
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব ডেড স্টক দিয়ে কোনোমতে চালু আছে ইস্টার্ন রিফাইনারি
এপ্রিল ১৫, ২০২৬
খরচ কমাতে ট্রাকে যাত্রা, কুমিল্লায় খাদে পড়ে নিহত ৭
এপ্রিল ১৫, ২০২৬প্রাচীন গ্রামবাংলার অন্যতম উৎসব বাংলা নববর্ষ কিংবা পহেলা বৈশাখ।
বাংলা বছরের প্রথম দিনে ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের মেলবন্ধন দৃঢ় রাখতে উভয় পক্ষের মধ্যে মিষ্টিমুখ করানো বাংলার আবহমান ঐতিহ্য। ফলে পহেলা বৈশাখ ঘিরে প্রতি বছরই ব্যস্ততা বাড়ে সনাতন ধর্মাবলম্বী ঘোষ সম্প্রদায়ের মিষ্টি কারিগর ও ব্যবসায়ীদের। বিশেষ করে যুগ যুগ ধরে প্রাচীন বিক্রমপুর তথা মুন্সিগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী সুস্বাদু ও মুখরোচক মিষ্টির সুনাম এবং খ্যাতি ছড়িয়েছে দেশজুড়ে। সম্প্রতি ২০২৫ সালের (১৫ বৈশাখ) সিরাজদিখানের সন্তোষ পাড়ার প্রাচীন কলাপাতার পাতক্ষীর পেয়েছে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি। ফলে বাংলা নববর্ষ ঘিরে ক্রেতা আপ্যায়নের জন্য দূরদূরান্ত থেকে বিভিন্ন পাইকারি ব্যবসায়ীর আনাগোনা বৃদ্ধি পায় এ অঞ্চলে।
গ্রাম ছাড়িয়ে এসব মিষ্টি পদের দেখা এখন শহুরে জীবনেও মেলে। বিশেষ করে বৈশাখী মেলায় পাওয়া যায় এসব খাবার। নববর্ষকে ঘিরে গ্রামবাংলার লোকজ এসব খাবার প্রস্তুতিতেও ব্যস্ত সময় পার করেন কারিগররা। মুন্সিগঞ্জ সদরের মিরকাদিম এলাকায় প্রায় পাঁচ প্রজন্ম ধরে মিষ্টির ব্যবসা পরিচালনা করে আসা আদি শুকলাল মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের স্বত্বাধিকারী প্রবীণ ব্যবসায়ী সুধীর ঘোষ বলেন, ‘প্রতি বছরই ব্যবসায়ীদের হালখাতার জন্য আমরা পহেলা বৈশাখে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় একটু বেশি মিষ্টি তৈরি করে থাকি, কারণ দূরদূরান্ত থেকে বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও পাইকার ছুটে আসেন আমাদের এখানে মিষ্টি ক্রয় করতে, স্বাভাবিক সময় বিভিন্ন রকমের মিষ্টির চাহিদা থাকলেও পহেলা বৈশাখ ঘিরে সাধারণত দুই ধরনের মিষ্টির বাড়তি চাহিদা থাকে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো লাল মোহন আর খিল মোহন। তবে চিনি বালুসা ও সাদা রসগোল্লা অর্ডার করেছেন অনেক ক্রেতা।’
লাল মোহন-খিল মোহন
13
লাল মোহন ও খিল মোহন দুটিই খেতে মিষ্টি। তবে আকৃতির দিক থেকে এগুলোর মধ্যে পার্থক্য নেই। বাঙালির প্রিয় লাল মোহন তৈরি হয় খাঁটি দুধের ছানা ও চিনি দিয়ে তেলে ভেজে। খুব ঘন করে চিনি জ্বাল দিয়ে এরপর ভিজিয়ে রাখা হয় মিষ্টি লাল মোহন। এছাড়া সাদা রঙের গোল আকৃতির হয় খিল মোহন আর আকারে অনেক ছোট হয়। এটিও চিনি ও খাঁটি দুধের ছানা দিয়ে তৈরি। তবে এর ভেতরে থাকে খাঁটি দুধ দিয়ে তৈরি ক্ষীরের মাওয়া।
14
সাদা রসগোল্লা
