
ফাতেমা চরিত্রে দর্শকের হৃদয়ে দীপা খন্দকার
জানুয়ারি ৫, ২০২৬
ভেনেজুয়েলা উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে সতর্ক উত্তর কোরিয়া, হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা
জানুয়ারি ৫, ২০২৬টানা তিন বছরের উচ্চ মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে চরমভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামছাড়া দামের চাপে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষ সঞ্চয় ভেঙে দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কর্মসংস্থানের সংকট ও বেকারত্বের চাপ, যা সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আরও ঘনীভূত করছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি দেখা যায় ২০২৪ সালের জুলাই মাসে। ওই মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়ায় ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে, যা আগের মাস জুনে ছিল ৯ দশমিক ৭২ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার পৌঁছে যায় ১৪ দশমিক ১০ শতাংশে, যা গত ১৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। খাদ্যশস্য, চাল, ডাল, তেল ও সবজির মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ওই সময় রাজনৈতিক অস্থিরতা, খাদ্যপণ্যের সরবরাহে বিঘ্ন, অভ্যন্তরীণ ফসলহানি এবং আমদানি নিয়ন্ত্রণের যৌথ প্রভাবে মূল্যস্ফীতির এমন উল্লম্ফন ঘটে। ২০২৪ পঞ্জিকা বছরে সার্বিক মূল্যস্ফীতির গড় হার ছিল ১০ দশমিক ৪ শতাংশ, যা অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
গত ১৫ মাসে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও তা এখনও স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে নামেনি। বর্তমানে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের বেশি রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ—শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও ভারত—এই সময়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখালেও বাংলাদেশের অগ্রগতি তুলনামূলকভাবে ধীর। ফলে প্রশ্ন উঠছে, দেশের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গৃহীত পদক্ষেপগুলো কতটা কার্যকর হচ্ছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অন্তর্বর্তী সরকার সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করেছে। পাশাপাশি কিছু পণ্যে কর ও শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে বাজারে দাম কিছুটা সহনীয় থাকে। কিন্তু বাস্তবে এসব উদ্যোগ প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি।
সরকারের রাজস্ব আহরণ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না বাড়ায় বাজেট ঘাটতি বেড়েছে। অন্যদিকে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় রাজকোষের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এই ঘাটতি মেটাতে সরকারকে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে, যা বাজারে অর্থ সরবরাহ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে।
এ ছাড়া দেশের রুগ্ণ ও খেলাপি ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মিতভাবে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। একদিকে নীতি সুদহার বাড়িয়ে অর্থ সরবরাহ সংকুচিত করার চেষ্টা, অন্যদিকে ব্যাংক ও সরকারি খাতে তারল্য জোগান—এই দ্বৈত নীতির কারণে মুদ্রানীতির কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা একে ‘বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন।
সর্বশেষ বিবিএস প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে, যা আগের মাস অক্টোবরে ছিল ৮ দশমিক ১৭ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতির হারও বেড়ে হয়েছে ৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ। খাদ্যশস্য ও শাকসবজির দাম বৃদ্ধিই এর প্রধান কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
ডিসেম্বরে নতুন আমন চাল ও শীতকালীন সবজির সরবরাহ বাড়ায় মূল্যস্ফীতি কিছুটা নমনীয় হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে প্রাক্কলিত ৬ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কঠিন বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার আশাবাদ ব্যক্ত করলেও বাস্তব চিত্র তেমন ইতিবাচক নয়।
উচ্চ মূল্যস্ফীতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থানে। উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান নতুন নিয়োগ স্থগিত রেখেছে, কোথাও কোথাও শ্রমিক ছাঁটাইও হচ্ছে। এতে বেকারত্ব বাড়ছে, আয় কমছে এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও সংকুচিত হচ্ছে। ফলে মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্ব—এই দুইয়ের যুগপৎ চাপ জনজীবনে বড় অভিঘাত সৃষ্টি করেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে একদিকে কঠোর ও সঙ্গতিপূর্ণ মুদ্রানীতি, অন্যদিকে রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার এবং ব্যাংক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা ফেরাতে না পারলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জাকির হোসেন, সম্পাদক, সিটিনিউজ সেভেন ডটকম


