বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালকে মাইক্রোবাস দিল পূবালী ব্যাংক
আগস্ট ২০, ২০২৬
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জামায়াত থেকে বহিষ্কৃত গাজী নজরুল কি ভোট দেবেন?
আগস্ট ২০, ২০২৬
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালকে মাইক্রোবাস দিল পূবালী ব্যাংক
আগস্ট ২০, ২০২৬
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জামায়াত থেকে বহিষ্কৃত গাজী নজরুল কি ভোট দেবেন?
আগস্ট ২০, ২০২৬

নিজেদের নিরাপত্তাবলয়েও আক্রান্ত হচ্ছে পুলিশ

উচ্চস্বরে গান-বাজানোকে কেন্দ্র করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ লাইনসে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হামলা চালানোর অভিযোগ উঠেছে মাদরাসা শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে।

মঙ্গলবার রাতের এ ঘটনায় পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেই নয়, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে সারা দেশে পুলিশ আক্রান্তের ঘটনা ঘটেছে ৩৫৯টি। পুলিশের নিজস্ব কম্পাউন্ডে হামলার এ ঘটনাসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর ধারাবাহিক হামলা দেশে বেপরোয়া মব সংস্কৃতির চিত্র সামনে আনছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি) আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরীর আগমন উপলক্ষে মঙ্গলবার রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশ লাইনসে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। রাত ১১টার দিকে পৌর এলাকার পশ্চিম মেড্ডায় অবস্থিত পুলিশ লাইনসের ভেতরে অনুষ্ঠান চলাকালে উচ্চশব্দে গান না বাজানোর দাবি নিয়ে পাশের দারুল আরকাম আল-ইসলামিয়া মাদরাসার একদল শিক্ষার্থী সেখানে উপস্থিত হন।

এ নিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের তর্কবিতর্ক শুরু হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশের দাবি, পরে শতাধিক শিক্ষার্থী পুলিশ লাইনসের ভেতরে প্রবেশ করে হামলা ও ভাংচুর চালান। এতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পণ্ড হয়ে যায় এবং পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ হয়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে একপর্যায়ে পুলিশ লাঠিচার্জ করে শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এতে অন্তত ২০ মাদরাসা শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের হামলায় ১০ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে পুলিশ।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার শাহ মো. আব্দুর রউফ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মাদরাসা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের বাগ্‌বিতণ্ডাকে কেন্দ্র করে গভীর রাত পর্যন্ত উত্তেজনা ছিল। পরে দারুল আরকাম আল-ইসলামিয়া মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা ও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব সাজিদুর রহমানসহ মাদরাসা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়া হয়। বৈঠকে জেলা পরিষদ প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. সিরাজুল ইসলামসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন। এ ঘটনায় কেউ অত্যুৎসাহী হয়ে কোনো কর্মকাণ্ড করে থাকলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশের ওপর বিভিন্ন সময় হামলা ও সংঘবদ্ধভাবে চাপ প্রয়োগের ঘটনা বাড়ছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনায় সরাসরি পুলিশের নিজস্ব কম্পাউন্ডে প্রবেশ করে হামলা ও ভাংচুরের অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে সারা দেশে পুলিশ আক্রান্তের ঘটনা ঘটেছে ৩৫৯টি। এর মধ্যে জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও জুলাইয়ে সর্বনিম্ন ৪২টি করে ঘটনা ঘটেছে। মার্চে পুলিশ আক্রান্তের ঘটনা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৩টিতে। এপ্রিলে তা আরো বেড়ে ৬৬টিতে পৌঁছায়, যা সাত মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। মে মাসে ৫৫ ও জুনে ৪৯টি ঘটনা ঘটে।

