রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর আজ প্রথমবার ঠাকুরগাঁওয়ে যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল
সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৬
এক ফসল ঘিরে কৃষকের অনিশ্চিত জীবন
সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৬
রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর আজ প্রথমবার ঠাকুরগাঁওয়ে যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল
সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৬
এক ফসল ঘিরে কৃষকের অনিশ্চিত জীবন
সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৬

পানিবন্দি জনপদে দুর্ভোগ ঝুঁকিতে মা-শিশুর ভবিষ্যৎ

বর্ষাকালে এ যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার সবচেয়ে নির্মম শিকার হন পানিবন্দি রোগী ও তাদের স্বজনরা। একজন গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তিকে হাসপাতাল বা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নেয়া মানে যেন এক অনিশ্চিত যুদ্ধে জয়ী হওয়ার চেষ্টা।
‘বর্ষায় নাও আর হেমন্তে পাও’—সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার জেবিবি উচ্চ বিদ্যালয়ে পৌঁছানোর পথ যেন ঋতুর সঙ্গে পাল্টে যাওয়া এক গল্প। বর্ষায় চারদিকে অথৈ পানি, সেই পানির বুক চিরে নৌকায় স্কুলে যেতে হয়। পানি শুকিয়ে গেলে সামনে পড়ে কয়েক কিলোমিটারের ধু-ধু মাঠ। সেই মাঠ পাড়ি দিতে হয় হেঁটে। পশ্চিম বীরগাঁও ইউনিয়নের এ বিদ্যালয়ে প্রতিদিন এমন পথ পাড়ি দেন শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা। ঋতুভেদে বদলে যায় বাহন, বদলায় পথ—বদলায় না শুধু দুর্ভোগ।
একটি বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথ যেখানে শিক্ষার্থীদের প্রতিদিনের সংগ্রাম, সেখানে অসুস্থ মানুষ কিংবা প্রসূতি মায়ের জন্য একই পথ হয়ে ওঠে অনিশ্চয়তা ও উৎকণ্ঠার। কোথাও নৌকা, কোথাও ভাঙা সাঁকো, আবার কোথাও কর্দমাক্ত পথ পেরিয়েই পৌঁছাতে হয় চিকিৎসা কেন্দ্রে। যে যোগাযোগ সংকট একদিকে শিশুর শিক্ষাজীবনকে ব্যাহত করছে, অন্যদিকে তা জরুরি স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার পথেও তৈরি করছে অনিশ্চয়তা। কখনো প্রসূতি মাকে নৌকায়, কখনো বাঁশের মাচায় করে ছুটতে হয় চিকিৎসার জন্য। পথ যত দীর্ঘ হয়, সময়মতো চিকিৎসা কেন্দ্রে পৌঁছানো নিয়ে ততই বাড়ে উৎকণ্ঠা।
সরজমিনে সুনামগঞ্জে হাওরের মাঝে অবস্থিত গ্রামগুলোকে দূর থেকে দেখলে দ্বীপের মতো মনে হয়। ভাঙাচোরা পাকা সড়ক দিয়ে উপজেলা সদর থেকে জেলা শহরে কোনোরকম যাতায়াত করা যাচ্ছে। কিন্তু উপজেলা সদরের সঙ্গে বেশির ভাগ গ্রামের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। তাই ছোট-বড় ইঞ্জিনের নৌকা দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করছে হাওরের মানুষগুলো। এছাড়া বেশির ভাগ মানুষ পানিবাহিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হন তারা। কিন্তু উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোয় পর্যাপ্ত ডাক্তার-নার্স ও ওষুধ না থাকার কারণে চিকিৎসাসেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন হাওরবাসী। এসব সমস্যার সঙ্গে লড়াই করে প্রতিনিয়ত বেঁচে আছে হাওর এলাকার লাখ লাখ অসহায় মানুষ।
বর্ষাকালে এ যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার সবচেয়ে নির্মম শিকার হন পানিবন্দি রোগী ও তাদের স্বজনরা। একজন গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তিকে হাসপাতাল বা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নেয়া মানে যেন এক অনিশ্চিত যুদ্ধে জয়ী হওয়ার চেষ্টা। অনেক সময় চিকিৎসা কেন্দ্রে পৌঁছানোর আগেই রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে বা পথেই মৃত্যু ঘটে। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার লক্ষণশ্রী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে পরিবার কল্যাণ পরিদর্শকা (এফডব্লিউভি) হিসেবে কর্মরত আছেন আলীমুন্নেসা পাঠান। এ ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটির অন্যতম প্রধান কাজ গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়েদের সেবা, কিশোর কিশোরী সেবা, শিশুদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া।
বর্ষাকালে রোগীদের যাতায়াতের করুণ চিত্র তুলে ধরে তিনি বণিক বার্তাকে জানান, রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় মানুষ সহজে স্বাস্থ্য কেন্দ্রে আসতে পারে না। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয় গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়েদের। বর্ষায় গ্রামের যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম সাঁকো, ভেলা ও নৌকা। গর্ভবতী মায়েদের সাঁকো ব্যবহার খুবই বিপজ্জনক। গত বর্ষাতে সাঁকো থেকে পড়ে এক মহিলার অকালে গর্ভপাতের মতো ঘটনা ঘটেছিল। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে রোগীটি শেষ পর্যন্ত মারা যায়।
বর্ষা শেষ হলেই যে এ দুর্ভোগের অবসান ঘটে, তা নয়। শুষ্ক মৌসুমেও রোগীদের সমানতালে দুর্ভোগ পোহাতে হয় ভাঙা রাস্তা আর যানবাহনের সংকটের কারণে। আলীমুন্নেসা পাঠান জানান, গ্রীষ্মে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। রাস্তাঘাটের অবস্থা খারাপ থাকায় অটোরিকশার ঝাঁকুনির জন্য দূরের গ্রাম থেকে রোগীরা গর্ভপাত ও রক্তক্ষরণের ভয়ে এখানে আসে না। রাতে অনেক সময় কোনো ধরনের যানবাহনই পাওয়া যায় না। তখন বাঁশের মাচায় করে নিয়ে আসে। অনেকে হেঁটে আসে।
অন্যদিকে পানি বাড়লে হাওরপারের কয়েক হাজার প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়। ফলে কয়েক মাস বন্ধ থাকে পাঠদান। এতে শিখন ঘাটতির মুখে পড়ে শিক্ষার্থীরা। এ ঘাটতি মেটাতে কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যায় না সরকার কিংবা স্কুলের। ফলে ভালো রেজাল্ট করতে না পেরে অনেক শিক্ষার্থী স্কুল ছেড়ে দেয়। এছাড়া এ অঞ্চলের মানুষ অপেক্ষাকৃত দরিদ্র হওয়ায় সন্তানদের স্কুলে না পাঠিয়ে কাজে লাগিয়ে দেয়।
তাহিরপুর উপজেলার লাওড়েরগড়ে অবস্থিত আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা অলকা রায় বলেন, ‘বর্ষাকালে দূর-দূরান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা নৌকায় করে আসে। এতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময়ের প্রয়োজন হয়। ফলে মাঝেমধ্যেই স্কুল মিস হয়। তবে পাহাড়ি ঢলের সময় নৌকায় করেও শিক্ষার্থীরা স্কুলে আসতেই পারে না।’ সব মিলিয়ে হাওরাঞ্চলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ঝরে পড়ার প্রবণতা লক্ষণীয় মাত্রায় বেশি বলে জানান এ শিক্ষক।
যোগাযোগ ব্যবস্থার নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি আঘাত হানছে হাওরাঞ্চলের অর্থনীতি ও স্থানীয় বাজারগুলোতে। শুষ্ক মৌসুমে সহজেই হেঁটে কিংবা যানবাহনে বাজারে আসা গেলেও বর্ষায় নৌকা ছাড়া যাতায়াতের সুযোগ থাকে না। যাদের নিজস্ব নৌকা নেই, তাদের পোহাতে হয় বাড়তি ভোগান্তি ও ব্যয়।
দিরাই বাজারের মাহফুজ স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. সৈয়দুন নূর বলেন, ‘বাজারে একটা বড় অংশের ক্রেতা হচ্ছেন নারীরা। বিশেষ করে পোশাক-পরিচ্ছদ ও প্রসাধনীর দোকানগুলোতে নারী ক্রেতার সংখ্যা বেশি। বর্ষাকালে তাদের সংখ্যা কমে যায়। সামগ্রিকভাবে ক্রেতার সংখ্যাও কম থাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *