
সাপ্তাহিক পুঁজিবাজার বেশির ভাগ খাতের শেয়ারে ইতিবাচক রিটার্ন
সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬
নন-ইউরিয়া সার আমদানি চলতি মাসেই দেশে আসছে সাত জাহাজ ডিএপি এমওপি টিএসপি
সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. আবু মুহাম্মদ জাকির হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হামের টিকাদান কর্মসূচির পরও প্রতিদিন যদি প্রায় এক হাজার শিশু সন্দেহজনক হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং মৃত্যুও অব্যাহত থাকে, তাহলে এর প্রকৃত কারণ খুঁজে দেখা জরুরি।
এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া বিস্তৃত টিকাদান কর্মসূচির পরও দেশে হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসছে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, চলমান বিশেষ টিকাদান কর্মসূচিতে টিকা কাভারেজ হয়েছে ১০৯ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশিসংখ্যক শিশুকে টিকার আওতায় আনার পরও প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক শিশু সন্দেহজনক হাম অর্থাৎ হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে।
সর্বশেষ গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ থাকা ১ হাজার ১১৪ জন রোগী পাওয়া গেছে। এর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ৪ জন। একই সময়ে হাম শনাক্ত হয়েছে ৪০ জনের এবং উপসর্গে মৃত্যু হয়েছে একজনের।
টিকাদান কর্মসূচি শুরুর প্রায় চার মাস পরও প্রতিদিন হাজারের বেশি বা কাছাকাছি শিশুর হাসপাতালে ভর্তি হওয়াকে উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, হামের উপসর্গ থাকলেও সব রোগীর ল্যাবরেটরি পরীক্ষা করা হয় না। নির্দিষ্টসংখ্যক রোগীর নমুনা পরীক্ষা করে রোগের প্রকোপ সম্পর্কে ধারণা করা হয়। ফলে ওই রোগীদের মধ্যে কারা প্রকৃতপক্ষে হামে আক্রান্ত, তা নির্ধারণে আরো বিস্তৃত নমুনা পরীক্ষা প্রয়োজন। একই সঙ্গে টিকা প্রয়োগের পাশাপাশি টিকা-পরবর্তী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে কিনা এবং টিকা সংরক্ষণ ও পরিবহনের সময় কোল্ড চেইন ঠিক ছিল কিনা, সেটিও যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. আবু মুহাম্মদ জাকির হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হামের টিকাদান কর্মসূচির পরও প্রতিদিন যদি প্রায় এক হাজার শিশু সন্দেহজনক হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং মৃত্যুও অব্যাহত থাকে, তাহলে এর প্রকৃত কারণ খুঁজে দেখা জরুরি। সন্দেহজনক হাম হিসেবে শনাক্ত হওয়া সব রোগীর পরীক্ষা করা হয় না। নির্দিষ্টসংখ্যক রোগীকে দৈবচয়নের মাধ্যমে নির্বাচন করে নমুনা পরীক্ষা করা হয়। তাদের মধ্যে হাম শনাক্ত হলে একই ধরনের উপসর্গ থাকা অন্য রোগীদের ক্ষেত্রেও হাম থাকার বিষয়ে ধারণা পাওয়া যায়। তবে টিকাদান কর্মসূচির পরও সংক্রমণ অব্যাহত থাকার ক্ষেত্রে শুধু টিকা দেয়া হয়েছে কিনা, সেটি দেখলেই হবে না। টিকা নেয়ার পর শিশুদের শরীরে পর্যাপ্ত প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়েছে কিনা, টিকা কতটা কার্যকর রয়েছে এবং সংরক্ষণ ও পরিবহনের সময় কোল্ড চেইন ঠিকভাবে বজায় ছিল কিনা, সেগুলোও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, ‘দেশে আসার পর দীর্ঘ সময় কেন্দ্রীয় স্টোরে সংরক্ষিত থাকা থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ে পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়ায় টিকার কার্যকারিতা ঠিক ছিল কিনা, তা যাচাই করা দরকার। এজন্য কেন্দ্রীয় স্টোর ও মাঠপর্যায়ের টিকাদান কেন্দ্র দুই জায়গা থেকেই টিকার নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে বয়সও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে ছয় মাসের কম বয়সী শিশুরা নিয়মিত টিকার আওতার বাইরে থাকায় তাদের ঝুঁকি বেশি। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু টিকাদানের আওতায় আসা শিশুর সংখ্যা দিয়ে মূল্যায়ন না করে টিকার কার্যকারিতা, কোল্ড চেইন ব্যবস্থাপনা, টিকা-পরবর্তী প্রতিরোধক্ষমতা এবং সন্দেহজনক রোগীদের নমুনাভিত্তিক পরীক্ষার ফল সবকিছু একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত সাতদিনে দেশে মোট ৭ হাজার ৪৭০ জন সন্দেহজনক হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। এ সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৬ হাজার ৯২০ জন এবং হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যু হয়েছে ২৭ জনের। এর মধ্যে ৪ সেপ্টেম্বর ১ হাজার ১১৪ জন সন্দেহজনক হাম রোগী শনাক্ত ও ১ হাজার ৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে; মৃত্যু হয়েছে একজনের। ৩ সেপ্টেম্বর উপসর্গ, হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যু ছিল যথাক্রমে ৯৬৪, ৯৭৭ ও তিনজন; ২ সেপ্টেম্বর ছিল ১ হাজার ৩৪, ৮৯৩ ও চারজন; ১ সেপ্টেম্বর ১ হাজার ১৫৯, ১ হাজার ৭৪ ও ছয়জন; ৩১ আগস্ট ১ হাজার ১৬২, ১ হাজার ৯৮ ও ছয়জন; ৩০ আগস্ট ১ হাজার ১৫১, ১ হাজার ৯০ ও চারজন এবং ২৯ আগস্ট ছিল ৮৮৬, ৭৮৪ ও তিনজন।
অর্থাৎ গত এক সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৯৮৯ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। একই সময়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩ দশমিক ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। টিকা কর্মসূচির কয়েক মাস পরও সংক্রমণের এ ধারাবাহিকতা হামের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুসারে, চলতি বছর এ পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৯৯ জন এবং এ রোগের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৮৮৮ জন। এ সময়ের মধ্যে হাম শনাক্ত হয়েছে ১৯ হাজার ৫৬৭ জনের। হামের উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬২ হাজার ২৬২ জন। চলতি বছরে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ৪২ হাজার ৪৫৩ জন। এর মধ্যে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৩৫০ জন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হামের টিকাদান কর্মসূচিতে লক্ষ্যমাত্রা ঠিকমতো অর্জিত হয়নি। সরকারও এখন বিষয়টি স্বীকার করেছে। যারা টিকার আওতায় আসেনি, তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নতুন করে টিকা দেয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। হামের ক্ষেত্রে অন্তত ৯৫ শতাংশ টিকা কাভারেজ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কিন্তু সেই কাভারেজ অর্জিত হয়নি। ফলে যারা টিকার আওতায় আসেনি, তাদের মধ্যে হাম ছড়াতে ছড়াতে পরিস্থিতি আবার আগের অবস্থায় যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে পাঁচ বছর পর্যন্ত শিশুদের টিকা দেয়া হলেও পাঁচ থেকে ১৫ বছর বয়সীরাও আক্রান্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে ছয় মাসের কম বয়সী শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে, যারা টিকার নির্ধারিত বয়সসীমার বাইরে। হামের সব রোগীকে ল্যাবরেটরি পরীক্ষার আওতায় আনার প্রয়োজন নেই। মহামারী পরিস্থিতিতে উপসর্গের ভিত্তিতে সম্ভাব্য হাম রোগী শনাক্ত করা যায়। জ্বরের সঙ্গে চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে লালচে দানা দেখা দিলে তাকে সম্ভাব্য হাম রোগী হিসেবে বিবেচনা করা যায়। প্রয়োজন অনুযায়ী নমুনা পরীক্ষা করে ল্যাবরেটরিতে তা নিশ্চিত করা যায়।’


