
মির্জা ফখরুল ও মেজর হাফিজে ঘুরপাক খাচ্ছে বিএনপির রাষ্ট্রপতি বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত
আগস্ট ৯, ২০২৬
হরমুজ নিয়ে ওমানের সঙ্গে চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত, তবে প্রণালি খোলার সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই: ইরান
আগস্ট ৯, ২০২৬২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি সরকারের আমলে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
সে সময় এসএসসি-এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষায় নকল বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনায় আসেন তিনি। পরীক্ষা কেন্দ্রের বাস্তব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে হেলিকপ্টারে দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে যাওয়ার ঘটনাও সে সময় বেশ আলোচিত ও প্রশংসিত হয়েছিল।
দুই দশক পর আবারো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ফিরেছেন এহছানুল হক মিলন, এবার পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে। গত ২১ এপ্রিল শুরু হওয়া এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা ছিল শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তার সময়ের প্রথম পাবলিক পরীক্ষা। সেই পরীক্ষার ফল প্রকাশ হচ্ছে আগামীকাল। শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ফলাফলে শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক অবস্থার পাশাপাশি মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে বর্তমান সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি এবং ফল প্রকাশের ব্যবস্থার ওপর শিক্ষক-অভিভাবকদের আস্থার চিত্রও স্পষ্ট হবে।
শিক্ষা বোর্ডগুলোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নিতে ফরম পূরণ করেছে ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪৪ শিক্ষার্থী। এর মধ্যে এসএসসি পরীক্ষার্থী ১৪ লাখ ১৮ হাজার ৩৯৮ জন, দাখিল পরীক্ষার্থী ৩ লাখ ৪ হাজার ২৮৬ এবং এসএসসি ও দাখিল (ভোকেশনাল) পরীক্ষার্থী ১ লাখ ৩৪ হাজার ৬৬০ জন। মোট পরীক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্র ৯ লাখ ৩০ হাজার ৩০৫ ও ছাত্রী ৯ লাখ ২৭ হাজার ৩৯ জন।
শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এবারো নকল বন্ধে সরব ছিলেন এহছানুল হক মিলন। পরীক্ষায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত ও কেন্দ্রগুলো যথাযথভাবে মনিটরিংয়ের লক্ষ্যে সারা দেশের পরীক্ষা কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের সিদ্ধান্তও নেয়া হয়। তবে নকল বন্ধ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেয়া তার বক্তব্য ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা তৈরি হয়। একই সময়ে প্রশ্ন ফাঁসের গুঞ্জনও ছড়িয়ে পড়ে। যদিও পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, এ ধরনের অভিযোগের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।
এদিকে বিগত কয়েক বছরের এসএসসি পরীক্ষার সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, এবার ফল প্রকাশে তুলনামূলক বেশি সময় নেয়া হয়েছে। পরিবর্তন করা হয়েছে ফল প্রকাশের ঘোষিত তারিখও। গত ৮ জুন সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী প্রথমে জানিয়েছিলেন, এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হবে ২০ জুলাই। তবে পরে প্রস্তুতি সম্পন্ন না হওয়ায় ওই তারিখে ফল প্রকাশ করা সম্ভব হবে না বলে জানানো হয়। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ শিবলী সাদিক এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানান, ফল প্রকাশ করা হবে ১০ আগস্ট।
শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফল প্রকাশের ক্ষেত্রে শুরুতেই এ ধরনের তারিখ পরিবর্তন একধরনের সমন্বয়হীনতারই বহিঃপ্রকাশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও ইউনিভার্সিটি অব রিডিংয়ের ভিজিটিং প্রফেসর ড. এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ ফলাফলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হবে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আস্থা অর্জন। দায়িত্বশীলদের বক্তব্যে সমন্বয়হীনতা থাকলে তা তাদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর আগে ফল প্রকাশের তারিখ কিংবা দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় পরীক্ষা গ্রহণের বিষয়ে দেয়া বক্তব্যেও এমন সমন্বয়হীনতা দেখা গেছে। তাই এসএসসির ফল প্রকাশের ক্ষেত্রে যেন এর পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। ফল প্রকাশের ওয়েবসাইটসহ পুরো ব্যবস্থাও ত্রুটিমুক্ত রাখা জরুরি। গত মাসে এইচএসসি পরীক্ষার সময় দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় পরীক্ষা গ্রহণ ও প্রশ্নপত্রে ভুলের মতো বিষয় ঘিরে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছিল। আন্দোলন থামলেও এর রেশ এখনো রয়ে গেছে। ফলে এসএসসির ফল প্রকাশে কোনো বড় ধরনের ভুল-ত্রুটি বা সমন্বয়হীনতা দেখা দিলে তা আবারো অস্থিরতার কারণ হতে পারে। তাই এ বিষয়ে অবশ্যই সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকতে হবে।’
পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এসএসসি-এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষায় তুলনামূলক উচ্চ পাসের হার দেখা গেছে। শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ ছিল, সরকারের অর্জন তুলে ধরতে প্রকৃত ফলাফল আড়াল করে অতিরিক্ত নম্বর দেয়ার মাধ্যমে পাসের হার বাড়িয়ে দেখানো হতো। শিক্ষা বোর্ড কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে উত্তরপত্র মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়। কোনো ধরনের গ্রেস নম্বর না দিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত নম্বর দেয়ার নির্দেশনাও দেয়া হয়েছিল। এর প্রভাব পড়ে ২০২৫ সালের এসএসসি ও সমমানের ফলাফলে। ওই বছর পাসের হার নেমে আসে ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশে, যা ছিল ১৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০২৪ সালের তুলনায় এ হার কমেছিল ১৪ দশমিক ৫৯ শতাংশীয় পয়েন্ট।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এবার এইচএসসি পরীক্ষার সময় বন্যা, প্রশ্নপত্রে ভুল ও পরীক্ষা ঘিরে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন গুজব সামাল দিতে গত মাসে আমাদের একটি বড় সময় ব্যয় হয়েছে। এ কারণে এসএসসির ফল প্রকাশে কিছুটা বেশি সময় লেগেছে। তবে বাড়তি সময় লাগলেও ফলাফলে পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়েছে। অতীতে অতিরিক্ত নম্বর দিয়ে প্রকৃত ফলাফল আড়াল করার যে প্রবণতা ছিল, গত বছর থেকেই আমরা তা থেকে বেরিয়ে এসেছি। এবারো শিক্ষার্থীরা যা লিখেছে, তার ভিত্তিতেই নম্বর দেয়া হয়েছে। ফলে ফলাফলে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত অবস্থাই প্রতিফলিত হবে।’
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৯৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ। ২০২২ সালে তা কমে ৮৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৮০ দশমিক ৩৯ ও ২০২৪ সালে ৮৩ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশে দাঁড়ায়। গত বছর কমেছিল জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও। ২০২৫ সালে জিপিএ ৫ পায় ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন, যেখানে ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৮২ হাজার ১২৯। এর আগে ২০২১ সালে ১ লাখ ৮৩ হাজার ৩৪০ জন, ২০২২ সালে ২ লাখ ৬৯ হাজার ৬০২ ও ২০২৩ সালে ১ লাখ ৮৩ হাজার ৫৭৮ জন জিপিএ ৫ পেয়েছিল।
তবে এসএসসির ফলাফলে পাস-ফেলের হারকে মুখ্য হিসেবে দেখা উচিত নয় বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. এসএম হাফিজুর রহমান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে এসএসসি-এইচএসসির ফলাফলে পাসের হার ও জিপিএকে অনেক গুরুত্ব দেয়া হয়। শিক্ষার্থীদের জন্য এগুলো গুরুত্বপূর্ণ হলেও নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত ফলাফলের পেছনের কারণগুলো। যেসব শিক্ষার্থী খারাপ ফল করছে, তারা কেন পিছিয়ে পড়ছে সে কারণগুলো চিহ্নিত করে তা কাটিয়ে ওঠার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেয়াই নীতিনির্ধারকদের মূল কাজ হওয়া উচিত।’


