোগিতায় দুবাই পুলিশের মাধ্যমে ১২ জুন তাকে গ্রেফতার করা হয় বলে গতকাল সংসদে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। শিগগিরই তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে বলেও জানান তিনি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। অনুসন্ধান চলাকালে ২০২৪ সালের ৪ মে সপরিবারে দেশ ছাড়েন তিনি। তার বিরুদ্ধে বিচার-বহির্ভূত হত্যা, গুম, খুন, দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগের তদন্ত চলমান রয়েছে। এরই মধ্যে গত ১০ এপ্রিল বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ‘রেড নোটিস’ জারি করে ইন্টারপোল।
জানা গেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই শহরের ডেইরা এলাকার রিগাত আল বুতিনে ‘রয়্যাল কনকর্ড হোটেল অ্যান্ড সুইট’ নামের বেনজীর আহমেদের মালিকানাধীন একটি তারকা মানের হোটেল রয়েছে। এছাড়া দুবাইতে বেনজীর আহমেদের আরো কিছু ব্যবসা রয়েছে। শুক্রবার রাতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দেখাশোনা করার জন্য তুরস্ক থেকে দুবাই যান তিনি। এ সময় দুবাই বিমানবন্দরে এআই ক্যামেরা বেনজীর আহমেদের চেহারা শনাক্ত করে সে বার্তা আমিরাত সিটি পুলিশের কাছে পাঠায়। পরে আমিরাত সিটি পুলিশ বিমানবন্দর এলাকা থেকে বেনজীর আহমেদকে গ্রেফতার করে। মূলত বাংলাদেশের সাবেক এ পুলিশপ্রধানের বিরুদ্ধে রেড নোটিস জারি হওয়ার পর দুবাইয়ের বিভিন্ন বিমানবন্দর এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় থানার এআই ক্যামেরায় বেনজীরের বিস্তারিত তথ্য সংযোজন করা হয়।
বেনজীর আহমেদ দুবাইয়ে গ্রেফতার হলেও দেশে ফিরিয়ে আনা নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে। ২০১৪ সালের ২৭ অক্টোবর দুবাইয়ে বাংলাদেশ ও ইউএইর মধ্যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সই হয়। যার মধ্যে দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি স্থানান্তর চুক্তি এবং বন্দি/অপরাধী প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত চুক্তিও রয়েছে। এ চুক্তির আওতায় যদি কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশ বা ইউএইতে গুরুতর অপরাধ করে অন্য দেশে পালিয়ে যান, তবে নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাকে ফেরত চাওয়া যেতে পারে। তবে চুক্তি থাকলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে হস্তান্তর করা হয় না; সংশ্লিষ্ট দেশের আদালত, আইন ও চুক্তির শর্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচিত হয়।
প্রত্যর্পণের আইনি ধাপগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, পলাতক আসামি প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে সাধারণত পাঁচটি মূল ধাপ পার হতে হয়। এর মধ্যে প্রথম ধাপ আনুষ্ঠানিক অনুরোধ। বাংলাদেশ সরকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারকে বেনজীরকে হস্তান্তরের জন্য আনুষ্ঠানিক চিঠি ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র পাঠাবে। দ্বিতীয় ধাপে আদালতের পর্যালোচনা। আমিরাতের বিচার বিভাগ বাংলাদেশের পাঠানো অনুরোধ ও অভিযোগের নথিগুলো আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করবে। তৃতীয় ধাপে ‘দ্বৈত অপরাধ’ যাচাই। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, যে অপরাধের জন্য প্রত্যর্পণ চাওয়া হচ্ছে, তা উভয় দেশেই অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে হবে। যেহেতু দুর্নীতি ও মানি লন্ডারিং সংযুক্ত আরব আমিরাতেও গুরুতর অপরাধ, তাই এ শর্তটি সহজেই পূরণ হতে পারে। চতুর্থ ধাপ আসামির আপত্তির সুযোগ। বেনজীর আহমেদ নিজে ইউএই আদালতে প্রত্যর্পণ আদেশের বিরুদ্ধে আপত্তি বা আপিল করতে পারবেন, যা পুরো প্রক্রিয়া দীর্ঘ করতে পারে। সবশেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও হস্তান্তর। আদালতের সবুজ সংকেত পাওয়ার পর ইউএই সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে আসামিকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করবে।