পুলিশের ওপর হামলার মধ্য দিয়ে প্রকারান্তরে উগ্রবাদী গোষ্ঠীকে সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে বলে মনে করেন মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘দেশে একটি গোষ্ঠী অরাজকতা ও অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে। এ অস্থিরতার মধ্য দিয়ে তারা নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করতে চায়। আমরা এমন একটি ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যেখানে নিজেদের মধ্যে সংঘাত কিংবা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এর মধ্য দিয়ে প্রকারান্তরে উগ্রবাদী গোষ্ঠীকে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে। একদিকে ফ্যাসিস্টদের ফিরে আসার হুমকি, অন্যদিকে উগ্রবাদের উত্থানের সম্ভাবনা—দুই ধরনের ঝুঁকিই রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় ঐক্য অত্যন্ত জরুরি। আর সে ঐক্য প্রতিষ্ঠায় সরকারি দলকেই এগিয়ে আসতে হবে।’

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারার কারণেই সাধারণ মানুষের মধ্যে আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে। মানুষ যখন মনে করে যে প্রচলিত আইন ও বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রুত প্রতিকার পাওয়া যাবে না, তখন নিজেরাই অভিযোগের বিচার ও শাস্তি কার্যকরের চেষ্টা করে। সেখান থেকেই মব সংস্কৃতি বা দলবদ্ধভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার প্রবণতা বিস্তার লাভ করতে পারে। তবে এ প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার সংস্কৃতি একবার স্বাভাবিক হয়ে উঠলে সেখানে কে অপরাধী আর কে নির্দোষ, সেটি যাচাইয়ের সুযোগ ক্রমেই কমে যায়। অভিযোগ, গুজব কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধের জেরেও মানুষ সংঘবদ্ধ হামলার শিকার হতে পারে। এতে শুধু নিরপরাধ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিই বাড়ে না, রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগ ও বিচার ব্যবস্থার কর্তৃত্বও দুর্বল হয়ে পড়ে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেজাউল করিম সোহাগ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করার মূল উদ্দেশ্য হলো অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে একই ধরনের অপরাধ বারবার সংঘটিত হচ্ছে। এতে পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা কমার পাশাপাশি অপরাধীদের মধ্যেও একধরনের আত্মবিশ্বাস তৈরি হচ্ছে। অনেকগুলো মামলা থাকার পরও একজন অভিযুক্ত যখন জামিনে বেরিয়ে এসে আবার অপরাধে জড়াতে পারে, তখন সামগ্রিক বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থার সংকট তৈরি হয়। যারাই অপরাধ করুক, তাদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা আরো কমবে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার প্রবণতা বাড়তে থাকবে।’

পুলিশে ওপর আক্রমণ পুরো দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘পুলিশের ওপর হামলা শুধু একটি বাহিনীর ওপর আক্রমণ নয়; এটি পুরো দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য অশনিসংকেত। পরিপূর্ণ মনোবল নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ঘুরে দাঁড়াতেই যেখানে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে, সেখানে আইন প্রয়োগ করতে গিয়েও তাদের বেগ পেতে হচ্ছে। এর মধ্যে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরো উদ্বেগজনক করে তুলছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আক্রান্ত হলে সাধারণ মানুষের মধ্যেও নিরাপত্তা ও আইনের শাসন নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হয়। কোনো সামাজিক বা ধর্মীয় অনুষ্ঠান কারো পছন্দ না হলে সেটিকে ইস্যু করে মব সংস্কৃতি তৈরির প্রবণতা শুরুতেই দমন করা প্রয়োজন ছিল। তা না করায় এখন পুলিশকেও আক্রান্ত হতে হচ্ছে। এ ধরনের হামলা বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশে জনপ্রতিনিধিদেরও দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে হবে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট অপরাধীর জন্য দৃষ্টান্ত তৈরি করবে না, অন্যদের মধ্যেও অপরাধের পরিণতি সম্পর্কে বার্তা পৌঁছে দেবে। কিন্তু অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটলেও যদি দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়া হয়, তাহলে বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থার সংকট আরো গভীর হবে। শেষ পর্যন্ত দেশের সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ লাইনসে হামলার ঘটনাটি যাচাই করে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় যারই দায় পাওয়া যাবে, তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পুলিশকে সহযোগিতা করা প্রয়োজন। পুলিশের কাজে বাধা সৃষ্টি হলে আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন ব্যাহত হবে।’

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *