উন্নয়নশীল দেশগুলো শিক্ষার চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করছে ঋণ পরিশোধে
জুলাই ১০, ২০২৬
কক্সবাজারে পানিবন্দি লাখো মানুষ, ২৫ জনের মৃত্যু
জুলাই ১০, ২০২৬
উন্নয়নশীল দেশগুলো শিক্ষার চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করছে ঋণ পরিশোধে
জুলাই ১০, ২০২৬
কক্সবাজারে পানিবন্দি লাখো মানুষ, ২৫ জনের মৃত্যু
জুলাই ১০, ২০২৬

চট্টগ্রামে পাহাড়ধসের ঝুঁকি হ্রাসে প্রয়োজন পূর্ব সতর্কীকরণ ও প্রাথমিক ব্যবস্থার উন্নয়ন

পাহাড়ধসের কারণে ৬ জুলাই কক্সবাজার পৌরসভায় একজন এবং উখিয়া উপজেলার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আটজনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়।

এর আগে ২০২৪ সালে অতিবৃষ্টির ফলে পাহাড়ধসে রোহিঙ্গা শিবিরে ২৩ জন আহত ও ১২ জনের মৃত্যু হয়। রোহিঙ্গাদের জন্য ২০১৭ সালে উখিয়া ও টেকনাফের প্রায় আট হাজার একর বনভূমি উজাড় করে ২২টি আশ্রয় শিবির গড়ে তোলা হয়, যাতে বর্তমানে বসবাস করছে প্রায় ১৪ লাখ রোহিঙ্গা। বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতির প্রায় ১২ শতাংশ পাহাড়ি এলাকা। এসব পাহাড়ের অধিকাংশই বৃহত্তম চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেট জেলায় অবস্থিত। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য জেলাগুলোতে বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ধসজনিত হতাহত একটি নিয়মিত দুর্ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ের স্তরগুলো মূলত শেলপ্রধান, বালিপ্রধান ও শেল-বালির মিশ্রণে সৃষ্ট। শিলার মধ্যে বৃষ্টির পানি অনুপ্রবেশ করে শেলস্তরে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে নিম্নমুখী প্রবাহ হয়, ফলে আন্তঃস্তর তলটি পিচ্ছিল হয়ে পাহাড়ধস হয়। ১৯৯০ সাল পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ধসজনিত হতাহত ও মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকে। বাংলাদেশের পাহাড়ধসের ইতিহাসে ভয়াবহ দুর্যোগ দেখা দেয় ২০১৭ সালের জুনে। সে সময় টানা তিনদিনের অতিবৃষ্টিতে পাহাড়ধসে রাঙ্গামাটিসহ পার্বত্যাঞ্চলে ১৬৪ জন মারা যান; এরমধ্যে শুধু রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলায় মারা যান পাঁচ সেনা সদস্যসহ ১২০ জন। চট্টগ্রাম মহানগরীর পাহাড়ধসের ইতিহাসে ভয়াবহ দুর্যোগ ঘটে ১১ জুন ২০০৭; সে সময় চট্টগ্রামের ছয়টি স্থানে একসঙ্গে পাহাড়ধসে ১২৭ জন নিহত ও ১০৫ জন আহত হন।