এদিকে দুবাইয়ে গ্রেফতার বেনজীরকে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে দুদক। গতকাল বিকালে সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দুদকের উপপরিচালক (মিডিয়া) আকতারুল ইসলাম বলেন, ‘দুদকের করা মামলায় সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে ইন্টারপোলের সহায়তায় দুবাইয়ে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে দুদক মোট ছয়টি মামলা করেছে। এর মধ্যে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের একটি মামলায় এরই মধ্যে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হয়েছে এবং মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন। বাকি পাঁচটি মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে। বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দায়ের করা দুটি মামলার ভিত্তিতে দুদক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইন্টারপোলের কাছে রেড নোটিস জারির আবেদন করেছিল। এর একটি পাসপোর্ট জালিয়াতির মামলা এবং অন্যটি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলা। তদন্ত কর্মকর্তা আদালতের মাধ্যমে রেড নোটিস জারির আবেদন করেন। আদালতের আদেশ পাওয়ার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইন্টারপোলে আবেদন পাঠানো হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ইন্টারপোল তাকে গ্রেফতার করে। বিদেশে কাউকে গ্রেফতারের ক্ষেত্রে দুদক সরাসরি কোনো ভূমিকা পালন করে না বলেও জানান তিনি।
বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইজিপি ছিলেন। এর আগে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার ও র্যাবের মহাপরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে র্যাবের সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ওই সময় র্যাবের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের পাশাপাশি এ বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তারাও নিষেধাজ্ঞার আওতায় ছিলেন। যার মধ্যে বেনজীর আহমেদের নামও ছিল। যুক্তরাষ্ট্র যখন নিষেধাজ্ঞা দেয়, তখন আইজিপির দায়িত্বে ছিলেন বেনজীর আহমেদ।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, দুদক বেনজীর ও তার পরিবারের সদস্যদের সম্পদের খোঁজ নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করার পরই তিনি অন্তত ২৫টি ব্যাংক হিসাব থেকে প্রায় ১০ কোটি টাকা সরিয়ে ফেলেন। দুদকের অনুসন্ধান দলও এ তথ্যের সত্যতা পেয়েছে। এছাড়া বেনজীর পরিবারের পঞ্চগড়ে বিশাল চা বাগান থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে দুদক। শিগগিরই এ সম্পত্তি ক্রোক করতে আদালতে আবেদন করা হবে। নতুন করে খোঁজ পাওয়া অন্য সম্পদের মধ্যে রয়েছে পার্বত্য এলাকা বান্দরবানের থানচিতে রিসোর্ট, গাজীপুরে আরেকটি রিসোর্ট, গাজীপুরে একটি টেক্সটাইল কারখানা ও তিন-চারটি লাইটারেজ জাহাজ। জাহাজগুলো দেশের একটি নামি কোম্পানির ব্যানারে চলাচল করে। বেনামে থাকলেও এসব জাহাজের মালিকানা বেনজীর পরিবারের। এসব তথ্য নিশ্চিত হতে বিভিন্ন সংস্থার কাছে চিঠি দিয়ে দলিল সংগ্রহ করছে দুদক। এছাড়া অভিযোগ রয়েছে দুবাইয়ের অভিজাত এলাকা হিসেবে খ্যাত পাম জুমেরা ও মেরিনা এলাকায় একাধিক অ্যাপার্টমেন্ট আছে বেনজীর পরিবারের।
বেনজীর আহমেদের গ্রেফতারকে বাংলাদেশ পুলিশের একটি ‘ঐতিহাসিক সাফল্য’ হিসেবে অভিহিত করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। গতকাল জাতীয় সংসদে তিনি বলেন, ‘এ ঘটনা প্রমাণ করে, অপরাধী যত শক্তিশালী হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। এটি দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফেডারেল ক্রিমিনাল পুলিশ ও ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) আবুধাবি থেকে পাঠানো একটি ই-মেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে এ গ্রেফতারের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। বেনজীর আহমেদ বর্তমানে সেখানে পুলিশি হেফাজতে আছেন।


