
দেশের বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্ক আধুনিকায়নে ২০ কোটি ডলার ঋণ অনুমোদন এডিবির
সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬
মাসের ব্যবধানে পোলট্রি ফিডের কাঁচামালের দাম বেড়েছে ১০-২৫% আরো চাপে প্রান্তিক খামারিরা
সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের হামের সঙ্গে নিউমোনিয়ার প্রবণতা বেশি।
দেশে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে বস্তি ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুরা। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি থেকে বাদ পড়া, অপুষ্টি এবং স্বাস্থ্যসেবায় সীমিত প্রবেশাধিকারের কারণে এসব শিশুর মধ্যে হাম গুরুতর আকার ধারণ করছে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। হাসপাতাল পর্যায়ের পর্যবেক্ষণেও হামে আক্রান্ত অপুষ্ট শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন জটিলতা বেশি দেখা যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যেও বস্তি ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাসহ বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে টিকাবঞ্চিত শিশু শনাক্ত হওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরো ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গে মোট মৃত্যু দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭৬ জনে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মারা গেছে ১০১ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৯৭৫ জন। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ১৫৭ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা গেছে এবং ১১৩ জনের শরীরে হামের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে।
হামের বিস্তারের ক্ষেত্রে ঘনবসতিপূর্ণ ও অনানুষ্ঠানিক বসতিগুলোকে বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সংস্থাটির এপ্রিলের প্রতিবেদনে ঢাকার ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, কামরাঙ্গীরচর, কড়াইল, মিরপুর ও তেজগাঁওয়ের শিল্পাঞ্চলসংলগ্ন বস্তিসহ বিভিন্ন ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় হামের রোগী শনাক্ত হওয়ার তথ্য উঠে আসে। এসব এলাকায় টিকাদানের বাইরে থাকা শিশুদের শনাক্ত করে নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তুলনামূলক দুর্বল থাকায় হাম হলে নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন জটিলতার ঝুঁকি বাড়ে। তাই হাম নিয়ন্ত্রণে টিকাদানের পাশাপাশি শিশুদের পুষ্টি ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাও জরুরি।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের হামের সঙ্গে নিউমোনিয়ার প্রবণতা বেশি। এমনকি হাম সেরে যাওয়ার পরও অনেক শিশুর নিউমোনিয়া থেকে যাচ্ছে। অপুষ্টির পাশাপাশি ভিটামিন এ-এর ঘাটতিও এ ধরনের জটিলতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।’ দেশের বস্তি, চর, পাহাড়ি ও বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একটি অংশ নিয়মিত টিকাদান ও স্বাস্থ্যসেবার বাইরে থেকে যাচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চের মাঝামাঝি থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত দেশে শনাক্ত সন্দেহভাজন হামের রোগীদের ৭৯ শতাংশের বয়স ছিল পাঁচ বছরের কম। এর মধ্যে ৬৬ শতাংশের বয়স দুই বছরের কম এবং ৩৩ শতাংশের বয়স নয় মাসের কম। অর্থাৎ উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু নিয়মিত হামের টিকা গ্রহণের বয়সে পৌঁছার আগেই সংক্রমিত হয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, টিকা না পাওয়া বা আংশিক টিকাপ্রাপ্ত শিশুদের মধ্যে গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
মাঠপর্যায়ের তথ্যেও দেখা গেছে, টিকাদান থেকে বাদ পড়া শিশুদের একটি অংশ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর। জুনে প্রকাশিত ডব্লিউএইচওর এক প্রতিবেদনে গোপালগঞ্জের একটি ভাসমান পরিবারের দুই শিশুর কথা উল্লেখ করা হয়, যারা কখনো কোনো টিকা নেয়নি। জীবিকার প্রয়োজনে পরিবারটি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলাচল করায় তারা নিয়মিত টিকাদান ব্যবস্থার বাইরে ছিল। পরবর্তী অনুসন্ধানে একই ধরনের আরো অন্তত ১৬টি টিকাবঞ্চিত শিশুর সন্ধান পাওয়া যায়।
এদিকে হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে অপুষ্টির উচ্চ হারও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং আইসিডিডিআর,বির যৌথ গবেষণায় মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি ৩৫৪ শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এতে পাঁচ বছরের কম বয়সী হামে আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ৬৫ শতাংশের মধ্যে মাঝারি থেকে গুরুতর অপুষ্টি পাওয়া গেছে। গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত যেসব শিশুর মৃত্যু হয়েছে, তাদের ৮২ শতাংশই জীবনের প্রথম ছয় মাস পর্যাপ্ত বা একচেটিয়া বুকের দুধ পায়নি।
এ প্রসঙ্গে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হামের তীব্রতার সঙ্গে শিশুর পুষ্টির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। অপুষ্টিতে ভুগলে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায়, ফলে হাম হলে এর প্রভাবও বেশি পড়ে।’ হাসপাতাল পর্যায়ের পর্যবেক্ষণে হামে মৃত্যুবরণকারী অনেক শিশুই প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের বলে দেখা গেছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এ পরিস্থিতিতে টিকাদানের পাশাপাশি গর্ভকাল থেকেই মা ও শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।’
হাম প্রতিরোধে চলতি বছরের ৫ এপ্রিল থেকে দেশের ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে সরকার। প্রথম ধাপে ছয় মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের এ কর্মসূচির আওতায় আনা হয়। যেসব এলাকায় হামের সংক্রমণ তুলনামূলক বেশি ছিল, সেসব এলাকাকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়।
কর্মসূচির আওতাভুক্ত উপজেলাগুলো হলো বরগুনা সদর, পাবনা সদর, ঈশ্বরদী, আটঘরিয়া, বেড়া, চাঁদপুর সদর, হাইমচর, কক্সবাজারের মহেশখালী ও রামু, গাজীপুর সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, শিবগঞ্জ, ভোলাহাট, নেত্রকোনার আটপাড়া, ময়মনসিংহ সদর, ত্রিশাল, তারাকান্দা, রাজশাহীর গোদাগাড়ি, বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ ও বাকেরগঞ্জ, নওগাঁর পোরশা, যশোর সদর, নাটোর সদর, মুন্সিগঞ্জ সদর, লৌহজং, শ্রীনগর, মাদারীপুর সদর, ঢাকার নবাবগঞ্জ, ঝালকাঠির নলছিটি ও শরীয়তপুরের জাজিরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া ১১ শিশুর মধ্যে ছয়জন ঢাকা বিভাগের, দুজন চট্টগ্রাম বিভাগের এবং খুলনা, রংপুর ও সিলেট বিভাগের একজন করে। একই সময়ে ঢাকা বিভাগে হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ৩৮২ জন। এছাড়া ১০৩ জনের শরীরে হামের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে এবং ২৯৯ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।


