ফাইনালে হেরেও দেশে বীরের মর্যাদা পাচ্ছেন মেসিরা
জুলাই ২১, ২০২৬
নিজের দল নিয়ে গর্বিত স্পেন কোচ
জুলাই ২১, ২০২৬
ফাইনালে হেরেও দেশে বীরের মর্যাদা পাচ্ছেন মেসিরা
জুলাই ২১, ২০২৬
নিজের দল নিয়ে গর্বিত স্পেন কোচ
জুলাই ২১, ২০২৬

বিশ্বজয়ীদের বীরোচিত সংবর্ধনা লাল উচ্ছ্বাসে ভাসছে মাদ্রিদ

হুডখোলা বাসটি যখন মাদ্রিদের রাজপথ ধরে সিবেলেস স্কয়ারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন সেটি আর শুধু বিশ্বকাপজয়ী একটি ফুটবল দলকে বহন করছিল না; সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছিল ১৬ বছরের অপেক্ষার অবসান, দ্বিতীয় তারার গৌরব আর একটি জাতির বাঁধভাঙা আনন্দ।

রাস্তার দুই পাশে যত দূর চোখ যায় লাল জার্সি, লাল-হলুদ পতাকা আর মানুষের ঢল। বাসের ওপর বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছেন অধিনায়ক রদ্রি, পাশে লুইস দে লা ফুয়েন্তের বিশ্বজয়ী খেলোয়াড়রা। নিচে থেকে ভেসে আসছে ‘চ্যাম্পিয়ন, চ্যাম্পিয়ন’ ধ্বনি। পতাকা উড়িয়ে, গান গেয়ে, লাফিয়ে আর মোবাইল ফোনের আলো জ্বালিয়ে বিশ্বজয়ীদের বরণ করে নেয় মাদ্রিদ।

উদযাপনের কেন্দ্র সিবেলেস স্কয়ার ততক্ষণে রূপ নিয়েছে লালের সমুদ্রে। রোববার রাত থেকেই সেখানে জড়ো হতে শুরু করেন সমর্থকেরা। প্রচণ্ড রোদ ও গরম উপেক্ষা করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেন অনেকে। কারো গায়ে নতুন দুই তারকাসংবলিত স্পেনের জার্সি, কারো গালে আঁকা জাতীয় পতাকা। ‘আমি স্প্যানিশ’, ‘বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন’ এবং ‘যে লাফায় না, সে আর্জেন্টাইন’—এমন স্লোগানে বারবার কেঁপে ওঠে চত্বর। মূল অনুষ্ঠানে কয়েক লাখ মানুষ অংশ নেন। সংগীতশিল্পীদের পরিবেশনা, আলোকসজ্জা এবং খেলোয়াড়দের মঞ্চে উপস্থিতি মিলিয়ে সিবেলেস হয়ে ওঠে স্পেনের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের মহোৎসবের প্রাণকেন্দ্র।

এর আগে গতকাল স্থানীয় সময় বেলা আড়াইটার কিছু পর অন্য রকম এক প্রত্যাবর্তনের সাক্ষী হয় আদলফো সুয়ারেস মাদ্রিদ-বারাহাস বিমানবন্দর। নিউইয়র্ক থেকে বিশ্বকাপ নিয়ে দেশে ফেরে লা রোজারা। ‘স্পেন ২৬’ লেখা পোশাকে বিমান থেকে সবার আগে ট্রফি হাতে বেরিয়ে আসেন রদ্রি। তার সঙ্গে ছিলেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে ও স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি রাফায়েল লুজান। রানওয়েতে দাঁড়িয়ে ট্রফি তুলে ধরতেই ক্যামেরার ঝলকানি আর উল্লাসে শুরু হয় বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের দীর্ঘ সংবর্ধনা-যাত্রা।

বিমানবন্দরের টার্মিনাল ফোরে দুই থেকে তিনশ সমর্থক কয়েক ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করেছিলেন। শিশুদের নিয়ে আসা পরিবার, ছুটিতে থাকা তরুণ এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসা মানুষ স্পেনের পতাকা ও জার্সি নিয়ে তৈরি করেছিলেন অঘোষিত অভ্যর্থনা-করিডোর। তবে খেলোয়াড়েরা সাধারণ আগমনপথ দিয়ে বের না হয়ে সরাসরি বাসে উঠে যাওয়ায় কাছ থেকে তাদের দেখার আশা পূরণ হয়নি। তবু হতাশার চেয়ে বড় হয়ে ছিল বিশ্বকাপ ঘরে ফেরার আনন্দ। দলকে বহনকারী বিমানটি একসময় বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অনুসরণ করা ফ্লাইটে পরিণত হয়; প্রায় ২৮ হাজার ৬০০ মানুষ অনলাইনে এর গতিপথ দেখছিলেন।

