
বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস আজ দেশের ৬৭ শতাংশের বেশি তরুণই অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন
জুলাই ১৫, ২০২৬
সুরক্ষিত গুদামে অরক্ষিত পণ্য গতি হারাচ্ছে বেনাপোল স্থলবন্দরের আমদানি ও রফতানি বাণিজ্য
জুলাই ১৫, ২০২৬দেশের বিভিন্ন এলাকায় বন্যার পানি ধীরে ধীরে নামতে শুরু করলেও নতুন করে বাড়ছে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি। চট্টগ্রামে টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় জনজীবনের পাশাপাশি বিপর্যস্ত হয়েছে উপজেলা পর্যায়ের সরকারি স্বাস্থ্যসেবাও।
পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সাতকানিয়া, বাঁশখালী ও বোয়ালখালীসহ কয়েকটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। পানি কমতে থাকায় হাসপাতালগুলোর সেবা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হলেও ডায়রিয়া, কলেরাসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ ও চর্মরোগের প্রাদুর্ভাবের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে চট্টগ্রামের হাসপাতালগুলোয় ডায়রিয়ায় আক্রান্ত ১১২ জন ভর্তি হয়েছেন। অ্যান্টিভেনম, স্যালাইন ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটসহ প্রয়োজনীয় ওষুধের মজুদ রাখা হলেও চিকিৎসকদের মতে, বন্যা-পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে নিরাপদ পানির সংকট।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্যার পর পানিবাহিত ও চর্মরোগের প্রকোপই সবচেয়ে বেশি দেখা দেয়। বিশেষ করে ডায়রিয়া, স্ক্যাবিস, ছত্রাকজনিত সংক্রমণ, চুলকানি, চোখের সংক্রমণ ও শ্বসনতন্ত্রের রোগ বাড়তে পারে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় বন্যাকবলিত এলাকাগুলোয় মোবাইল মেডিকেল টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগ। চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, চট্টগ্রামে এখন পর্যন্ত ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছে ১১২ জন এবং সাপে কাটা রোগীর সংখ্যা ১০৫। ১ হাজার ১০০টি ভায়াল অ্যান্টিভেনম, ৫০ হাজারের বেশি পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, স্যালাইনসহ অন্যান্য ওষুধের মজুদ আছে।
বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নাজমা আক্তার বণিক বার্তাকে জানান, বন্যার কারণে হাসপাতালের তেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তবে পানিতে ডুবে উপজেলার ১৫টি কমিউনিটি ক্লিনিক পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন হাসপাতালে সাপে কাটা রোগী বেশি আসছে। এখন পর্যন্ত মোট ২২ জন এ রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছে। যেসব রোগী এখন হাসপাতালে আসছে তার ৩০ শতাংশের বেশি ডায়রিয়ায় আক্রান্ত। পানি নেমে গেলে সুপেয় পানির সংকটের কারণে ডায়রিয়া ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। বন্যার সময় একজন ৩৪ বছর বয়সী নারী ডায়রিয়া রোগী চিকিৎসা নিতে না পেরে মৃত্যুবরণ করেছেন। এখন হাসপাতালে সব ধরনের ওষুধ পর্যাপ্ত মজুদ আছে। বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকায় পানির সমস্যা বেশি থাকায় এ উপজেলায় এমনিতেই ডায়রিয়ার রোগী বেশি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পরও দূষিত পানি, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন, নিরাপদ পানির সংকট এবং আশ্রয় কেন্দ্রে অতিরিক্ত মানুষের বসবাসের কারণে সংক্রামক রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। তাই এ সময় বিশুদ্ধ পানি পান, সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, খাবার ভালোভাবে রান্না করে খাওয়া এবং শরীর পরিষ্কার রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।
এদিকে সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আশীষ দে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বন্যার সময়ে হাসপাতালের নিচতলা সম্পূর্ণই পানিতে ডুবে ছিল। এখনো পানি আছে। হাসপাতালে তিন শতাধিক রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন। যেসব রোগী আসছে, তাদের বেশির ভাগই ডায়রিয়ায় আক্রান্ত। পানি নেমে গেলে এবং সুপেয় পানির সংকট বাড়লে ডায়রিয়া, কলেরা ও চর্মরোগের প্রাদুর্ভাব বাড়বে। হাসপাতালে এখন গত দুই দিনে ১৫ জনের মতো ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগী এসেছে। সাপে কাটা রোগী চিকিৎসা নিয়েছে ছয়জন। বিশেষ করে জমে থাকা পানি নেমে গেলে কলেরার সংক্রমণ বাড়তে পারে। তবে মেডিকেল টিম উপজেলায় বিভিন্ন এলাকায় সার্বক্ষণিক কাজ করছে।’
চট্টগ্রাম বিভাগীয় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, চট্টগ্রামে বন্যার কারণে প্রায় ২০ হাজার অগভীর নলকূপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। টয়লেটগুলোও নষ্ট হয়েছে। বন্যার পানি নেমে গেলে সেগুলো সংস্কারের ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত নলকূপগুলোর বেশির ভাগই বেসরকারি। ডায়রিয়ার সংক্রমণ কমাতে প্রায় চার লাখের বেশি পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করা হয়েছে।
কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মুজিবর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বন্যার সময় ভূমিধসে আহত ব্যক্তি এবং সাপে কাটা রোগীরাই বেশি চিকিৎসা নিতে এসেছেন। তবে অভিজ্ঞতা বলে, বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর ডায়রিয়া এবং ত্বকের বিভিন্ন রোগের প্রকোপ বাড়ে। সে বিষয়টি মাথায় রেখে আমরা আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়েছি।’
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্র জানায়, বন্যার সময় চিকিৎসাসেবা সচল রাখতে দুর্গত উপজেলাগুলোতে মেডিকেল টিম মোতায়েন করা হয়। উপজেলা হাসপাতাল ও কমিউনিটি ক্লিনিক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক রোগীকে ইউনিয়ন পর্যায়ে গিয়ে চিকিৎসা দিতে হয়েছে। পানি নামতে শুরু করলেও দুর্গম এলাকায় এখনো স্বাস্থ্যসেবা পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। তবে সাতকানিয়া ছাড়া অন্য উপজেলা হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা প্রায় স্বাভাবিক হয়েছে।
বোয়ালখালী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মামুনুল হক মামুন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘টানা বৃষ্টিপাতের কারণে শুরুতেই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নিচতলা পানিতে ডুবে গিয়েছিল। তবে হাসপাতালের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। নিম্নাঞ্চলের পানি নামতে শুরু করায় মানুষ ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগের চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে আসছেন। সামনে বিভিন্ন চর্মরোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়বে। এ উপজেলায় সাপের কামড়ে এখন পর্যন্ত ২৫ জন আহত হলেও দুজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চমেকে পাঠানো হয়েছে। ১০ জন অন্য পোকামাকড়ের কামড়ে আহত হয়েছে।’
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুসারে, দেশের সাতটি জেলা বর্তমানে বন্যা পরিস্থিতির শিকার। বন্যাকবলিত এ জেলাগুলো হলো খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ। এ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে জেলাগুলোর মোট ৫৯টি উপজেলা প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া উপদ্রুত অঞ্চলগুলোর ৩৩৪টি ইউনিয়ন এবং ১২টি পৌরসভা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যার পানিতে বর্তমানে দেশের মোট ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩১১ পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। সব মিলিয়ে এ সাতটি জেলায় বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত লোকসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৯ হাজার ৪১১। এ দুর্যোগের কবলে এখন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে মোট ৫৪ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং আরো ৩৯ জন আহত হয়েছে।
বান্দরবান জেলার সিভিল সার্জন ডা. মো. শাহীন হুসাইন চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সাধারণত বন্যা-পরবর্তী সময়ে চর্মরোগ ও ডায়রিয়ার প্রকোপ দেখা দেয়। এখন পর্যন্ত ডায়রিয়ার প্রকোপ সেভাবে শুরু হয়নি। তবে আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে স্ক্যাবিসসহ বিভিন্ন ধরনের ত্বকের রোগ দেখা দিচ্ছে। আমাদের মোবাইল মেডিকেল টিমগুলো সেখানে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে। পাশাপাশি বন্যা-পরবর্তী সময়ে যেসব রোগের প্রকোপ বাড়তে পারে, সেগুলো মোকাবেলায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে প্রয়োজনীয় ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও জনবল প্রস্তুত রাখা হয়েছে।’
সার্বিক বিষয়ে চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. ফজলে রাব্বি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এখন যেসব রোগী চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আসছেন, তাদের বেশির ভাগই ডায়রিয়া অথবা চর্মরোগে আক্রান্ত। হাসপাতালগুলোতে স্যালাইন, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটসহ অন্য সব ধরনের প্রয়োজনীয় ওষুধের মজুদ আছে। যদি আরো ওষুধের প্রয়োজন হয়, তাহলে দ্রুত আমাদের জানানোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আমরা দ্রুত সরবরাহ করব।’
বন্যার পর পানিবাহিত ও খাদ্যবাহিত রোগের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি তৈরি হয় বলে জানিয়েছেন রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের অভাবে ডায়রিয়ার প্রকোপ দ্রুত বাড়তে পারে। পাশাপাশি ভেজা পরিবেশ, ঠাণ্ডা ও অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় শিশু ও বয়স্কদের সর্দি-কাশি এবং শ্বসনতন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। আশ্রয় কেন্দ্রে অতিরিক্ত মানুষের বসবাস, অপর্যাপ্ত পরিচ্ছন্নতা এবং কাদাপানির সংস্পর্শে থাকার কারণে স্ক্যাবিসসহ বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই বিশুদ্ধ পানি পান, নিরাপদ খাবার গ্রহণ, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং অসুস্থতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেয়া জরুরি।’


