
সব পক্ষকে সংযত থাকার আহ্বান চীনের
এপ্রিল ১৪, ২০২৬
যুগ যুগ ধরে গ্রামীণ ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রেখেছে মুন্সিগঞ্জের মিষ্টি
এপ্রিল ১৫, ২০২৬অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বা ক্রুড অয়েলের অভাবে দেশের একমাত্র সরকারি তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারিতে (ইআরএল) উৎপাদন প্রায় বন্ধের পথে। ডেড স্টক দিয়ে কোনোমতে চলছে উৎপাদন।
ইরান যুদ্ধের কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব থেকে ক্রুড অয়েল আমদানি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। রোববার থেকে ক্রুড অয়েল ডিস্টিলেশন ইউনিট বন্ধ হয়ে গেছে। তবে রিফাইনারির বাকি চারটি ইউনিট এখনো চালু রয়েছে। যে ইউনিটগুলো দিয়ে আংশিকভাবে পেট্রল ও অকটেন উৎপাদন এখনো অব্যাহত রয়েছে। একেবারে সীমিত হয়ে পড়েছে ডিজেল ও বিটুমিন উৎপাদন।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (অপারেশন অনুবিভাগ) মনির হোসেন চৌধুরী বণিক বার্তাকে গত রাতে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর আর কোনো ক্রুড অয়েল দেশে আসেনি। সে কারণে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে ক্রুড অয়েলের সংকট হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি এখনো বন্ধ হয়নি, ডেড স্টক দিয়ে চালু আছে।’
রিফাইনারির কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে কিনা জানতে চাইলে এ কর্মকর্তা বলেন, ‘এটাকে বন্ধ বলা যাবে না। আমরা ইআরএলের জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল নই। নতুন করে ক্রুড অয়েল আমদানির প্রক্রিয়া চলছে।’
মনির হোসেন চৌধুরী আরো বলেন, ‘আমদানি করা পরিশোধিত তেলের মাধ্যমেই আমাদের চাহিদা মেটানো হয়। দেশে জ্বালানি তেলের এখনো কোনো সংকট নেই।’
বর্তমানে ইস্টার্ন রিফাইনারির এসফল্টিক বিটুমিন প্লান্ট, ভিসব্রেকার ইউনিট, ক্যাটালাইটিক রিফর্মিং ইউনিট, কনডেনসেট ফ্র্যাকশনেশন প্লান্ট ইউনিট চালু রয়েছে। ইস্টার্ন রিফাইনারির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে জানান, আপাতত একটি (ক্রুড অয়েল ডিস্টিলেশন) ইউনিটের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। মে মাসের দিকে ক্রুড অয়েল আসার কথা আছে। তখন আবারো চালু করা সম্ভব হবে।
এর আগে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন পরিস্থিতি নিয়ে সোমবার সন্ধ্যায় বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান গণমাধ্যমকে জানান, তেল না আসার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তবে এখনো পুরোপুরি উৎপাদন বন্ধ হয়নি। কয়েক দিনের মধ্যে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ করতে হতে পারে।
ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে বছরে ১৫ লাখ টনের বেশি জ্বালানি তেল পাওয়া যায়। বিশেষ করে এ রিফাইনারিতে ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনসহ বিভিন্ন জ্বালানি পণ্য পরিশোধন করা হয়। তবে শোধনাগারটিতে ডিজেল পরিশোধন সীমিত হয়ে পড়লেও তাতে দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহে কোনো প্রভাব পড়বে না বলে জানিয়েছেন বিপিসি ও জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, শোধনাগারের জন্য মধ্যপ্রাচ্য থেকে ক্রুড অয়েল আমদানি বন্ধ হওয়ার পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করছে সরকার। যে কারণে রিফাইনারি বন্ধের সাময়িক কোনো প্রভাব দেশের জ্বালানি তেলের বাজারে পড়বে না।
ইআরএল কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শোধনাগারটি দৈনিক গড়ে সাড়ে চার হাজার টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধন করে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আমদানি কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ায় গত মাস থেকেই পরিশোধন কমিয়ে দৈনিক ৩ হাজার ৫০০ টনে নামিয়ে আনে ইআরএল। গত ৪ মার্চ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির কাছে ব্যবহারযোগ্য তেলের মজুদ ছিল দুই হাজার টন। সর্বশেষ কক্সবাজারের মহেশখালীর সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিংয়ের (এসপিএম) পাইপলাইনে জমে থাকা পাঁচ হাজার টন পরিশোধন করা হয়। এছাড়া অপরিশোধিত তেলের চারটি ট্যাংকের ডেড স্টক (মজুদ ট্যাংকের তলানিতে জমে থাকা অপরিশোধিত তেল) তুলেও পরিশোধন করা হচ্ছে।
ইআরএল সূত্রে জানা গেছে, ইআরএলের মজুদ পাঁচটি ট্যাংকের তলানিতে প্রায় ৩৩ হাজার টন ক্রুড অয়েল ডেড স্টক ছিল। আর এসপিএম থেকে পাঁচ হাজার টন তেল আনা হয়েছিল রিফাইনারিতে। তাই এখনো রিফাইনারির পুরো কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়নি।
ইস্টার্ন রিফাইনারির কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে আসা প্রসঙ্গে জানতে জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান রেজানুর রহমানকে মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। এর মধ্যে ডিজেল ও অপরিশোধিত তেলের পরিমাণ বেশি। প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আসে মধ্যপ্রাচ্যের দুই দেশ সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। এর মধ্যে সৌদি আরবের ‘অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড’ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘মারবান ক্রুড’ আমদানি করা হয়। দেশে আনার পর তা ইআরএল পরিশোধন করে ডিজেল, পেট্রল, অকটেনসহ ১৬ ধরনের জ্বালানি পণ্য উৎপাদন করে।
বিপিসির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে সর্বশেষ ক্রুড তেলের চালান এসেছিল ১৮ ফেব্রুয়ারি। এরপর যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে এশিয়ায় তেল আমদানির প্রধান নৌরুট হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যায়। এজন্য এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল বোঝাই একটি জাহাজ গত ৩ মার্চ সৌদি আরবের রাস তানুরা টার্মিনাল থেকে বাংলাদেশের পথে যাত্রা করার কথা থাকলেও তা আটকে যায়। জাহাজটির চুক্তি বাতিল করা হয়। এছাড়া আবুধাবি থেকে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেলের আরেকটি চালানও বাতিল করা হয়েছে। ফলে গত দেড় মাসে দেশে কোনো অপরিশোধিত তেলের জাহাজ প্রবেশ করেনি। যদিও মে মাসের প্রথম সপ্তাহে একটি অপরিশোধিত তেলের চালান দেশে আসার কথা রয়েছে বলে জানিয়েছেন জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা।
দেশে ইস্টার্ন রিফাইনারি বন্ধ হলেও তাৎক্ষণিকভাবে এর প্রভাব পড়ার তেমন কোনো শঙ্কা নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিপিসির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ৬২ লাখ ১৫ হাজার টন জ্বালানি তেল আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে অপরিশোধিত তেলের পরিমাণ ছিল ১৫ লাখ ১০ হাজার টন, অর্থাৎ প্রায় ২৪ শতাংশ। বাকি ৭৬ শতাংশই ছিল পরিশোধিত তেল।
ফলে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ হলেও তাৎক্ষণিকভাবে ডিজেল বা ফার্নেস অয়েলের মতো জ্বালানিতে সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা কম। কারণ এরই মধ্যে সরকার বাড়তি জ্বালানি তেলের জোগান নিশ্চিত করেছে।