প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট উভয় কারণে প্রধানত চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশে পাহাড়ধস হয়ে থাকে। বন উজাড়, ভূতাত্ত্বিক কাঠামো নষ্ট করে পাহাড় কাটাসহ বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি, অপরিকল্পিতভাবে পাহাড়ের ঢালে বসতি স্থাপন, মাত্রাতিরিক্ত যানবাহন, পাহাড়ে অতিরিক্ত জনসংখ্যা ইত্যাদির সঙ্গে বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টি যোগ হয়ে পাহাড়ধস হয়ে থাকে। এছাড়া পাহাড়ধসের অন্যতম প্রধান কারণ হলো ঢালু স্থানের অস্থিতিশীলতা। পাহাড়ধসের অন্যতম আরেকটি করণ ছিল প্রাকৃতিক ড্রেনেজ সিস্টেমের অভাব বা অবনতি; প্রাকৃতিক ড্রেনেজ সিস্টেম হলো পাহাড়ের ওপর থেকে পানি নিচে নেমে আসার স্বাভাবিক একটি ধারা, এ স্বাভাবিক ধারা যদি কোনো কারণে বাধাগ্রস্ত হয় তাহলে পানি ভিন্নভাবে প্রবাহিত হয়ে অন্য এক জাগায় জমা হয় এবং পরবর্তী সময়ে তা পাহাড়ের ফাটল দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে এবং একসময় পাহাড়ের মাটিকে নরম করে ধসে পড়ে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ৩০ বছরে বাংলাদেশে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাত বেড়েছে ৮ শতাংশ। কয়েক বছরের পাহাড়ধসের ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, জুন-জুলাইয়ের বর্ষাকালীন গড় বৃষ্টিপাত স্বাভাবিক সময় থেকে বেশি বৃষ্টি হয়েছে। উপরোক্ত কারণের আলোকে ও সামগ্রিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে কক্সবাজারে গতকালের পাহাড়ধসের জন্য-সমুদ্রে লঘুচাপজনিত কারণে ভারি বর্ষণ, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের জন্য পাহাড় কেটে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি স্থাপন, বন উজাড় এবং বালুকাময় মাটি ইত্যাদি কারণ চিহ্নিত করা যায়। সম্প্রতি ইপসা, সেভ দ্য চিলড্রেন বাংলাদেশ এবং আমার একটি যৌথ গবেষণায় দেখা যায়, ২৪ ঘণ্টায় অতি ভারি বর্ষণ পাহাড়ধসের জন্য অতি উচ্চঝুঁকি তৈরি করে। ওই গবেষণায় ১৯৯০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৩৫টি পাহাড়ধসের ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, প্রায় ১ হাজার ২০০ জনের মৃত্যু হয় এবং আহত হয় প্রায় দুই হাজার নিম্ন আয়ের মানুষ। এ গবেষণার ফলাফলে উঠে আসে, ২৪ ঘণ্টায় ৮৫ মিমি, ৪৮ ঘণ্টায় ১৮৬ মিমি ও ৭২ ঘণ্টায় ৩৩৫ মিমি বৃষ্টিপাত পাহাড়ধসের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে অতিরিক্ত জনসংখ্যার কারণে তীব্র আবাসন সংকট লক্ষণীয়।

পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাবে চট্টগ্রামে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় আছে ৩০টি। পাহাড়গুলো বিভিন্ন সময় অবৈধভাবে কেটে গড়ে তোলা হয়েছে বসতিসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনা (যেমন দোকান, অফিস ইত্যাদি), ইটভাটা, শিল্প-কারখানা, আবাসন প্রকল্প এবং বসতির যোগাযোগের জন্য সড়ক ব্যবস্থা। চট্টগ্রামের ৩০টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করছে প্রায় দুই লাখ মানুষ। অন্যদিকে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের তালিকা অনুযায়ী চট্টগ্রাম শহরে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের সংখ্যা ১৭টি, এর মধ্যে সরকারি মালিকাধীন সাতটি পাহাড়ে বসবাস করছে ৩০৪টি পরিবার এবং ব্যক্তিমালিকাধীন ১০টি পাহাড়ের রয়েছে ৫৩১ পরিবারের বসবাস। চট্টগ্রামে পাহাড়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষ বসবাস করে সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে, এখানে প্রায় ১২ হাজার পরিবারের ৬০-৭০ হাজার মানুষের বসবাস, এরপর রয়েছে নগরীর মতিঝর্ণা ও আদালত ভবনের পাহাড়ে। চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুর, জঙ্গল লতিফপুর এবং জালালাবাদসহ অধিকাংশ পাহাড়ে সারা বছরই কোনো না কোনো কৌশল অবলম্বন করে প্রশাসনের নজরদারিকে ফাঁকি দিয়ে পাহাড় কাটা হয়। এক রিপোর্টে দেখা যায়, চট্টগ্রামের ৪২টি পাহাড়ে প্রায় ১ হাজার ১০০ বসতিতে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে প্রায় ৫০ হাজার নিম্ন আয়ের মানুষ। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়গুলোর ভূমিরূপ ও মাটির প্রকৃতি এখানে নিয়মিত পাহাড়ধসের আরেকটি কারণ। এ পাহাড়ি ভূমিতে বালির আধিক্যের পাশাপাশি প্রচুর পলি মাটিও রয়েছে। এ অঞ্চলের পাহাড়ি ভূমিরূপ মূলত স্তরায়িত ও অ-স্তরায়িত উভয় ধরনের পাললিক শিলা দিয়ে গঠিত। এক গবেষণায় দেখা যায়, পাহাড়ি অঞ্চলের বনভূমির বৃক্ষগুলো মাটির গভীর পর্যন্ত মূল প্রেরণের মাধ্যমে মাটির দৃঢ়তা বৃদ্ধি ও মাটির ক্ষয় রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পার্বত্য এলাকার বনভূমি যেমন পাহাড়গুলোকে সরাসরি বৃষ্টির পানির আঘাত থেকে রক্ষা করে, তেমনি বৃষ্টির পানিকে বৃহৎ আকারে মাটির ভেতরে প্রবেশে বাধা দেয়। কিন্তু কয়েক দশক ধরে নির্বিচারে পার্বত্যাঞ্চলের বন ও গাছপালা ধ্বংসের ফলে বৃষ্টির পানি সহজে পাহাড়ি বেলে-দোঁআশ মাটিতে প্রবেশ করে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়িয়েছে। পূর্ববর্তী এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৯০-২০১০ পর্যন্ত সময়ে পাহাড়ি পাঁচটি জেলায় প্রায় ১ হাজার ১২৮ বর্গকিমি পাহাড়ি বন ধ্বংস করা হয়েছে। অন্যদিকে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের কারণে নির্বিচারে পাহাড় কাটা হচ্ছে, এতে বিনষ্ট হচ্ছে প্রকৃতির ভারসাম্য। স্বাধীনতার পর থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ৪০ বছরে চট্টগ্রামে বিলুপ্ত হয়েছে প্রায় ৯০টি পাহাড়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের ছাত্র মহিব বিল্লাহ ও আমার এক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৮৯ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত এই দুই যুগ শুধু খুলশী ও নাসিরাবাদ এলাকায় পাহাড় কমেছে ৫ দশমিক ২৩ শতাংশ। এর মধ্যে ২ দশমিক ৬২ শতাংশ এলাকায় নির্মাণ হয়েছে ঘরবাড়ি, অবশিষ্ট ২ দশমিক ৬১ শতাংশ এলাকায় বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ছোট-বড় দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।

