
সেমিনারে রুহুল কবির রিজভী প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী না হলে গণতন্ত্র টেকসই হবে না
সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৬
বছরে ১০ কার্গো এলএনজির সমপরিমাণ সিস্টেম লস তিতাসের
সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৬হোটেল-রেস্তোরাঁ মালিকরা বলছেন, তৈরি খাবারের প্রায় সব উপকরণের দামই কয়েক দফায় বেড়েছে। এর সঙ্গে বেড়েছে পরিবহন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ ব্যয়। ফলে উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে লাভের মার্জিন ধরে রাখতে খাবারের দাম বাড়ানো ছাড়া উপায় থাকছে না।
কয়েক মাস ধরে দেশে প্রায় সব ধরনের ভোগ্যপণ্যের দাম ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ময়দা, ভোজ্যতেল, চিনি, ডিম, দুধসহ প্রধান খাদ্য উপকরণের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে হোটেল-রেস্তোরাঁ ও প্রস্তুতকৃত খাদ্যপণ্যের বাজারে। চা, পরোটা, শিঙাড়া, রুটি, ভাত-তরকারিসহ বিভিন্ন প্রস্তুতকৃত খাবারের দাম এরই মধ্যে বাড়িয়েছেন ব্যবসায়ীরা। কোনো কোনো পণ্যে এ বৃদ্ধি ১০ শতাংশের বেশি, আবার কিছু ক্ষেত্রে ২০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত। ব্যবসায়ীরা বলছেন, কাঁচামালের পাশাপাশি গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এতদিন পণ্যের আকার বা ওজন কমিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিলেও এখন দাম বাড়ানোর পথেই হাঁটছেন তারা। এতে নিয়মিত হোটেল-রেস্তোরাঁর খাবারের ওপর নির্ভরশীল ভোক্তাদের ব্যয়ও বাড়ছে।
পাইকারি ও খুচরা বাজারের দামের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কয়েক মাস ধরে চিনিগুঁড়া ও অন্যান্য সুগন্ধি চালের দাম ঊর্ধ্বমুখী। একই সময়ে বেড়েছে ডিম, ব্রয়লার মুরগি, চা পাতা, চিনি, গুঁড়া ও পাস্তুরিত তরল দুধ এবং পাঙাশ, তেলাপিয়া ও রুইসহ বিভিন্ন মাছের দাম। গ্রীষ্মকালীন সবজির দামও চড়া। এর সঙ্গে সম্প্রতি সয়াবিন ও পাম অয়েল, মসুর ডাল, ছোলা, আটা ও ময়দার দাম বাড়ায় প্রস্তুত খাদ্যের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। এর প্রভাবে ৮-১৫ টাকার পরোটার দাম বেড়ে ১০-২০ টাকা হয়েছে। প্রতি প্লেট ভাতের দাম বেড়েছে ৫ টাকা এবং মানভেদে প্রতি কাপ চায়ের দাম বেড়েছে ২-৫ টাকা। কিছুদিন আগেও বেকারি ও বড় খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো পণ্যের ওজন কমিয়ে বাড়তি উৎপাদন খরচ সমন্বয়ের চেষ্টা করছিল। এখন তারাও ইউনিটপ্রতি দাম বাড়াতে শুরু করেছে।
হোটেল-রেস্তোরাঁ মালিকরা বলছেন, তৈরি খাবারের প্রায় সব উপকরণের দামই কয়েক দফায় বেড়েছে। এর সঙ্গে বেড়েছে পরিবহন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ ব্যয়। ফলে উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে লাভের মার্জিন ধরে রাখতে খাবারের দাম বাড়ানো ছাড়া উপায় থাকছে না। এ কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী, বিভিন্ন খাবারের দাম বাড়াচ্ছে। আগে অনেকেই পণ্যের আকার বা পরিমাণ কমিয়ে বাড়তি খরচ সামাল দেয়ার চেষ্টা করলেও এখন সেই সুযোগ সীমিত হয়ে এসেছে বলে দাবি ব্যবসায়ীদের।
‘চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলায় প্রায় ১২ হাজার হোটেল-রেস্তোরাঁ রয়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি খাদ্য উৎপাদনের প্রধান উপকরণগুলোর দামও বেড়েছে। ফলে খাবারের দাম বাড়ানো ছাড়া ব্যবসায়ীদের সামনে বিকল্প থাকছে না। এর প্রভাব ফুটপাতের দোকানেও পড়েছে; সেখানে চাসহ বিভিন্ন খাবারের দাম বাড়ানো হয়েছে।’ আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেয়া না হলেও ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হোটেল-রেস্তোরাঁগুলো প্রস্তুত খাবারের দাম সমন্বয় করছে বলেও জানান তিনি।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, ৮ আগস্টের তুলনায় গতকাল কয়েকটি নিত্য ভোগ্যপণ্যের দাম ২ থেকে প্রায় ১১ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এক মাসে খোলা ময়দার দাম ৮ শতাংশ বেড়ে প্রতি কেজি ৬৫-৭০ টাকায় এবং প্যাকেট ময়দা ১০ দশমিক ৭১ শতাংশ বেড়ে ৭০-৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সাদা আটার দাম ৩ দশমিক ১৬ শতাংশ বেড়ে ৪৮-৫০ টাকা, খোলা সয়াবিন তেলের দাম ৫ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে ১৯০-২০০, খোলা পাম অয়েলের দাম ২ শতাংশ বেড়ে ১৬৫-১৭২, চিনির দাম ৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ বেড়ে ১১০-১১৫, ছোলার দাম ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ বেড়ে ১০০-১১০ এবং মসুর ডালের দাম ৫ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ৯৫-১০৫ টাকায় উঠেছে। একই সময়ে লেয়ার মুরগির ডিমের দাম হালিতে ৩-৬ টাকা বেড়ে ৫০-৫২ টাকা হয়েছে। প্রতি কেজি চায়ের দাম ২০ টাকা বেড়ে মানভেদে ৩৫০-৫০০ টাকা এবং গুঁড়া দুধের দাম ২০-৩০ টাকা বেড়ে ৭০০-৯৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বড় শহরগুলোয় শ্রমজীবী ও কর্মজীবী মানুষের একটি বড় অংশ নিয়মিত হোটেল-রেস্তোরাঁ ও ফুটপাতের দোকানের খাবারের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে স্বল্প আয়ের অনেক ভোক্তার দৈনন্দিন খাবারের বড় অংশই আসে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে। চা, চিনি ও দুধের দাম বেড়ে যাওয়ায় ফুটপাত ও ছোট খাবারের দোকানেও চা, বিস্কুট, পাউরুটিসহ বিভিন্ন প্রস্তুত পণ্যের দাম ইউনিটপ্রতি কয়েক টাকা করে বাড়ানো হয়েছে।
আমদানিকারক ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক কয়েকটি গ্লোবাল ডেইরি ট্রেড (জিডিটি) নিলামে বিশ্ববাজারে দুগ্ধজাত পণ্যের দাম বেড়েছে। সর্বশেষ ১ সেপ্টেম্বরের নিলামে নন-ফ্যাট দুধের দাম ৫ শতাংশ এবং ফুলক্রিম দুধের দাম ১ শতাংশ বেড়েছে।
‘এক-দুটি বৈশ্বিক নিলামে দুগ্ধজাত কাঁচামালের দাম বাড়লেই দেশের বাজারে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে না। তবে ইউরোপে দাবানল ও তীব্র তাপপ্রবাহে উৎপাদন কমে যাওয়ায় টানা তিনটি জিডিটি নিলামে দুধের দাম ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও শিপিং খাতের অস্থিরতাও আমদানি ব্যয় বাড়িয়েছে। ফলে শুরুতে দেশের বাজারে দাম অপরিবর্তিত থাকলেও এখন দুগ্ধজাত পণ্যের মূল্য সমন্বয় শুরু হয়েছে।’
, ময়দা, চিনি, ভোজ্যতেল, ডিম ও দুধের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। এর সঙ্গে গ্যাস সংকট পরিস্থিতিকে আরো কঠিন করে তুলেছে। নিয়মিত উৎপাদন চালু রাখতে সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ আরো বাড়ছে। ফলে পণ্যের দাম সমন্বয় করা ছাড়া উপায় থাকছে না।
‘পেস্ট্রিজাতীয় খাবারের পাশাপাশি পোলাও ও বিরিয়ানি তৈরির খরচ আগের তুলনায় ১০-১২ শতাংশ বেড়েছে। বিশেষ করে সুগন্ধি চাল ও শুকনো ফলের দাম দীর্ঘদিন ধরেই ঊর্ধ্বমুখী। এর সঙ্গে চিনি, ভোজ্যতেল ও ময়দার দামও বেড়েছে। হোটেল-রেস্তোরাঁয় সরবরাহ করা খাবারের পরিমাণ কমিয়ে খরচ সমন্বয়ের সুযোগ নেই। তাই লোকসান এড়াতে কিছু পণ্যের দাম বাড়াতে হচ্ছে। তবে দাম বেশি বাড়ালে নিয়মিত ক্রেতারা সরে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। সে কারণে ব্যবসায়ীরা যতটা সম্ভব সীমিত পরিসরে মূল্য সমন্বয় করে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার চেষ্টা করছেন।’