সাদা রসগোল্লা নাম শোনেনি এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া দায়, পাতলা সিরায় ভেজা মিষ্টি এটি। সাদা রসগোল্লাও তৈরি হয় খাঁটি গরুর দুধ ছানা ও চিনি দিয়ে। প্রথমে খাঁটি গরুর দুধ থেকে তৈরি করা হয় ছানা, এরপর চিনি জ্বাল দিয়ে সিরা তৈরি করা হয়। এরপর সেই সিরায় দীর্ঘ সময় সেদ্ধ করে তৈরি করা হয় সাদা রসগোল্লা। বাংলায় অনেক পুরনো মিষ্টির মধ্যে সাদা রসগোল্লা অন্যতম।
পহেলা বৈশাখের সাদা রসগোল্লা অনেকটা ছোট গোল আকারের হয়। বাইরে দেখতে কিছুটা শক্ত মনে হলেও ভেতরটা থাকে তুলতুলে নরম। ওপর ও নিচের আকৃতি অনেকটাই কমলালেবুর মতো গোল। মূলত খাঁটি দুধের ছানা ও চিনি দিয়ে তৈরি হয় এটি। বাড়িতে সাদা রসগোল্লা তৈরি করতে প্রথমে বাজার থেকে খাঁটি দুধ কিনে নিয়ে এসে ছানা তৈরি করতে হয়। এরপর সেই ছানা শুকনো করে কিছুটা সুজি মিশিয়ে গোলাকৃতি করে কেটে নিতে হবে। এরপর পানিতে চিনি দিয়ে ফোটাতে হয়। এরপর ঠাণ্ডা করে চিনি জমাট বাঁধলে ছড়ানো পাত্রে অল্প আইসিং সুগার ছিটিয়ে সিরা ঢেলে অল্প গরম থাকা অবস্থায় রোল করে গাঢ় সিরার মাঝে ডুবিয়ে রাখতে হয়।
কয়েকবার করলেই ভেতরটা কিছুটা ফাঁপানো হয়ে যায়। এরপর বাতাসে রেখে একদম ঠাণ্ডা করে নিলেই হয়ে যাবে সুস্বাদু রসগোল্লা।
চিনির তৈরি বালুসা
বৈশাখী মেলার অন্যতম অনুষঙ্গ চিনির তৈরি বালুসা মিষ্টি, হাতি-ঘোড়া, মটক, পাখি ও নৌকা। পহেলা বৈশাখে থাকে মুন্সিগঞ্জের শত বছরের ঐতিহ্য এ খাবার। বৈশাখ উপলক্ষে জেলার বিভিন্ন স্থানে আয়োজিত মেলায় চিনির তৈরি বালুসা অথবা দানাদার মিষ্টিসহ হাতি-ঘোড়ার দেখা মিলবে। স্থানীয় সূত্রে খোঁজ নিয়ে আরো জানা গেছে, বৈশাখী আগমনি বার্তায় কারিগররা প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত খাঁটি গরুর দুধের ছানা ও চিনির তৈরি এসব খাবার প্রস্তুতে ব্যস্ত সময় পার করেন। খাবারটি তৈরি হয় শুধু ছানা ও চিনি দিয়েই। প্রথমে বিশেষভাবে তৈরি করা পাতিলে চিনি জ্বাল দেয়া হয়। চিনির সিরা তৈরি হলে গরম অবস্থায় সেটি কাঠের ফ্রেমে ঢালা হয়। এরপর দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে ছোট ছোট গোলাকৃতির মিষ্টি তৈরি করে সেগুলোতে চিনি মাখানো হয়। পরে তৈরি হয়ে যায় সুস্বাদু দানাদার বালুসা মিষ্টি।
নিমকি
বৈশাখীর মেলাজুড়ে মিষ্টি পদের পাশে থাকে নোনতা নিমকিও। যারা মিষ্টি কম পছন্দ করেন নিমকি তাদেরই বেশি পছন্দের খাবার। নিমকি মিষ্টি ও নোনতা দুই স্বাদেই পাওয়া যায়। তবে নোনতা নিমকির চাহিদা একটু বেশিই থাকে। মিষ্টির কারিগররা জানিয়েছেন, নিমকি বানাতে প্রথমে একটি পাত্রে ময়দা, কালিজিরা, জোয়ান, লবণ ও পরিমাণমতো ঘি দিয়ে ভালোভাবে মেখে নিতে হবে। সামান্য পানি দিয়ে মাখিয়ে রাখতে হবে ৩০ মিনিটের জন্য। এরপর ময়দার মণ্ড থেকে ছোট ছোট লেচি কেটে বেলে নিতে হবে। ছুরি দিয়ে ছোট ছোট নিমকি আকারে কেটে কড়াইয়ে গরম তেলে ভেজে নিলেই তৈরি হয়ে যাবে নিমকি।


