কারচুপি কারিগরদের কর্মব্যস্ততা
মার্চ ৭, ২০২৬
ইরানের কাছে ‘‌শর্তহীন আত্মসমর্পণ’ দাবি করেছেন ট্রাম্প
মার্চ ৭, ২০২৬
কারচুপি কারিগরদের কর্মব্যস্ততা
মার্চ ৭, ২০২৬
ইরানের কাছে ‘‌শর্তহীন আত্মসমর্পণ’ দাবি করেছেন ট্রাম্প
মার্চ ৭, ২০২৬

জ্বালানি সংকটে ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা পুলিশের প্যাট্রোলিং কার্যক্রম

মধ‍্যপ্রাচ্যে যুদ্ধপরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিকভাবে জ্বালানি তেলের সরবরাহ কমে গেছে। এতে দেশেও সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

জ্বালানি তেল নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশে ভোক্তা পর্যায়ে বিক্রির সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে জ্বালানি সংকটে পুলিশের প্যাট্রোলিং (টহল) কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। আর এ সুযোগে ভাসমান অপরাধীদের তৎপরতা বাড়তে পারে বলে মনে করেন অপরাধ বিশ্লেষকরা।

পুলিশ সদর দপ্তর জানায়, বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশের ১১ হাজার ৯২৩টি যানবাহন রয়েছে। এর মধ্যে মোটরসাইকেল ৬ হাজার ৪৪৫টি। পাজেরো, প্রাইভেট কার, পিকআপ, ডাবল কেবিন পিকআপ ভ্যান রয়েছে ৫ হাজার ৪৭৮টি। এসব যানবাহনের মধ্যে টহল কার্যক্রমে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ডাবল কেবিন পিকআপ ভ্যান। এর বাইরে পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার থেকে শুরু করে শীর্ষ কর্মকর্তারা ব্যবহার করেন বিভিন্ন শ্রেণীর এসইউভি ও জিপ। পুলিশের এসব যানবাহনের জন্য সরকারিভাবে জ্বালানি তেল বরাদ্দ থাকে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্যে পুলিশের বেশকিছু স্থাপনা এবং যানবাহন জনরোষের শিকার হয়। বর্তমানে বাহিনীতে প্রায় সাড়ে চার হাজার যানবাহনের ঘাটতি রয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরুর পর ইরানও প্রতিবেশী দেশগুলোতে মার্কিন ঘাঁটি এবং জ্বালানি স্থাপনা লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা শুরু করে। বন্ধ করে দেয়া হয় হরমুজ প্রণালি। সংঘাত শুরুর পর থেকে অপরিশোধিত তেলের দাম ১৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। তেহরান উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনা ও হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে হামলা চালানোয় উৎপাদনেও বিঘ্ন ঘটছে। ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র সাইপ্রাস, আজারবাইজান ও তুরস্ক পর্যন্ত পৌঁছেছে। এতে বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বড় অর্থনীতির দেশগুলো মুদ্রাস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি নিয়ে সতর্কবার্তাও দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধপরিস্থিতির প্রভাব এরই মধ্যে দেশের জ্বালানি খাতে স্পষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করেছে। মজুদ শেষ হয়ে আসার শঙ্কা থেকে রেশনিং প্রক্রিয়ায় তেল বিক্রির নির্দেশনা জারি করেছে বিপিসি।

জ্বালানি তেলের সংকটের প্রভাব শুধু দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যেই নয়, পড়তে পারে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতেও। একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, দেশের প্রতিটি থানা পুলিশ তার এলাকার স্পর্শকাতর স্থাপনাগুলো ঘিরে নিয়মিত প্যাট্রোল কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। দেখা যায় প্রতিটি থানা দৈনিক তিন থেকে চারটি করে গাড়ি এ ধরনের কার্যক্রমে যুক্ত থাকে। জ্বালানি তেলের সংকট তৈরি হলে এ কার্যক্রমে প্রভাব পড়তে পরে। প্যাট্রোলিং ডিউটি কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই অপরাধীরা অধিক সক্রিয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ভাসমান অপরাধীরা সুযোগ নেয়। সড়ক-মহাসড়কে ডাকাতিসহ নানা ধরনের অপরাধ বৃদ্ধি পেতে পারে। ঈদ যাত্রায়ও এর প্রভাব পড়তে পারে।

অপরাধ বিশ্লেষকরা জানান, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর পুলিশের মনোবল ভেঙে পড়ে। তাদের দৃশ্যমানতাও আগের তুলনায় অনেক বেশি কমে যায়। এ সুযোগে নানা শ্রেণীর অপরাধীরা সক্রিয় হতে থাকে। পরবর্তী সময়ে বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণের মধ্য দিয়ে পুলিশকে কিছুটা সক্রিয় করা গেলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি সংকটে পুলিশের টহল কার্যক্রম কমে এলে বড় ধরনের বিপর্যয় তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, অপহরণের মতো অপরাধগুলো অধিকমাত্রায় বেড়ে যেতে পারে। এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের নিয়মিত টহল কার্যক্রমের কোনো বিকল্প নেই। অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এ সময়ে ভাসমান অপরাধী নিয়ন্ত্রণ পুলিশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে জ্বালানি তেলের যে মূল্য, বৈশ্বিকভাবেই তার একটি পরিবর্তন আসবে। পরিবর্তন মানে মূল্যটা বাড়বে। আমাদের দেশে আমরা দেখেছি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় যেসব দেশে যুদ্ধের প্রভাব অপেক্ষাকৃত কম পড়েছে, তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। কিন্তু সে সময় যুদ্ধের কথা বলে জ্বালানি তেলসহ অনেক পণ্যেরই দাম বাড়ানো হয়েছে। এখন এ যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আমাদের যে তেল আমদানি করতে হয়, সেখানে কোনো কোনো সময় অধিক মূল্য দিতে হবে। আবার যুদ্ধটা দীর্ঘ হলে তেল আমদানি করাই অসম্ভব হয়ে উঠবে। সে ক্ষেত্রে আমাদের জ্বালানি তেলের বিকল্প বাজার খুঁজতে হবে। এ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে যাতে কোনো চক্র আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে না পারে সে বিষয়ে নজর রাখতে হবে। পুলিশের টহল কার্যক্রমের জন্য যে জ্বালানির প্রয়োজন হয়, সেখানে যেন কোনো ঘাটতি তৈরি না হয়, সেদিকে নজর রাখতে হবে। রাজধানীসহ সারা দেশেই আমরা লক্ষ করছি ভাসমান অপরাধীরা এমন পরিস্থিতিতে সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করে। তাদের নিয়ন্ত্রণে পুলিশের টহল কার্যক্রমের বিকল্প নেই। এখন থেকেই পুলিশের উচিত প্রয়োজন অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুদ রাখা। তা না হলে টহল কার্যক্রম কমে আসতে পারে।’

পুলিশ সদর দপ্তর জানায়, ভাসমান অপরাধীরা দিনে দিনে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। জেলা ও মেট্রোপলিটন পুলিশ অনুসন্ধান চালিয়ে তাদের একটি তালিকা তৈরি হয়েছে। ওই তালিকা অনুযায়ী, ১ লাখ ৫ হাজারের মতো ভাসমান অপরাধী আছে সারা দেশে। এর মধ্যে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল ও রংপুরে তাদের সংখ্যা বেশি। রিকশাচালক, মিস্ত্রি, দোকান-কর্মচারী, ভাঙারি ব্যবসায়ী, ফেরিওয়ালা, হালকা যানবাহনের চালকবেশে সাধারণ মানুষের ভিড়ে মিশে যায় এসব অপরাধী। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কতজন ভাসমান অপরাধী আছে—এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি ছয় মাস আগে মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলার পুলিশ সুপার ও ইউনিটপ্রধানদের কাছে পাঠানো হয়।

জ্বালানি তেল সংকটের কারণে পুলিশের প্যাট্রোলিং কার্যক্রমে এখন পর্যন্ত কোনো প্রভাব পড়েনি বলে জানান পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পুলিশের প্যাট্রোলিংয়ের জন্য নিয়মিত জ্বালানি তেলের বরাদ্দ থাকে। এখন পর্যন্ত বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাব পুলিশের প্যাট্রোলিং কার্যক্রমে পড়েনি। পরবর্তী সময়ে সংকট দীর্ঘ হলে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *