কুড়িগ্রামে আবারো সার বিতরণে হট্টগোল, সড়ক অবরোধ
সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬
বৈঠক শেষে সালাহউদ্দিন আহমদ ডিসেম্বরের মধ্যে আলোচনা শেষ করতে চায় সংবিধান সংশোধন কমিটি
সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬
কুড়িগ্রামে আবারো সার বিতরণে হট্টগোল, সড়ক অবরোধ
সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬
বৈঠক শেষে সালাহউদ্দিন আহমদ ডিসেম্বরের মধ্যে আলোচনা শেষ করতে চায় সংবিধান সংশোধন কমিটি
সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬

বড় টিকাদান কর্মসূচির পরও থামছে না হামের সংক্রমণ

বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় পর্যায়ে বিপুলসংখ্যক শিশুকে টিকা দেয়া হলেও একটি অংশ টিকাদানের বাইরে থেকে গেলে হাম ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। সরকারের সর্বশেষ তথ্যে দেখা যাচ্ছে, আগের ক্যাম্পেইনের পরও লাখ লাখ শিশু হামের টিকার বাইরে রয়েছে।
মাত্র কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশে বছরে কয়েকশ হাম রোগী শনাক্ত হতো। ২০২১-২৫ সাল পর্যন্ত এ সংখ্যা ছিল বছরে ১০০-৩০০-এর মধ্যে। অথচ চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাত্র ছয় মাসে শনাক্ত ও সন্দেহভাজন হাম রোগীর সংখ্যা পৌঁছেছে দুই লাখে। একই সময়ে নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন মিলিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ৫৭ শিশুর।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশে বড় পরিসরে হাম টিকাদান ক্যাম্পেইন চালানো হয়। এর আওতায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেয়া হলেও সংক্রমণ এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এ পরিস্থিতিতে ২৬ সেপ্টেম্বর আবার বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করছে সরকার। দেশব্যাপী এ কর্মসূচি চলবে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত।
বিপুলসংখ্যক শিশুকে টিকা দেয়ার পরও হামের সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। সারা দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় শনিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত হামের উপসর্গে আরো চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে সন্দেহভাজন হাম রোগী পাওয়া গেছে ১ হাজার ১৪৮ এবং নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে ৮৮ জন।
বড় পরিসরে টিকাদান কার্যক্রমের পরও সংক্রমণ কেন অব্যাহত রয়েছে, সে বিষয়ে একটি ব্যাখ্যা উঠে এসেছে বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী সায়েন্টিফিক আমেরিকানের বাংলাদেশে চলমান হাম পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির মহামারী বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম মস বলেন, ‘বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একটি বড় বিষয় হলো, জাতীয় পর্যায়ের টিকাদানের হিসাব অনেক সময় বাস্তব চিত্র পুরোপুরি তুলে ধরে না। কোনো দেশের সামগ্রিক টিকাদানের হার যথেষ্ট বেশি হলেও সেখানে টিকা না নেয়া মানুষের বড় বড় গোষ্ঠী থেকে যেতে পারে। এসব জনগোষ্ঠী থেকেই হঠাৎ করে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হতে পারে।’
গতকাল সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, হামের টিকার ক্যাম্পেইন চালানোর পরও ৩৪ লাখ শিশুকে টিকাদানের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। বাদ পড়া ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী এসব শিশুকে টিকা দিতে ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত আবার দেশজুড়ে বিশেষ ক্যাম্পেইন চালানো হবে। তার তথ্য অনুযায়ী, হামের টিকা পায়নি এমন ৪৩ লাখ শিশুকে শনাক্ত করা হয়েছিল। এর মধ্যে এরই ‘মপ-আপ’ পদ্ধতিতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ১৯ লাখ শিশুকে টিকা দেয়া হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে জন্ম নেয়া প্রায় ১০ লাখ শিশুও টিকার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় পর্যায়ে বিপুলসংখ্যক শিশুকে টিকা দেয়া হলেও একটি অংশ টিকাদানের বাইরে থেকে গেলে হাম ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। সরকারের সর্বশেষ তথ্যে দেখা যাচ্ছে, আগের ক্যাম্পেইনের পরও লাখ লাখ শিশু হামের টিকার বাইরে রয়েছে। এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এখনো অনেক শিশু টিকার আওতার বাইরে রয়ে গেছে। পথশিশু, যৌনপল্লীতে বেড়ে ওঠা শিশুদের টিকা দেয়া হয়েছে কিনা তাও যথাযথ অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। গার্মেন্ট শ্রমিকসহ এমন পেশায় যুক্ত মানুষের শিশুরা টিকা পেয়েছে কি না সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ এসব পরিবারের সদস্যরা কাজের প্রয়োজনে দ্রুত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করেন। এজন্য তারা টিকার আওতার বাইরে থাকতে পারেন।’
সায়েন্টিফিক আমেরিকানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু জাতীয় পর্যায়ের কাভারেজ দিয়ে বাস্তব পরিস্থিতি বোঝা যায় না। কোনো কোনো এলাকায় টিকাদানের হার অনেক কম হতে পারে। আবার যেসব শিশুর কাছে নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা বা টিকাদান কর্মসূচি পৌঁছায় না, তারাও জাতীয় গড়ের আড়ালে থেকে যায়। হামের ক্ষেত্রে এ ধরনের ফাঁক বিশেষভাবে বিপজ্জনক। কারণ রোগটি অত্যন্ত সংক্রামক। এর বিস্তার ঠেকাতে একটি জনগোষ্ঠীর প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষের প্রয়োজনীয় টিকা নেয়া দরকার। এর নিচে নেমে গেলে ভাইরাস দ্রুত ছড়ানোর সুযোগ পায়।
২০১৯ সালে বাংলাদেশে হামের টিকার প্রথম ডোজ নেয়ার হার ছিল প্রায় ৯৭ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজের হার ছিল ৯৩ শতাংশ। কিন্তু ২০২৫ সালে এ হার কমে ৮৬ শতাংশে নেমে আসে। অর্থাৎ কয়েক বছরে টিকাদানের যে ফাঁক তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব এখন বড় আকারে সামনে আসছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন ইউনিভার্সিটির প্যানডেমিক সেন্টারের পরিচালক জেনিফার নুজো বলেন, ‘বাংলাদেশে এখন যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা অবিশ্বাস্য রকমের বড় একটি প্রাদুর্ভাব। এর সঙ্গে টিকাদানের হার অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ার স্পষ্ট সম্পর্ক রয়েছে।’
সায়েন্টিফিক আমেরিকান বলছে, বড় টিকাদান ক্যাম্পেইনের পর প্রাদুর্ভাব কমার কিছু লক্ষণ দেখা গেলেও পরিস্থিতির উন্নতি এলাকাভেদে ভিন্ন হতে পারে। অর্থাৎ এক এলাকায় টিকাদানের হার ভালো হলেও পাশের কোনো এলাকায় বড়সংখ্যক শিশু টিকার বাইরে থাকলে সংক্রমণ চলতেই পারে। প্রতিবেদনে টেক্সাস এঅ্যান্ডএম ইউনিভার্সিটির স্বাস্থ্য যোগাযোগবিষয়ক গবেষক ও ইউনিসেফ বাংলাদেশের সাবেক যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ সাকিল ফাইজুল্লাহ বলেন, ‘নিয়মিত টিকাদান প্রক্রিয়ায় কোনো ফাঁক তৈরি হলে হাম ভাইরাস সেই সুযোগ নেয়। এ ভাইরাসগুলো কাউকে ছাড় দেয় না।’
হামের কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। আক্রান্ত হলে মূলত উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা দেয়া হয়। তাই এ রোগ ঠেকানোর প্রধান উপায় টিকাদান। প্রথম ডোজের পর শরীরে দ্রুত রোগ প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি তৈরি হতে শুরু করলেও কার্যকর সুরক্ষা তৈরি হতে কিছুটা সময় লাগে। ফলে বড় ক্যাম্পেইনে কোটি শিশুকে টিকা দেয়ার অর্থ এই নয় যে সঙ্গে সঙ্গে পুরো জনগোষ্ঠী সুরক্ষিত হয়ে গেছে। টিকার বাইরে থাকা কয়েক লাখ শিশুও হাম ভাইরাসের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে।
 ‘হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে একটি সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র গঠন করা প্রয়োজন। গতানুগতিক পদ্ধতিতে এ পরিস্থিতির সমাধান করা সম্ভব নয়। শুধু টিকা দিলেই সবকিছু কাভার করা যায় না। বিভিন্ন এলাকায় কিছু শিশু টিকাদানের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে এবং তাদের মধ্য থেকেই সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। পাঁচ বছরের বেশি বয়সী শিশুদের পাশাপাশি ছয় মাসের কম বয়সী শিশুরাও হামে আক্রান্ত হচ্ছে। ফলে সব শিশুকে টিকার আওতায় আনা না গেলে পরিস্থিতি আরো বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে টিকাদানের পাশাপাশি রোগী শনাক্তকরণ, চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *