
লঘুচাপের পূর্বাভাস, চার সমুদ্রবন্দরে সতর্ক সংকেত
জুলাই ১৫, ২০২৬
ওয়াশিংটনে এলডিসি উত্তরণ নিয়ে বক্তব্য রাখবেন বাণিজ্যমন্ত্রী
জুলাই ১৫, ২০২৬টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা গ্রহণ, পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের প্রশ্নে ভুল এবং শিক্ষামন্ত্রীর করা এক মন্তব্যের প্রতিবাদে গতকাল রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভ করেছে শিক্ষার্থীরা।
এ সময় তারা শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগ দাবি করে। শিক্ষার্থীরা ঢাকা, বগুড়া, বরিশাল, ময়মনসিংহসহ অন্তত ১০ জেলায় সড়ক অবরোধ, মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে।
মঙ্গলবার সকাল ও বিকাল দুই দফায় রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব মোড় অবরোধ করেন বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা। প্রথম দফায় ঢাকা সিটি কলেজ, ঢাকা আইডিয়াল কলেজ, সরকারি বাঙলা কলেজ, সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজ, লালমাটিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বিএএফ শাহীনসহ ১২-১৫টি কলেজের শিক্ষার্থীরা এ অবরোধে অংশ নেয়। শিক্ষার্থীদের দাবি, বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও সোমবার এইচএসসি পরীক্ষা নেয়া হয়েছে। এতে অনেকে পরীক্ষা দিতে পারেনি। এছাড়া পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রে ৬ ও ৭ নম্বর প্রশ্নে ভুল ছিল, যা শিক্ষার্থীদের ফলাফলে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। বিক্ষোভের সময় দুর্যোগ পরিস্থিতি কেটে না যাওয়া পর্যন্ত পরীক্ষা স্থগিত, যারা মঙ্গলবার পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি তাদের পরীক্ষা পুনরায় গ্রহণ এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি জানায় তারা।
কর্মসূচিতে অংশ নেয়া ঢাকা সিটি কলেজের এক শিক্ষার্থী বলে, ‘আমাকে হাঁটুপানির মধ্য দিয়ে কেন্দ্র যেতে হয়েছে এবং ভেজা কাপড়েই পরীক্ষা দিতে হয়েছে। এর মধ্যে প্রশ্নেও ভুল ছিল। অনেকটা সময় নষ্ট হয়েছে প্রশ্নের উত্তর মেলাতে গিয়ে। একটি পরীক্ষা পিছিয়ে দিলে খুব বেশি ক্ষতি হতো না। একটি সঠিক সিদ্ধান্তের অভাবে আমরা কয়েক লাখ শিক্ষার্থী ভোগান্তিতে পড়েছি। এসব কারণেই আমরা পরীক্ষার মধ্যেও আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছি।’
বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা মিরপুর সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করায় ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ ঢাকা কলেজের সামনে এবং আরেক দল টিএসসির দিকে চলে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চত্বরের সামনে থেকে বেলা সোয়া ১টার দিকে পুলিশ তাদের সরিয়ে দিলে শিক্ষার্থীরা নীলক্ষেত থেকে টিএসসিগামী সড়কে অবস্থান নেয়। বেলা পৌনে ৩টার দিকে শিক্ষার্থীদের একাংশ ঢাকার মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সামনে অবস্থান নেয় এবং একপর্যায়ে শিক্ষা বোর্ডের গেটে ধাক্কাধাক্কি করে ও ইট ছোড়ে। পরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বোর্ডের মূল ফটকের সামনে অবস্থান নেন।
বিকাল ৪টার কিছু আগে শিক্ষার্থীরা পুনরায় সায়েন্স ল্যাব মোড় অবরোধ করে। পরে তিন দফা দাবিতে শিক্ষার্থীরা জাতীয় সংসদ ভবন অভিমুখে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে। সন্ধ্যা ৭টার দিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা সংসদ ভবনে প্রবেশের চেষ্টা করলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এ সময় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আঘাত পেয়েছে। তবে প্রাথমিকভাবে তাদের নাম-পরিচয় জানা যায়নি।
এদিন শিক্ষার্থীরা একই দাবিতে উত্তরায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক, বরিশালে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক অবরোধ করে। ময়মনসিংহে ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে একদল শিক্ষার্থী। এছাড়া বগুড়া, কুমিল্লা, সিলেট এবং নওগাঁয়ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে শিক্ষার্থীরা।
b1.1
চট্টগ্রামের ২ নম্বর গেটে সড়ক অবরোধ করে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ছবি: নিজস্ব আলোকচিত্রী
দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে পরীক্ষা গ্রহণ ও অভিন্ন প্রশ্নপত্র অতীতের চেয়ে কঠিন হওয়ার অভিযোগ তুলে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে দুপুর সোয়া ১২টার দিকে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের সামনে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক অবরোধ করে জেলার বিভিন্ন কলেজের পরীক্ষার্থীরা। এ সময় সড়কের উভয় পাশে অসংখ্য যানবাহন আটকা পড়ে দুর্ভোগে পড়েন যাত্রী ও চালকরা। বেলা ৩টার দিকে তারা মহাসড়ক ছেড়ে দিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। একই দাবিতে দুপুর ১২টার দিকে নগরের টাউন হল এলাকায় ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল মহাসড়কে ব্যারিকেড দিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে বিক্ষোভ করে স্থানীয় শিক্ষার্থীরা। পরে বেলা আড়াইটায় তারা মহাসড়ক ছেড়ে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গেলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ও শিক্ষা সচিবের অপসারণের দাবিতে বগুড়ায় বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে শিক্ষার্থীরা। বেলা ১১টার দিকে তারা নগরের সাতমাথা এলাকা থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। দুপুর ১২টার দিকে মিছিলটি সাতমাথা থেকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্বরে গিয়ে সমাবেশ করে।
এদিকে নিজের একটি বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, উচ্চ মাধ্যমিকের পদার্থবিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান ও যুক্তিবিদ্যা পরীক্ষা আবার নেয়ার ব্যবস্থা করা যাবে। গতকাল জাতীয় সংসদে একটি বিলের ওপর বক্তব্য দিতে গিয়ে শিক্ষামন্ত্রী এ কথা বলেন। এর আগে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন।
নিজের মন্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, ‘আমার ব্যক্তিগত কোনো মন্তব্য নিয়ে অনেকেই আপত্তি করেছেন। এ ব্যাপারে আমি বলতে চাই, আমি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কাউকে কিছু বলি নাই। যদি কেউ কষ্ট পেয়ে থাকে, সিম্পলি দুঃখ প্রকাশ করছি।’
পদার্থবিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান ও যুক্তিবিদ্যা পরীক্ষা পুনরায় নেয়া যাবে উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘ইতিমধ্যে বন্যার কারণে চট্টগ্রাম বোর্ডের প্রতিটি জেলার পরীক্ষা বন্ধ করে দিয়েছি, আমাদের পুনরায় পরীক্ষা নিতেই হবে। এক্ষেত্রে আমরা ভেবেচিন্তে দেখেছি, চট্টগ্রাম বোর্ডের পরীক্ষা যখন নিতে যাব—পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্র, হিসাববিজ্ঞান ও যুক্তিবিদ্যা, সে সময় আমরা এ পরীক্ষাটি পুনরায় নেয়ার ব্যবস্থা করতে পারব।’
পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের ৬ ও ৭ নম্বর প্রশ্নে ভুল ছিল জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ওই দুটি প্রশ্নের জন্য শিক্ষার্থীদের পূর্ণ নম্বর দেয়া হবে।
উল্লেখ্য, এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় নিয়মিত ও অনিয়মিত মিলিয়ে ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে। গত ২ জুলাই একযোগে দেশের ২ হাজার ৬৯৭ কেন্দ্রে এ পরীক্ষা শুরু হয়।
এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেছেন, ‘স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, কোথাও যাতায়াত বা জলাবদ্ধতার কারণে সমস্যা হলে প্রয়োজনে কেন্দ্র পরিবর্তন, পরীক্ষা স্থগিত, কিংবা পরীক্ষার সময় বৃদ্ধিসহ যে কোনো প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত তারা নিতে পারবেন। যদি বিরূপ আবহাওয়ার কারণে দেশের কোথাও কোনো শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিতে না পারে, তবে তারা চট্টগ্রাম বোর্ডের স্থগিত হওয়া পরীক্ষার সঙ্গে একই দিনে অংশ নিতে পারবে। পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের প্রশ্নে দুটি ভুল পাওয়ার তথ্য এসেছে। উক্ত প্রশ্নের জন্য সবাইকে ফুল মার্কস দেয়ার যে সিদ্ধান্ত, সেটি শিক্ষার্থীবান্ধব নীতিরই প্রতিফলন।’
গত রাতে ফেসবুকে পোস্টে এসব কথা বলেন মাহদী আমিন। তিনি আরো বলেন, ‘পরীক্ষার্থীরা আমাদের সন্তানতুল্য। তাদের ভবিষ্যৎ, স্বপ্ন ও মানসিক অবস্থার গুরুত্ব সরকার গভীরভাবে উপলব্ধি করে। জনগণের নির্বাচিত সরকার হিসেবে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশে পরীক্ষা নিশ্চিত করা একটি দায়বদ্ধতা। পরীক্ষার্থীদের যেন কোনো দুর্ভোগ না হয় সেটি যেমন সরকারের লক্ষ্য, ঠিক তেমনি তাদের দীর্ঘদিনের পাঠ্যক্রম ও মানসিক প্রস্তুতিকে মূল্যায়ন করে যথাসময়ে ও সুষ্ঠুভাবে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা সম্পন্ন করাও দায়িত্ব। শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষাই অগ্রাধিকার।’