বিমানবন্দর থেকে খেলোয়াড়েরা যান লাস রোজাসে। সেখানে মধ্যাহ্নভোজ, পরিবারের সঙ্গে কিছু সময় এবং অল্প বিশ্রামের পর আনুষ্ঠানিক পোশাকে শুরু হয় রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনা। প্রথম গন্তব্য জারজুয়েলা প্রাসাদ। রাজা ফেলিপে ষষ্ঠ, রানি লেতিসিয়া, রাজকুমারী লিওনর ও ইনফান্তা সোফিয়া ব্যক্তিগতভাবে খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফ সদস্যদের স্বাগত জানান। রাজপরিবারের সামনে ট্রফি নিয়ে প্রবেশ করেন রদ্রি। পুলিশ ও সামরিক সদস্যদের তৈরি অভ্যর্থনা-করিডোরে তখনো ধ্বনি উঠছিল—‘চ্যাম্পিয়ন, চ্যাম্পিয়ন।’

রাজা ফেলিপে এ সাফল্যকে ‘মহাকাব্যিক জয়’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, ‘তোমরা গোটা স্পেনের জন্য জিতেছ।’ ১৬ বছর পর বিশ্বকাপ ফিরিয়ে আনার জন্য দলকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি খেলোয়াড়দের পথে পাওয়া প্রতিটি হাসি, শুভেচ্ছা ও আলিঙ্গন উপভোগ করার আহ্বান জানান। রাজপরিবারের সদস্যদের দুই তারকা ও ‘২৬’ লেখা স্মারক জার্সি উপহার দেয় দল। প্রাসাদের সিঁড়িতে খেলোয়াড়েরা গান ধরেন—‘চ্যাম্পিয়নস, চ্যাম্পিয়নস, ওলে ওলে ওলে।’ এরপর বিশ্বজয়ীদের বহনকারী বাস যায় লা মনক্লোয়া প্রাসাদে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ তাদের অভ্যর্থনা জানান।

রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে শুরু হয় দিনের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত পর্ব—হুডখোলা বাসে রাজধানী প্রদক্ষিণ। মনক্লোয়া থেকে প্রিন্সেসা, আলবার্তো আগিলেরা, সাগাস্তা, গোয়া ও সেরানোসহ মাদ্রিদের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক পেরিয়ে বাস এগোয় সিবেলেসের দিকে। বারান্দা, ছাদ, ফুটপাত ও সড়ক বিভাজক—মানুষ দাঁড়াতে পারে এমন কোনো জায়গাই যেন খালি ছিল না। বিশ্বকাপ হাতে খেলোয়াড়দের নাচ, গান এবং সমর্থকদের দিকে পতাকা ও জার্সি ছুড়ে দেয়ার দৃশ্য মাদ্রিদকে পরিণত করে আনন্দের নগরীতে।

এ উচ্ছ্বাস অবশ্য শুধু রাজধানীতে সীমাবদ্ধ ছিল না। মাদ্রিদের কোলন স্কয়ার, পুয়েন্তে দেল রে ও মুভিস্টার অ্যারেনার পাশাপাশি বার্সেলোনা, গ্যালিসিয়া, আন্দালুসিয়া, কাতালোনিয়া, নাভারা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে মানুষ রাতভর জয় উদযাপন করেন। বার্সেলোনার মাতারোর রোকাফোন্দায় লামিনে ইয়ামালের শৈশবের মহল্লা পরিণত হয় উৎসবের কেন্দ্রে। সেখানকার মানুষের কাছে ১৯ বছর বয়সী ইয়ামালের বিশ্বজয় ছিল নিজেদের মহল্লা ও অভিবাসী শিকড়েরও জয়। তোলেদোর বুলরিংয়ে সাত হাজারের বেশি মানুষ একসঙ্গে ফাইনাল দেখেন; জয়ের পর কোলন ফোয়ারা ও আশপাশের সড়ক পতাকা, গাড়ির হর্ন আর ‘ভিভা এস্পানিয়া’ ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে।

রাত নামার পর মাদ্রিদের রাজপ্রাসাদের চারটি দিক লাল আলোয় আলোকিত করা হয়। যেন শুধু সিবেলেস নয়, পুরো রাজধানীই পরে নিয়েছিল বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের রং। ২০১০ সালের পর আবার বিশ্বকাপ ঘরে ফিরেছে। তাই এ ফেরা কেবল বিমানবন্দরে একটি দলের অবতরণ ছিল না; এটি ছিল ট্রফি হাতে নতুন এক প্রজন্মের দেশে ফেরা এবং তাদের বরণ করে নিতে গোটা স্পেনের এক বিশাল লাল উৎসবে জেগে ওঠা।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *