
নিহত
আগস্ট ২৯, ২০২৬
চাঁদপুরের সড়কে বিশৃঙ্খলা রোড পারমিট ও ফিটনেস সনদ ছাড়াই চলছে বেশির ভাগ বাস
আগস্ট ২৯, ২০২৬মিটার নষ্ট থাকায় জানা নেই প্রকৃতপক্ষে কত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়েছে। এর পরও মাসের পর মাস একই অংকের বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করে যাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
কোনো কোনো ভবনে বছরের পর বছর বদলায়নি বিলের পরিমাণও। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যুৎ বিলের রেজিস্টার বিশ্লেষণে অন্তত নয়টি ভবন ও হলের এমন তথ্য পাওয়া গেছে। নষ্ট মিটারের বিপরীতে এসব ভবন ও হলে প্রায় তিন বছরে পরিশোধ করা হয়েছে আনুমানিক ১৫ কোটি টাকার বিদ্যুৎ বিল।
রেজিস্টার দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রকৃত মিটার রিডিংয়ের পরিবর্তে আনুমানিক গড় ব্যবহারের ভিত্তিতে এসব বিল তৈরি করা হয়েছে। আর সেই নির্ধারিত অংকই মাসের পর মাস পুনরাবৃত্তি হয়েছে। ফলে মিটার নষ্ট থাকা অবস্থায় প্রকৃত ব্যবহারের তুলনায় বিশ্ববিদ্যালয় কত টাকা বেশি বা কম পরিশোধ করেছে, তা নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যুৎ বিলের হিসাব পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সামাজিক বিজ্ঞান ভবন, কলা ভবন, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড রিসার্চ ইন আর্টস অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সেস (কারাস), উচ্চতর বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র, কবি সুফিয়া কামাল হল, পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, শহীদ মুনীর চৌধুরী ভবন এবং আইবিএ হোস্টেলে নষ্ট মিটারের বিপরীতে একই বা অনুমানভিত্তিক অংকে দীর্ঘদিন বিল করা হয়েছে।
সামাজিক বিজ্ঞান ভবনের মিটার নম্বর ৩৬৩৯৮। রেজিস্টার দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জুন থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে ৫ লাখ ৩১ হাজার ৮৩ টাকা করে বিল করা হয়েছে। এরপর ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ২১ মাসে ৫ লাখ ৮৯ হাজার ২৯৪ টাকা করে বিল লেখা হয়। এভাবে ৩৬ মাসে তিন দফায় অংক পরিবর্তন করে মোট প্রায় ২ কোটি ৫ লাখ ৫৭ হাজার টাকার বিল লেখা হয়েছে।
কলা ভবনের মিটার নম্বর ২৮৬৭৬। মিটারটি ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে নষ্ট থাকার তথ্য পাওয়া যায়। এরপর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৩ মাস ৮ লাখ ২০ হাজার ১৬ টাকা করে একই অংকের বিল পরিশোধ করা হয়েছে। মোট ২১ মাসে নষ্ট মিটারের বিপরীতে প্রায় ১ কোটি ৬৭ লাখ টাকার বিল লেখা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের মিটার নম্বর ১৫৭০৯। ২০২৩ সালের মার্চ থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ১১ মাস ৬ লাখ ৮৭ হাজার ৬৩৯ টাকা করে বিল করা হয়। পরে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ২১ মাস ৭ লাখ ৫৯ হাজার ১০৮ টাকা করে বিল লেখা হয়েছে। তিন দফায় মোট ৩৯ মাসে নষ্ট মিটারের বিপরীতে প্রায় ২ কোটি ৮৪ লাখ টাকার বিল হয়েছে।
কারাসের মিটার নম্বর ১২১০০১৪৫। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১১ মাস ৭ লাখ ৫৯ হাজার ১৫০ টাকা করে বিল লেখা হয়। এরপর ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাস ৭ লাখ ৫১ হাজার ৫৯০ টাকা করে একই অংকের বিল করা হয়েছে। এভাবে রেজিস্টারের হিসাবে মোট প্রায় ৩০ মাসে নষ্ট মিটারের বিপরীতে ২ কোটি ২০ লাখ টাকার বিল লেখা হয়েছে।
উচ্চতর বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রের মিটার নম্বর ৯৫২৬১২১০০৯৫৭। ২০২৩ সালের মার্চ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত নয় মাস ২ লাখ ১৪ হাজার টাকা করে একই অংকের বিল লেখা হয়েছে। এতে ওই সময়ে নষ্ট মিটারের বিপরীতে প্রায় ১৯ লাখ ২৬ হাজার টাকার বিল হয়েছে।
কবি সুফিয়া কামাল হলের মিটার নম্বর ২০১২১২। ২০২৪ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত ১৭ মাস ৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা করে একই অংকের বিল লেখা হয়েছে। এ সময়ে নষ্ট মিটারের বিপরীতে আনুমানিক ১ কোটি ৫৭ লাখ টাকার বিল হয়েছে।
পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের মিটার নম্বর ১৫৮০৮। ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৪ মাস ৭১ হাজার ২২ টাকা করে বিল লেখা হয়। এরপর ২০২২ সালের মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত আট মাস ৩ লাখ ৬৯ হাজার টাকা করে এবং ২০২৩ সালের মার্চ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত নয় মাস ৩ লাখ ৪৩ হাজার টাকা করে বিল করা হয়। মোট ৩১ মাসে এ মিটারের বিপরীতে প্রায় ৬৫ লাখ ৩৮ হাজার টাকার বিল লেখা হয়েছে।
শহীদ মুনীর চৌধুরী ভবনের মিটার নম্বর ৯৫০০৩৬১। ২০২১ সালের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাস ৪ লাখ ৬১ হাজার টাকা করে একই বিল করা হয়। এরপর ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাস অংক বাড়িয়ে বিল করা হয়। পরে ২০২২ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাস, ২০২৩ সালের মার্চ থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ১১ মাস এবং ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত ১৮ মাস একই অংকের বিল লেখা হয়েছে। রেজিস্টারের হিসাবে মোট ৪৪ মাসে এ ভবনে নষ্ট মিটারের বিপরীতে প্রায় ১ কোটি ৬৬ লাখ টাকার বিল হয়েছে।
সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের তথ্য পাওয়া গেছে আইবিএ হোস্টেলের ক্ষেত্রে। মিটার নম্বর ০০৪৭০। ২০১৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০১৭ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ৩২ মাস, ২০১৭ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২৭ মাস, ২০২০ সালের জুন থেকে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২১ মাস, ২০২২ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১০ মাস এবং ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ১১ মাস একই অংকের বিল লেখা হয়েছে। মোট ১০১ মাস বা আট বছর পাঁচ মাসে নষ্ট মিটারের বিপরীতে প্রায় ২ কোটি ১৬ লাখ টাকার বিল ধরা হয়েছে।
নয়টি ভবন ও স্থাপনার রেজিস্টারভুক্ত হিসাব যোগ করলে নষ্ট মিটারের বিপরীতে বিলের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৫ কোটি টাকা। তবে এসব বিল প্রকৃত বিদ্যুৎ ব্যবহারের ভিত্তিতে নয়, বরং আনুমানিক গড় ব্যবহারের ভিত্তিতে করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. লুৎফর রহমান বলেন, ‘বিভিন্ন ভবনে নষ্ট মিটারের কারণে প্রকৃত বিদ্যুৎ ব্যবহার নিরূপণ করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই গরম ও শীতকালের ব্যবহারের আনুমানিক গড় হিসাবের ভিত্তিতে বিল পরিশোধ করা হচ্ছে। মিটার সচল বা নতুন মিটার স্থাপন করা হলে বিল উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।’ উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘কার্জন হলে নষ্ট মিটারে মাসে প্রায় ৩ লাখ টাকা বিল এলেও মিটার ঠিক করার পর তা বেড়ে প্রায় ১৫ লাখ টাকা হয়েছে। কলা ভবন ও সামাজিক বিজ্ঞান ভবনের জন্য নতুন মিটার আনা হলেও সেগুলো এখনো চালু করা হয়নি।’
ঢাবির নির্বাহী প্রকৌশলী আহসানুল কবির মল্লিক বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের আটটি মিটার নষ্ট রয়েছে। এর মধ্যে কারাস, শহীদ মুনীর চৌধুরী ভবন, আবুল খায়ের ভবন, আইবিএ হোস্টেল এবং খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের মিটার রয়েছে। নতুন মিটার স্থাপনের জন্য টেন্ডার হয়েছে এবং পাঁচটি মিটার স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে। তবে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট মিটার পরিবর্তন করা সম্ভব হয়নি। নষ্ট মিটারের কারণে ডিপিডিসি প্রথমে আনুমানিক বিল তৈরি করে। পরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তা প্রক্রিয়াজাত করে পরিশোধ করে। এ বিষয়ে ডিপিডিসি অবগত রয়েছে।’
ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রায়হানুল আলম বলেন, ‘এক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গাফিলতি রয়েছে। তারা আনুমানিক গড় হিসাবের ভিত্তিতে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করছে।’ নষ্ট মিটারে বিল পরিশোধের বিষয়টি নিয়ম-বহির্ভূত কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা বিষয়টি জানি। তবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এম জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানান, তিনি এ বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারবেন না এবং বিষয়টি সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন না। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব পরিচালক অথবা প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) কাজী মো. আক্রাম হোসেন বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার জানা নেই। আমি আপনাকে কী উত্তর দেব, সেটিও বুঝতে পারছি না। বিষয়টি দেখে আমি নিজেই আশ্চর্য হয়েছি। আমাকে বিষয়টি অবহিত করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আমি বিষয়টি দেখছি।’
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, ‘আপনি সঠিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রমাণসহ বিষয়টি তুলে ধরলে আমি তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখব এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সরাসরি উদ্যোগ নেব।’