২০০৭ সালে পাহাড়ধসজনিত কারণে মৃত্যুর ফলে গঠিত তদন্ত কমিটি স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ৩৬ দফা সুপারিশ করেছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, জরুরি ভিত্তিতে পাহাড়ি এলাকায় বনায়ন, ওয়াল নির্মাণ, পানি নিষ্কাশন ড্রেন ও মজবুত সীমানা প্রাচীর নির্মাণ, পাহাড়ের পানি ও বালি দ্রুত অপসারণের ব্যবস্থা করা, টেকসই বসতি স্থাপন, পাহাড়ি বালি উত্তোলন বন্ধ, পাহাড়ি এলাকার ১০ কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা নিষিদ্ধ করে পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে হাউজিং প্রকল্প বাস্তবায়ন না করা। কিন্তু চট্টগ্রামে পাহাড়ের ঢাল ও পাদদেশে অবৈধ বসতিসহ বিভিন্ন স্থাপনা বিদ্যমান থাকায় এখানে পাহাড়ধসজনিত দুর্যোগের ঝুঁকির মাত্রা বেশি।

পাহাড়ধস প্রাকৃতিক, আর্থসামজিক, ও আর্থসাংস্কৃতিক সমন্বয়ের এক দুর্যোগ। পাহাড়ধস কখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। তবে যথাসময়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে পাহাড়ধসের ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। এজন্য পাহাড়ধস দুর্যোগ বিষয়াবলি জাতীয় দুর্যোগ নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করে পূর্ব সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, প্রাথমিক পদক্ষেপ ও প্রযুক্তির ব্যবহার করা; যেকোনো ধরনের পাহাড় কাটা এবং বন উজাড় সম্পূর্ণ বন্ধ করে পাহাড়ে সবুজের আচ্ছাদন বাড়ানো এবং পাহাড়ের মাটি ধরে রাখতে গভীর মূলবিশিষ্ট দেশীয় গাছ ও ঘাস রোপণ; ভূমি ব্যবহার নীতিমালার আলোকে ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান তৈরি; ভূতাত্ত্বিক জরিপ পূর্বক পাহাড়ধসপ্রবণ এলাকা মানচিত্রে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা; পার্বত্যাঞ্চলের পাহাড় সম্পর্কিত ডেটাবেজ তৈরি করে নিয়মিত হালনাগাদ করা; পার্বত্য এলাকায় জনবসতির ক্রমবর্ধমান চাপ হ্রাস; পাহাড়ে পানি চলাচলের পথ সবসময় নির্বিঘ্ন এবং বৃষ্টির পানি যাতে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে দ্রুত সময়ে নেমে যেতে পারে সে ব্যবস্থা করা; সড়কজাল বা নেট দিয়ে পাহাড়ের ঢাল রক্ষা ও প্রতিরক্ষা প্রাচীর নির্মাণ করা; পাহাড় কর্তন, পাহাড়ধসজনিত ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি থেকে রক্ষা পেতে সচেতনতা বাড়ানো; টেকসই পাহাড় ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নের উদ্যোগ নেয়ার পাশাপাশি সুশাসন নিশ্চত করে রাজনৈতিক ঐকমত্য বৃদ্ধি এবং পাহাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ বসতি স্থানান্তর। সর্বোপরি, টেকসই পাহাড় ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নে সঠিক পরিকল্পনা তৈরি ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে।

জাকির হোসেন,
সম্পাদক, সিটিনিউজ সেভেন ডটকম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *